রোহিঙ্গা: সীমান্ত খুলে দেওয়া যায় যদি…
সামাজিক যোগাযোগের পাতায় পাতায় একটি ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আহ কি শান্তির ঘুম-এ চলে গিয়েছে মানব শিশুটি। ক’দিনের জন্য দুনিয়াতে এসেছিল সে, দেখেছে কিছু কালো মানুষ, কালো পৃথিবী, কালো অন্ধকার, কালো মানবতা, কালো সমাজব্যবস্থা, কালো রাজনীতি, কালো ধর্মচর্চার আড়ালে মানুষ হত্যার স্পৃহা। সেগুলো দেখেই ভেগেছে শিশুটি, এখনো তার রং বেরং এর জামাটা মলিন হয়নি এতটুকুও। পানির উপরে ভেসে থাকা তার শান্ত দেহখানি তার মাথাটি ডুবিয়ে নেয়নি, বরং এই মায়ায় ভরা মুখখানি আমাদের একটু দেখিয়ে দেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে, মানুষ হিসেবে আমরা কতখানি অসভ্য।
ভূমধ্যসাগরে আয়নালের এমন একটি উপুড় হয়ে থাকা ছবি নিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। সারা বিশ্বের তাবৎ গণমাধ্যম সেই ছবি নিয়ে কেঁদেছিল, কান্না বাড়িয়েছিল। এই পৃথিবীর থমকে যাওয়া মানবতাবোধকে কিছুটা জাগিয়েছিল সেই ছবি।
তার পরেই ইউরোপের সীমান্ত জুড়ে জমে থাকা শরণার্থীদের মধ্যে কয়েক লাখ মানুষের জায়গা হয়েছে জার্মানী কানাডা সহ অন্যান্য দেশে। খুব ভালো আছে তারা তেমনটি নয়, অন্তত তারা বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছে।
বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তের পারে, নো ম্যানস ল্যান্ড বা কোন দেশের ভূমি নয়, এমন ভূমিতে এই মানুষগুলো দিনের পর দিন বসে আছে, অপেক্ষা করছে। কোন একটি দেশ তাদের একটু আশ্রয় দিক। হয় মিয়ানমার, অথবা বাংলাদেশ। সেই আশ্রয়প্রার্থী পরিবারের-ই একটি শিশুর ছবি হতে পারে এটি। এ নিয়ে বেদনার কমতি নেই।
কিন্তু এই বেদনার প্রেক্ষিতে মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ না করেই, শুধু্ই সীমান্ত খুলে দেয়াতে কি সমাধান লুকিয়ে আছে? আসুন একটু বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চাপে আশ্রয়হীন লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছিল ভারত। এমন আরো অনেক দেশেই হয়।
কিন্তু শুধু সীমান্ত খুলে দেয়নি ভারত, বরং বাংলার মাটি থেকে নির্যাতনকারীদের বিতাড়িত করতে সব রকম সামরিক, কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছিল। আমরা কি বর্তমানে মিয়ানমার সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপে ফেলার কোন রকম পদক্ষেপ নিচ্ছি?
মিয়ানমার সরকারকে এ অন্যায় কাজ বন্ধ করার কোন কূটনীতি করছি? রোহিঙ্গাদের স্বাধীনতা বা স্বাধীকার আন্দোলনে কোন মদদ দিচ্ছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া জরুরী, সীমান্ত খুলে দেয়ার আবেগপূর্ণ কথা বলার আগে।
এর আগে আমরা এমন অবস্থাতেই বার বার সীমান্ত খুলে দিয়েছি, আর তাতে একটু একটু করে এই দেশের মাটিতে রোহিঙ্গা মানুষ জমেছে প্রায় ৪ লক্ষ। শুধুমাত্র টেকনাফ সীমান্তেই বসবাস করছে তিন লক্ষ মানুষ, বাকীরা মিশে গেছে আমাদের সমাজের সাথে, মূল ধারার সাথে। সেই কবেকার কথা, কিন্তু তারা কি ফিরতে পেরেছে তাদের নিজ দেশে?
