আর্জেন্টিনা: নরক থেকে স্বর্গে ফেরা!

ওয়ান নিউজ ক্রীড়া ডেক্সঃ নীল-আকাশি আর্জেন্টাইন জার্সি পরে একটা সেলফি। ক্যাপশনে লেখা রাশিয়া বিশ্বকাপের শেষ দিন তো, তাই এই ছবি। আর তাহলে জ্বালাবো না!’

আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকেট পাচ্ছে না-এটা ধরেই নিয়েই এমন আক্ষেপ এক ভক্তের। শেষবারের মতো নীল-আকাশি জার্সির উত্তাপ নেয়া আর কি! একটু অনুভব করলেই বোঝা যায় এই আক্ষেপে কি প্রচন্ড আবেগের তীব্রতা! নিঃস্বার্থ ভালবাসার দিনানিপাত!

কি অসহনীয় সময়ই না কেটেছে পেছনের ক’টা দিন। আর্জেন্টিনার নামটাই বদলে গেল ঠাট্টা, মস্করায়; আর-জেতে-না!

বুকে একরাশ নরক যন্ত্রণা কিন্তু মুখে কাষ্ট হাসি ঝুলিয়ে সেই ‘শাস্তি’ মেনে নেয় আর্জেন্টিনার ফুটবলার এবং ভক্তরা। শুরুর দুই ম্যাচে দল খেলেছেই আসলে এমন ছন্নছাড়া ফুটবল যে গঞ্জনা তো শুনতেই হবে। তবে সেই যন্ত্রণার আগুনে না যতখানি পুড়েছেন ভক্তরা, তারচেয়ে অনেক বেশি কষ্টের দহনে জর্জরিত ছিল আর্জেন্টিনা ফুটবল দল।

আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে মেসি একটু বেশিই! পাঁচবারের বিশ্বসেরা ফুটবলারের ট্রফি জেতার পরও অনেকে মেসি যোগ্যতা, প্রতিভা নিয়ে বেহুদা প্রশ্ন তুলতে শুরু করে দেন। অবাক করার বিষয় হল সমালোচকদের এই তালিকায় শুধু গোঁয়ার গোবিন্দ ঘরানার লোকজনই যে ছিলেন তা নয়-অনেক ডাকাবুকো বাবুরা পর্যন্ত মেসির নাম উচ্চারনের সময় এমন তাচ্ছিল্য করেন যেন বিশ্বকাপ থেকে তারা ‘মাছি’ তাড়াচ্ছেন!

গোল আসছে না। পেনাল্টি মিস। দল ভালো করছে না। কোচের খামখেয়ালিপনা আছে। আক্রমণে গতি নেই। দলের চেষ্টায় ঘাটতির ছাপ স্পষ্ট। এক ড্র ও আরেকটা বড় হার নিয়ে প্রথম রাউন্ডেই দল খাদের কিনারায়। বিদায়ের বাঁশি বাজল বলে! আর এহেন চরম দুঃসময়ে চারধার থেকে সমালোচকদের তীব্র তুবড়ি। জন্মদিনের কেক আগে কখনো এত তেঁতে মনে হয়নি মেসির কাছে। ২৪ জুন ছিল তার ৩১ তম জন্মদিন। মনে হচ্ছিল যেন চারধার থেকে পৃথিবীর সব দেয়াল তার দিকে ধেঁয়ে আসছে। ক্রমশ মুক্তি পথ, এমনকি নিঃশ্বাস নেয়ার অক্সিজেনও ফুরিয়ে যাচ্ছে! এমন অসনীয় এক নরক যন্ত্রণা নিয়ে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে বাঁচা-মরার ম্যাচে নামতে হয় মেসিকে, আর্জেন্টিনাকে।

নরক থেকে মুক্তির প্রথম পথও দেখল আর্জেন্টিনা সেই অপ্রতিরোধ্য মেসির বাঁম পা-ডান পায়ের জাগলিং গোলে! সেই তৃপ্তি, সেই সুখ নিয়ে ফিরল আর্জেন্টিনা মাঝ বিরতিতে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পেনাল্টিতে নাইজেরিয়ার গোল শোধ করতেই আরেকবার আর্জেন্টিনা স্বর্গে ফেরার পথ হারাল! তবে আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপে এই প্রথমবারের মতো কোন ম্যাচ খেলল হৃদয় দিয়ে। বিতর্ক হতে পারে তবু বলছি স্কিল এবং স্টাইল আপনাকে প্রতিদিন ফুটবল মাঠে ম্যাচ জেতাবে না। তবে সেই সামর্থ্যকে রক্ত কণিকায় জেদ, জোশ, প্রচেষ্টা এবং অতি অবশ্যই হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসার সংমিশ্রণ ঘটালে পিছিয়ে থাকা লড়াইয়ে জেতা যায়। আর্জেন্টিনার জয় নতুন করে আমাদের আরেকবার সেটাই জানাল। মাচোরানোর চোয়াল চিরে নামা লাল রক্ত শুধু একটা মামুলি আঘাতের চিহ্ন নয়; ওতেই যে লেখা আর্জেন্টিনার মুক্তির গান!

গোল করার পরই প্রায় সময় দু’হাতের তর্জনি মেলে দু’হাত উপরে উঠিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান মেসি। নাইজেরিয়া ম্যাচে নামার আগে খুব বেশি করে ঈশ্বরকে নিজের পাশে চেয়েছিলেনও, পেলেনও তাই। কৃতজ্ঞতার সুরে মেসি নিজেও তাই জানালেন-‘জানতাম ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন। আমাদের ছেড়ে তিনি যাবেন না। ঠিক মনে করতে পারছি না, আগে কখনো এমন দুঃসহ অবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি কিনা। আসলে পরিস্থিতিই আমাদের এমন কঠিন সময়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারাটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটা মুক্তি!’

হাসতে ভুলে যাওয়া আর্জেন্টিনা ও মেসির মুখে এখন শিশুর সারল্য ভরা স্বর্গীয় হাসি। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, একে অন্যেকে জড়িয়ে ধরে আনন্দের কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সপ্তাহ জুড়ে টেনশন, অভিযোগ, অনুযোগ, আক্ষেপ-সবকিছুই ধুয়ে মুছে গেল যেন সেই আনন্দ অশ্রুতে!

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাতেই বাসার নিচের গেটে চোখ পড়ল। বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে। সঙ্গে অভিভাবক এক কিশোর। গায়ে নীল-আকাশি জার্সি।

সুখ-স্বর্গ ফিরেছে মর্তে, গোলার্ধের এই প্রান্তেও!

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.