ডেস্ক নিউজ:
শিক্ষা ও মেডিকেল সনদপত্রে তথ্যের গড়মিল দেখিয়ে চাকরির মেয়াদ শেষেও নিজ পদে পুনর্বহাল রয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক কর্মকর্তা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক লোকসানের পাশাপাশি থমকে গেছে ওই পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া ।
অপরদিকে চাকরির মেয়াদের দু বছর আগে এক কর্মচারীকে জোরপূর্বক অবসর পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। সিভয়েসের অনুসন্ধানে এমন দুই কর্মচারীর চাকরির কাগজপত্রের বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে এসব উঠে এসেছে।
বয়সের মেয়াদ পার :
১৯৭৫ সালের ১৬ জানুয়ারি পিয়ন পদে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন মো. মুজিবুর হোসেন। বর্তমানে তিনি কর্মরত আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিয়ামকimageদপ্তরের সেকশন অফিসার পদে। যোগদান কালে মুজিবুর আবেদনপত্রে স্পষ্টভাবে বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করেন। ওই হিসেবে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হিসেবে করা হলে তিনি চাকরি জীবনে ৪৫ বছরের বেশি সময় পার করেছেন। সরকারি চাকরি বিধি মোতাবেক কোনো অফিসার ৪৪ বছরের বেশি সময় চাকরি করতে পারেন না। সেশন বেনিফিটসহ ২০১৯ সালের ৩০ জুন তাঁর অবসর যাওয়ার বাধ্যতামূলক ছিল। অথচ সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে প্রায় ১৪ মাসের বেশি সময় ধরে তিনি সেকশন অফিসার পদে চাকরি করে চলেছেন।
মেডিকেল সনদপত্রে তথ্যে ভুল :
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুজিবুর রহমান চাকরির যোগদানকালে মেডিকেল সনদে জন্মতারিখ উল্লেখ করেন ১৯৫৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর। তবে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষার সনদে জন্মতারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ রয়েছে। চাকরির আবেদনপত্রে ১৮ বছর থাকলেও, যোগদানের তারিখের সাথে মেডিকেল সনদের জন্ম তারিখের হিসেবে তারতম্য করলে চাকরিতে যোগদানের সময় বয়স হয় ১৬ বছর ৪ মাস ১৫ দিন।
মুজিবুরের শিক্ষাগত সনদপত্রের জন্মতারিখের সাথে চাকরিতে যোগদানের তারিখ পার্থক্য করলে বয়স দাঁড়ায় ১৬ বছর ৩ মাস আঠাশ দিন। অর্থাৎ কোনো কাগজপত্রের হিসেবেই বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি। নিয়মানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির আবেদনের জন্য প্রার্থীর ১৮ বছর পূর্ণ হতে হবে। কিন্তু মুজিবুরের ১৮ বছর পূর্ণ না হলেও, আবেদনপত্রে তিনি বয়স দেখিয়েছেন ১৮ বছর। যা চাকরির বিধি পরিপন্থী বলে মনে করছেন অনেকে।
তথ্যের গড়মিলের বিষয়টি সিভয়েসের কাছে একপ্রকার স্বীকার নেন মুজিবুর রহমান।
তিনি বলেন, ওই সময় সরকারি চাকরির যোগদানের বিষয়ে কোনো বাধা ধরা বয়স ছিল না। হয়তো ভুলবশত সাল দিয়ে দিয়েছি। আর মেডিকেল সনদে কোনো ভাবে ভুল হতে পারে, খেয়াল করিনি। সরকারি অফিসারে ৪৪ বছরের বয়সের বিষয়টি তিনি জানেন না বলেও জানান।
বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩৮ তম সিন্ডিকেট সভার ৩০ নম্বর সিদ্ধান্তে বিভিন্ন অফিসে কর্মরতদের যোগদানের সময় মেডিকেল সনদপত্র অনুযায়ী জন্মতারিখ এবং মাধ্যমিক (এস.এস.সি) সনদপত্রের জন্মতারিখ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক হাসানুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধান করে চার সদস্যের এ কমিটিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে বিভিন্ন অফিসে কর্মরতদের যোগদানের সময় মেডিকেল সনদপত্র অনুযায়ী জন্মতারিখ এবং মাধ্যমিক (এস.এস.সি) সনদপত্রের জন্মতারিখ গড়মিল থাকায় ছয়জনকে খুঁজে বের করেন। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী অবসর, অতিরিক্ত বেতন কর্তনসহ কমিটি বেশ কিছু নির্দেশনা প্রদান করেন।
এছাড়া তৎকালীন সিন্ডিকেটের ওই নিয়ম অনুসরণ করে গত বছরের জুন মাসে মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগে ওয়ার্কশপ টেকনিশিয়ান পদে দায়িত্ব পালন করা রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে অবসরে পাঠানো হয়।
জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম সিভয়েসকে বলেন, যোগদানের সময়, জাতীয় পরিচয়পত্র ও শিক্ষাগত সনদে (অষ্টম শ্রেণি) কোনো ভুল বা গড়মিল নেই। যোগদানকালে চাকরির বইয়ে এতকিছু না ভেবে আমি সম্ভবনাময় একটা জন্মসাল বসিয়ে দিই। অবসরের দুই বছর আগে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং শিক্ষাগত সদনপত্রের সাথে চাকরি বইতে উল্লেখিত জন্মতারিখের সমন্বয় করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠিও দিই। এমনকি আমার কাগজপত্র পর্যোলোচনা করতে মেরিন সায়েন্সে অ্যান্ড ফিশারিজের তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহাদাত হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ জানান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে না নিয়ে আমাকে চাকরি বইয়ের জন্মতারিখ অনুযায়ী অবসরে পাঠিয়ে দেয়। যোগদানের তারিখ হিসেব করলে আমি ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত চাকরি চাকরি করতে পারতাম।
এতসব দৃষ্টান্ত থাকার পরও সেকশন অফিসার পদে কর্মরত মুজিবুর হোসেন স্বপদে বহাল রয়েছেন। আর চাকরির বয়সের পরেও রফিকুলকে ২০১৯ সালে অবসরে পাঠানো হয়। প্রশাসনের এমন দ্বৈত সিদ্ধান্তে জন্ম দিয়েছে নানান প্রশ্নের। ২০০৬ সালে সিন্ডিকেটে গঠন করা কমিটি ভবিষ্যতে এমন বিষয়ে স্পষ্টতা নিরসনে ভবিষ্যতে কর্মচারীদের বয়স ও অবসর গ্রহণের তারিখ নির্ধারণে সঠিকভাবে রেজিস্ট্রার দপ্তরে কম্পিউটারের তথ্য সংরক্ষণে সুপারিশ দিয়েছিল।
যা বলছেন রেজিস্ট্রার:
মুজিবুরের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) এস. এম. অধ্যাপক মনিরুল হাসান সিভয়েসকে বলেন, এসব বিষয়ে লিখিত অভিযোগ আসতে হয়। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তার যদি সরকারি বয়সসীমা অতিক্রম করে থাকে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সময় পার করে চাকরি করলে, তিনি যে খুব লাভবান হবেন তা কিন্তু না। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
আর রফিকুলের অবসর বিষয়ে খোঁজ-খবর নিবেন বলেও জানান রেজিস্ট্রার মনিরুল হাসান। -সিভয়েস।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.