মিয়ানমার সরকার কি কোনদিন ফেরত নেবে এই সকল নাগরিককে? তারা তো রোহিঙ্গাদেরকে নিজ দেশের নাগরিক বলে মর্যাদায় দেয়নি এখনো। এই তো ২০১৭ সালের মার্চ মাসে মিয়ানমার এর বর্তমান সামরিক প্রধান একটি ভাষণে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন বিশ্বকে যে, রোহিঙ্গারা এদেশের নাগরিক নয়। ওরা নাকি মিয়ানমারে অবৈধ ভাবে বসবাস করছে।
বরং তাদেরকে বাঙালী বলে সম্বোধন করা হয়েছে সেনা প্রধানের ঐ ভাষণে। তবে এবার শুধু তো নয়, ১৯৮২ সালের মিয়ানমার নাগরিকত্ব আইনে তাদেরকে রাখা হয়নি, এমনকি দেশের একমাত্র আদম শুমারী যেটি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে মিয়ানমারের ১৩৪টি জাতিগোষ্ঠীর সবাইকে গণনা করা হয়েছে, শুধু বাদ দেয়া হয়েছে আরাকান এর রোহিঙ্গাদের।
তারা ঐ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পান না, সরকারী বিধি বিধান মেনে ব্যবসার সুযোগ পান না, এমনকি রাস্তাঘাটে নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ পান না।
নিজভূমে যখন পরাধীন সেখানকার ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম, তো সেখানে নিজ আবাস ভূমি গড়ে তোলার যুদ্ধে নাম লিখিয়েছে তারা। আরাকান লিবারেশন আর্মি’র নামে নানা জায়গায় হত্যা, হঠাৎ আক্রমণ চালাচ্ছে। যার প্রেক্ষিতে আবার আরাকানে চলছে বর্বর নিধন এবং হত্যাযজ্ঞ।
এবং এটা চালানোর মাধ্যমেই একটা মুসলিম শুন্য জাতিতে পরিণত হওয়ার মিশন দেশটির সেনাবাহিনীর এবং একই সাথে উগ্রপন্থার বৌদ্ধ মোল্লাদের।
মান্ডেলে নামক জায়গার বৌদ্ধ ধর্মগুরু আশিন ওরাথু, যাকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হয়েছিল যে, সন্ত্রাসী বৌদ্ধের প্রতিমূর্তি, তিনি গতবছর একটি সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ‘বার্মার দুটি সমস্যা। একটি হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, আরেকটি হলো মুসলিম আগ্রাসন বন্ধ করা। তারা এই দেশটি দখলে নেবে একদিন। খ্রিস্টান, হিন্দুদের সহ্য করা যায়, মসুলিমদের নয়, কেননা তাদের অন্তরে আছে শুধুই ঘৃণা।’
এই একই অবস্থান তাদের নেত্রী অং সান সু চির। তিনি জাপানে গিয়ে এ সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন, ‘তাদেরকে (রোহিঙ্গা) আমাদের মূল ধারায় নেয়ার সুযোগ কই, তাদেরকে আমরা অস্বীকার করছি না কিন্তু সেখানে (রাখাইন রাজ্য) কোন আইনের শাসন নেই। সেখানে যদি তাদের সহযোগিতার জন্য আমরা, বার্মিজ জনগণ পৌঁছাতে না পারি, সেখানে গেলেই যদি আক্রমণের ভয় থাকে তাহলে তো সম্পর্কের সেতুবন্ধন হবে না। তাই খুব বিরক্তির শোনালেও সেখানে আইন প্রতিষ্ঠিত করাটাই বড় কাজ, বাকী গুলো গৌণ কাজ।’
আসলেই একপাক্ষিক সত্যের কথা বলেছেন সু চি। সেখানে আরাকান লিবারেশন আর্মি হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। ঠিক যেমন নিয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। বাংলাদেশ সরকার তাদের দাবী দাওয়া শুনতে চেয়েছিল। শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। আপাতত সেখানে আগের মত যুদ্ধ পরিস্থিতি নেই, তবে পুরোপুরি শান্তি এসেছে বলা যাবে না।
কিন্তু মিয়ানমারে আরাকান লিবারেশন আর্মিকেই কেবল শত্রু হিসেবে দেখছে না দেশটির সরকার, দেখছে পুরো একটি সম্প্রদায়কে। যে কারণে তাদের দেশের বাদ বাকী ১৩৪ নৃতাত্বিক গোষ্ঠীকে তারা দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করলেও, একমাত্র ব্যতিক্রম রোহিঙ্গাদের বেলায়।
দেশটির সামরিক বাহিনী প্রধান বলে দিয়েছেন যে এরা এই দেশের জনগণ নয়, সেখানে সু চির করার-ই বা কি আছে আংশিক সত্য কথা বলা ছাড়া? জানেন নিশ্চই, মিয়ানমারে সীমিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাবে এখনও সংসদের ২৫ শতাংশ সিট সেনাবাহিনীর। দেশটির স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা আর সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে এখনও সেনাবাহিনী, নির্বাচিত অং সাং সু চি সরকার নয়। অতএব, সু চি সেখানে পুতুল সরকার মাত্র।
