স্কুল বয়সে টানছে সংসারের বোঝা

কাইমুল ইসলাম ছোটন:
বাবা থেকে ও নাই। সকাল থেকে যেতে হয় কাজে। যে বয়সে বন্ধুরা ব্যাগ কাঁধে স্কুলে ছুটে। বন্ধুদের সাথে নিয়ে মানুষ হওয়ার গল্প শুনে, সে বয়সে সংসার চালাতে কাজ করেন এরশাদ উল্লাহ (১২)।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হোয়ানকের বড়ছড়া এলাকার চায়ের দোকানে কথা হয় এরশাদের সাথে। চোখে মুছতে মুছতে শুনাচ্ছেন তার বিষণ্ণ কথা।

বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে থাকেন কক্সবাজার সদরে। এখন আর তাদের খোঁজ নেই না। স্বপ্ন ছিলো বিদ্যালয়ে যাওয়ার, কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। কক্সবাজারের হোয়ানকের বানিয়াকাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর আর বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নাই।

এরশাদ বলেন, মা এখন কাজ করতে পারেন না। মায়ের অল্প আয়ে সংসার না চলায় তাকে কাজ নিতে হয় চায়ের দোকানে। বাড়িতে মা আর ছোট বোন আছেন। বোনের পড়ালেখার খরচ, মায়ের চিকিৎসা খরচ আর পরিবারের দু’বেলা খাবার জোগাড় করতে সে একমাত্র উপর্জনকারী ব্যক্তি।
তবে এরশাদ স্বপ্ন দেখেন, তার বোন ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে।

ওই সন্ধ্যায় ঘামে চিকচিক করা একজন আসছেন সিমেন্ট ভরা ভ্যানগাড়ি চালিয়ে। বয়স ১৩ বছর, ভ্যানগাড়ি চালালে দু’বেলা খাবার জুড়ে পরিবারের।

শুক্রবার সকালে কথা হয় সাগরের সাথে। ৫ বছর পূর্বে অভাবের তাড়নায় বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। বাবা কাজ করে না, সংসারে সে সহ পাঁচ সদস্য।

সাগর বলেন, এখন তেমন কাজ পাই না। পূর্বে ৪০০-৫০০ টাকা পেলে ও, এখন পাই ১৫০-২০০ টাকা। যাতে সংসার চলতে খুব কষ্ট হয়ে যায়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাই না। মে দিবস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, ‘দিবস দিয়ে কি হবে,গাড়ি না চললে তো ভাত’ খেতে পারি না।

একই অবস্থা আইয়ুবের (১৬)। চতুর্থ শ্রেণীর পর আর পড়তে পারে নাই। বর্তমানে ইট ভাঙ্গার কাজ করেন। মাকে হারিয়েছেন অনেক বছর পূর্বে। বর্তমানে বাবা ও কাজ করতে পারেন না। ছোট ভাইকে নিয়ে তাদের ৩ জনের সংসার। আইয়ুবের আয়ে কোনরকম সংসার চলে। অথচ রঙিন দুনিয়ার কারিগর এরা, কিন্তু নিজের জীবন রাঙাতে পারেন না। যেন বাতির নিচে অন্ধকার।

শ্রমিক দিবস প্রসঙ্গে আপন কণ্ঠকে মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে চাকরি করা সেলিম নামে একজন বলেন, কোম্পানির প্রকৃত বেতন আমরা পাই না। অনেকে কমিশন নিয়ে নেয়। যেকোন মুহূর্তে ছাঁড়াই হবার ভয় থাকে। শ্রমিক দিবস বুঝি না ন্যায্য মজুরি চায়।

এমন গল্প প্রতিদিনের। করোনা এই মহামারীতে কারো আয় নেই। পেলে ও কোন রকম সংসার চলে। করোনাকালে শ্রমজীবী মানুষের শঙ্কা কাটে নাই। এখনো দাবি নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি কলিম উল্লাহ কলিম বলেন, কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করেন হোটেল-মোটেল এ। মে দিবসে একটাই দাবি, শ্রমিকদের যেন বেতন-বোনাস দেওয়া হয়। তাদের হোটেল-মোটেলে যেন নিয়োগ পত্র দেওয়া হয়।

তিনি আরো বলেন, হোটেল-মোটেল কর্মচারীদের যেন কর্মঘন্টা নির্ধারণ করা হয় এবং তাদেরকে সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া হয়।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে জানতে চাইলে এড.হামিদুল হক জানান ” বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এ শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরীর হার নির্ধারণ, মজুরী পরিশোধ, কার্যকালে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের জখমের জন্য ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্প বিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও চাকুরীর অবস্থা ও পরিবেশ এবং শিক্ষাধীনতা ইত্যাদির কথা থাকলেও মালিকরা তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়া শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় উদাসীন ও অনেক ক্ষেত্রে শোষন করে থাকে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার যদি বদ্ধপরিকর না হয় তাহলে শ্রমিকরা সারা জীবন অবহেলিত থাকবে। তাছাড়া, শ্রমিকদের সংগঠনগুলোর অবস্থান শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আরও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে হবে।

উল্লেখ্য যে, ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী বছর থেকে ১ মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশে মে দিবস সরকারি ছুটির দিন। এছাড়া বেশ কিছু দেশে বেসরকারিভাবে পালিত হয় এ দিবসটি।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.