বর্ষ বরণে সমুদ্র সৈকতে উধাও স্বাস্থ্যবিধি

মোঃ নেজাম উদ্দিন,

সমুদ্র সৈকত এখন করোনা ভাইরাসের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা পর্যটকরা কোন রকম স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কক্সবাজারে চলাফেরা করছে। আর এতে প্রশাসনের তেমন কোন নজরদারি চোখে পড়েনি প্রতিবেদকের।
গতকাল পর্যটন নগরী কক্সবাজারে নতুন বছর বরণের স্থানীয় প্রশাসনের তেমন কোন ধরনের আয়োজন না করলেও পর্যটকদের ভীড় লক্ষণীয় ছিল । লাখো পর্যটক গতকাল ২০২০ কে বিদায় দিতে সূর্যস্থ দেখার জন্য পর্যটকের ভীড় ছিল প্রচুর। তবে তাদের অধিকাংশ পর্যটক স্বাস্থ্যবিধি না মেনে সৈকতে চলা ফেরা করতে দেখা যায়। ২০২১ সালের প্রথম দিন সরকারি ছুটির দিন হওয়াতে আরো পর্যটক বেড়ে যায়। এদিকে পর্যটক সমাগম হলেও স্থানীয় প্রশাসন সৈকতে নামার স্থান গুলোতে বসানো হয়নি জীবানু নাশক টেনেল্
বছরের শেষ দিনটি দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে কাটাতে এসেছে কক্সবাজারে কয়েক লাখ পর্যটক। গতকাল সন্ধ্যায় ককসবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট, সায়মন পয়েন্টসহ বিভিন্ন পয়েন্টে লাখো পর্যটকের সমাগম হয়েছে । তবে অধিকাংশ পর্যটকদেও সাথে সাথে অভিজাত হোটেল কর্তৃপক্ষও স্বাস্থ্যবিধি মানছেনা।
করোনা মহামারি দীর্ঘ ৫মাসেরও অধিক সময় জনবিচ্ছিন্ন ছিল কক্সবাজারের পর্যটন স্পটগুলো। করোনা প্রাদুর্ভাবে গত ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ হওয়া পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ প্রায় ৫ মাস পর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পরীক্ষামূলক খুলে দেওয়া’ হয় ১৭ আগস্ট। স্বাস্থ্যবিধি মানা সাপেক্ষে সীমিত আকারে চালু হওয়া পর্যটনে এখন সরগরম। তবে আগত পর্যটকরা স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদাসিন।
এদিকে সাপ্তাহিক ছুটির ও বছরের প্রথম দিন হওয়াতে পর্যটকে টইটম্বুর সৈকতের বালিয়াড়ি।বছরের প্রথমদিনের ছুটিতে লোকারণ্য হয়ে উঠছে। ফলে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে পূর্ণ হয়ে গেছে সৈকত তীরের হোটেল-মোটেল-কটেজ ও গেস্ট হাউজগুলো। অসময়েও মাসে শতকোটি টাকার বাণিজ্য করছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এধারা অব্যাহত থাকলে করোনার প্রথম ধাক্কার ক্ষতি পুষিয়ে উঠার সম্ভাবনা দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
শুক্রবার ভোর থেকে সৈকতে ভিড় করেছেন নানা বয়সী পর্যটক। তবে সিংহভাগ পর্যটকই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না বলে অভিযোগ করেছে সৈকতে দায়িত্বরত লাইফগার্ড কর্মীরা।
এরপরও, বেড়াতে আসা পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য সেবা দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। আর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সার্বক্ষণিক কাজ করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ এবং জেলা প্রশাসন।
আগত পর্যটকরা সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি দরিয়ানগর, হিমছড়ি ঝর্ণা, ইনানীর পাথুরে সৈকত, রামু বৌদ্ধ বিহার, মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরসহ জেলার পর্যটন স্পটগুলোতেও ঢুঁ মারছেন।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজারের প্রায় সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে রয়েছে, যেখানে লক্ষাধিক পর্যটক অবস্থান করতে পারেন। সাপ্তাহিক ছুটিতেও প্রায় লাখো পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। শতভাগ বুকিংয়ে জমজমাট ব্যবসা করছে তারকা হোটেলগুলো।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এই মানুষদের যেমন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোন প্রবণতা দেখা যায়নি । আবার স্বাস্থ্যবিধি নজরদারি করার মতো নেই কোন ব্যবস্থা। পর্যটকদের এমন ভিড় দেখে স্থানীয়রা আতঙ্কে আছেন যেকোনো মুহূর্তে ভাইরাসের হটস্পটে পরিণত হতে পারে তাদের আবাসস্থল।