এখন আসি কাজের কথায়। তাহলে এর সমাধান কোথায়? এই নৈরাজ্য, এই মৃত্যু, এই মানবতার হানি যে ঘটছে সেটা নিয়ে কোন সমাধান কি আছে? আসলেই এই প্রশ্নের উত্তর নেই। সাম্প্রতিক এই হত্যাযজ্ঞের পর হাজার হাজার রোহিঙ্গা যে পালিয়ে আসছে প্রাণভয়ে, সেটা অল্প হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
সেই কাজটিই বেশি বেশি ত্বরান্বিত করতে পারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত যেমন করেছিল, বিশ্ববাসীর বিবেক জাগ্রত করতে সাহায্য করেছিল, সেটিই বাংলাদেশ করতে পারে যেহেতু এটা প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে বাংলাদেশকে।
এরই মধ্যে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ জন ফ্রান্সিস বিবৃতি দিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের উপর চলা নির্যাতন বন্ধে অন্যান্য দেশকে চাপ্র প্রয়োগে আহবান জানিয়েছেন। আর কেউ টু শব্দটি পর্যন্ত করছে না। না মুসলিম বিশ্ব, না মালয়েশিয়া না তুরস্ক। কারো দায় নেই যেন এই রাষ্ট্রীয় নিগৃহীত সম্প্রদায়টির প্রতি।
মিয়ানমার সরকার বার বার চাচ্ছে এই আপদগুলোরে ঝেটিয়ে বিদায় করে দিতে। তারা জানে সীমান্তে মানবিক পরিস্থির সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ তাদেরকে গ্রহণ করবে। একবার সেটি করতে গিয়ে চার লক্ষ মানুষ ঢুকে পড়েছে এই দেশে। তাদেরকে কয়েক দশক ধরে পুষতে হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে চাকুরী, কাজ, জীবন জীবিকায় তারা প্রভাব ফেলছে। এর বাইরে আরো সমস্যা আছে।
৫৬ হাজার বর্গকিলোমিটার সীমার মধ্যে বাস করে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ। প্রতিদিন শত শত মানুষ মরছে, হয় অপুষ্টিতে, না হয় গাড়ী দূর্ঘটনায়, না হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে। এতবড় বন্যার ধকল কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে আমাদের থুবড়ে পড়া অর্থনীতি। আমাদের অভূক্ত মানুষগুলোকে স্বস্তির কোন উন্নয়ন দিতে পারছে না সরকার। এমনকি প্রতিটি রাস্তা ঘাট অন্যান্য ভৌত অবকাঠামোর দুরবস্থা বাড়ছে।
বন্যা আর ভারী বর্ষণে দেশের বেশিরভাগ সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় আবার যদি একে একে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে শুরু করে বাংলাদেশ, তাহলে পেয়ে বসবে মিয়ানমারের ঘাতক সেনাবাহিনী। কারণ তারা তো এতদিন ধরে সেটাই চাচ্ছে, যে কারণেই তারা থেমে থেমে আক্রমন চালাচ্ছে এই মানুষগুলোর উপর। তারা চায়, নির্যাতন সইতে না পেরে এই ‘বাঙালী’গুলো চলে যাক সীমান্তের ওপারে।
পৃথিবীতে আর কোন দেশে এমন নৃতাত্বিক জাতিগোষ্ঠী আছে কিনা সন্দেহ যেই দেশে তারা নাগরিক বলে স্বীকৃত নয়। একবার চিন্তা করে দেখুন, বাংলাদেশের যেসব রাখাইন সম্প্রদায় আছে, তারাও কিন্তু রাখাইন থেকে আগত হলেও এই দেশের স্বীকৃত নাগরিক। কিন্তু খোদ রাখাইনের আবাসভূমিতে রোহিঙ্গা নৃতাত্বিক গোষ্ঠীরা কিন্তু নাগরিক বলে স্বীকৃতি পাচ্ছে না।
অথচ, তারা সেখানে বসবাস শুরু করেছিল শত বছর আগে। আজকে তাদেরকে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। তাই সীমান্ত খুলে দেয়া না, দরকার তাদের নিজেদের আবাস ভূমি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারা। সেটা করতে কি প্রয়োজন, তা নিশ্চই খুলে বলার অবকাশ কম।
আমাদের জলন্ত উদাহরণ ১৯৭১ সাল। ভারত সীমান্ত খুলে দিয়েছিল সামনে, আর সামনে থেকেই বাংলার মানুষকে মুক্ত এক দেশ উপহার দিতে এগিয়ে এসেছিল। বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেবার আগে চিন্তা করুক, তারা রোহিঙ্গাদের স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে কিনা।
কেননা, ঐ দেশের সীমানায় ১৯৮২, ১৯৯২, ২০১৪ এবং সর্বশেষ সু চির আমলে ২০১৭ সালে এসেও তাদেরকে নাগরিক বলে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। নিজস্ব ভূখণ্ড ছাড়া, এই মানুষগুলোর মৃত্যুই দেখবে বিশ্ব। এমনি এমনি সীমান্ত খুলে দেয়াতে সমাধান নেই।
নিউইয়র্ক ২৯ আগস্ট ২০১৭
সাহেদ আলম : সাংবাদিক।
shahedalam1@gmail.com

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.