শাহীন মাহমুদ রাসেল:
শীতের কুয়াশা ভেদ করে পূর্ব দিগন্তে হালকা উঁকি দিচ্ছে নতুন দিনের সূর্য। মিঠেকড়া নরম রোদ গায়ে মেখে নতুন বইয়ের গন্ধে উচ্ছল-মতোয়ারা লাল-সবুজ নীল কাপড় পরা শিশু শিক্ষার্থীরা। নতুন বছরে নতুন ক্লাসের হাতছানির সঙ্গে হাতে নতুন বই পেয়ে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে তারা। পাঠ্যবই বুকে চেপে, কাঁচা গন্ধ শুঁকে বিদ্যালয় আঙিনায় সহপাঠীদের সঙ্গে শিশুরা ভাগ করে নেয় নির্মল আনন্দ।
হাতে নতুন বই। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার পর স্কুল প্রাঙ্গণে সহপাঠীদের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে ওঠার সুযোগ। এ দুই প্রাপ্তিতে মহা খুশি কক্সবাজারের গ্রামীণ জনপদের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।
মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে এবার প্রথাগত বই উৎসব হচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রেণিকক্ষেই বই বিতরণ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুন বই পেয়ে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়া শুরু হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা অফিসগুলো বই বিতরণের প্রস্তুতি নেয়। স্কুলে স্কুলে শিশু শ্রেণি থেকে ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বিতরণ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারে শুক্রবার (১ জানুয়ারি) কক্সবাজার সাহিত্যিকা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই বিতরণ অনুষ্ঠান উদ্ভোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।
করোনার কারনে গোটা বিশ্বের শিক্ষার্থীরা যখন ইংরেজি নববর্ষে তেমন কোন বিনোদন উপভোগ করতে পারেনি ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের কোটি কোটি শিশু নতুন ক্লাসের বই হাতে নির্মল উৎসবে মেতে ওঠে।
পাঠ্যপুস্তক বিতরণের এই উৎসব সারা বিশ্বের শিক্ষাক্ষেত্রে একেবারেই বিরল। গ্রামীণ জনপদে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দৃশ্যমান কোনো উৎসবের আয়োজন না থাকলেও সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনগুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বলে দিয়েছে নতুন কিছু পাওয়ার আনন্দ কতোটা। একইসঙ্গে অভিভাবকদেরও যেন আনন্দের কোনো কমতি ছিলো না।
কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ খরুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জুঁই’র বাবা শরিফ বলেন, সরকারের এই উদ্যোগের ফলে যারা বিত্তবান, মধ্যবিত্ত, হতদরিদ্র সবাই এককাতারে এসেছে। অনেকে বছরের এই সময় হয়তো সব বই কিনতে পারতো না, কিন্তু এখন সবাই বিনামূল্যে সরকারের পক্ষ থেকে বই পাচ্ছে। বছরের প্রথম দিনে বই পেয়ে পড়ালেখায় আগ্রহ বাড়ছে সকলের সন্তানদের, বাড়ছে ভালো ফলাফল ও বৃত্তির সংখ্যা। তাই অভিভাবকরাও নিশ্চিন্তে সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারছেন।
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা এই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী শিউলী জানায়, নতুন দিনে নতুন বই পাওয়াটা কতোটা আনন্দের তা বলে বোঝানো যাবে না। নতুন বই হাতে পাওয়ার জন্য কয়েকদিন আগে থেকেই মনের ভেতর আলাদা একটি আনন্দ কাজ করছিলো। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিদ্যালয়ের আসার জন্য তৈরি হয়েছি। এখন বই পেলাম। তাই আজ থেকেই বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখা শুরু হবে, ২/১ দিনের মধ্যেই পড়াশুনাও শুরু হয়ে যাবে।
পূর্ব খরুলিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী আঁখি আক্তারের মা নিলোফা বেগম বলেন, নতুন বছরে নতুন ক্লাসে উঠেই নতুন বই পাবে মেয়ে। করোনার কারণে কোন আয়োজন না থাকলেও স্কুলের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের মিষ্টি খাওয়ানো হয়েছে।
একই বিদ্যালয়ের প্যারেড গ্রাউন্ডে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসমিনা, দ্বিতীয় শ্রেণির আঁখি, সাবিহা, চতুর্থ শ্রেণির শ্রাবনীসহ অনেকেই সকাল ৯টার দিকে বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলো বই পাওয়ার জন্য। বই পাওয়ার পর বড়দের মতো তারা মুখ ফুটে আনন্দের কথা বলতে না পারলেও, একচিলতে হাসি বলে দেয় তাদের আনন্দের কথা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা জানান, গ্রামীণ জনপদে বই উৎসবটা মনের ভেতরের আনন্দেই আলোকিত হয়। এখানে সন্তানদের সঙ্গে অভিভাবকরাও আসেন বই নিতে। কথা আর আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে হাস্যোজ্জল হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: আসাদুজ্জামান চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া শুরু হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত কতজন শিক্ষার্থী বই পেল এবং এবার কয় লাখ বই বিতরন করা হবে তেমন কোন তথ্য তিনি জানাতে পারেন নি।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.