এদিকে কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি সূত্র জানায়, আগত পর্যটকদের সেবা নিশ্চিতে সর্তক অবস্থায় দায়িত্বপালন করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ। সাপ্তাহিক ছুটিতে পর্যটক সমাগম বাড়ে দেখে মোতায়েন রাখা হয় অতিরিক্ত পুলিশও। পর্যটক হয়রানি রোধে পর্যটন স্পটগুলোকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত সাধারণ চিকিৎসা ও খাবার পানির ব্যবস্থা রয়েছে সমুদ্র সৈকতে। গোসলকরাকালীন বিপদাপন্ন পর্যটকদের রক্ষার্থে সর্তক অবস্থায় রয়েছেন লাইফগার্ড কর্মীরা।
ঢাকা থেকে আসা রুবেল জানান, অনেকদিন ঘরে ছিলাম করোনার কারণে মনে করেছিলাম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এসে প্রানভরে নিঃশ্বাস নিব। এখানে এসে দেখি লাখো পর্যটকের ভীড়। দুঃখ হচ্ছে প্রশাসনের কোন খেয়াল নেই । যারা মাস্ক বিহীন আসছে তাদের সমুদ্রে নামতে বাধা দেওয়া উচিৎ এই সময়ে।
সি-সেইফ লাইফগার্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ ওসমান বলেন, বছরের প্রথম দিনে পর্যটকদের ভীড় ভেড়েছে। শুক্র ও শনিবার হওয়াতে এই মাত্রা বেড়েছে দুইগুন। করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রতিনিয়ত মাইকিং করা হলেও বালিয়াড়িতে আসা পর্যটকদের অধিকাংশই মাস্ক পরে না। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় অব্যাহত রাখলেও পর্যটকরা সচেতন হচ্ছেন না। এদিকে করোনা কালিন সময়ে সমুদ্র সৈকতে স্থানীয় প্রশাসন জনসচেতনতায় কাজ করছে বলে জানান।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সবসময় সর্তকাবস্থায় রয়েছে পুলিশ। পর্যটকরা যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার না হন, পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোষাকে এবং পর্যটক বেশে পুরুষ-মহিলা পুলিশের সংখ্যাও সৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সৈকত এলাকায় পোশাকধারী পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের বিশেষ রেসকিউ টিম, ইভটিজিং কন্ট্রোল টিম, ড্রিংকিং জোন, দ্রুত চিকিৎসাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তায়। সৈকতে বিচ বাইক নিয়ে টহল অব্যাহত রেখেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। রয়েছে ৩টি বেসরকারি লাইফ গার্ড সংস্থার অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড কর্মী। কন্ট্রোল রুম, পর্যবেক্ষণ টাওয়াসহ পুরো সৈকতে পুলিশের নজরদারির আওতায় রয়েছে।
জেলা প্রশাসন সুত্র বলছে, অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা চিন্তা মাথায় রেখে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ‘পরীক্ষামূলক খুলে দেওয়া’ হয়। এখন পর্যটন মৌসুম। আবার করোনার দ্বিতীয় ফ্লো-র শঙ্কার কথাও ঘোষণা এসেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা রোধের পাশাপাশি পর্যটনটাও এগিয়ে নিতে হবে। সেভাবেই পর্যটন সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়া রয়েছে। সবাই আন্তরিক হলে পর্যটন ব্যবসা ঠিক রেখে করোনা রোধ সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করেন।

 

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.