বড় ঝুঁকি এড়ালেও ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলের লাখো মানুষ

ডেস্ক নিউজ: ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ বাংলাদেশে আঘাত হানবে না এটা আগেই জানিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। তবে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড় যে বাংলাদেশেও প্রভাব ফেলবে সেটার পূর্বাভাস অবশ্য দিয়েছিল সংস্থাটি। সেই পূর্বাভাসই বাস্তব হলো। বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেলেও দেশের উপকূলীয় এলাকায় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়োহাওয়ায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সরকারি হিসাব মতে, দেশের নয়টি জেলার কমপক্ষে ২৭টি উপজেলা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপকূলীয় এলাকার লাখ লাখ মানুষ। বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। বাড়িঘর, গাছগাছালি ও ফসলের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বরগুনা ও ভোলায় দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাংলাদেশ এখন ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ থেকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত। ঘূর্ণিঝড়টি আরও উত্তর উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে উপকূলীয় ওড়িশা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্য বিরাজ করছে।

দুপুরে সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশ এখন আর ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের ঝুঁকিতে নেই। এটি বাংলাদেশে আঘাত করেনি। ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল হয়েছে ওড়িশায় আঘাত করেছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পূর্ণিমার কারণে জোয়ারের পানি বেশি ছিল। এ কারণে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ উপচে পানি ঢুকছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ‘ইয়াস’ এর প্রভাবে অতি জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় নয় জেলার ২৭ উপজেলার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হলো সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে- শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, শরণখোলা, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ, মঠবাড়ীয়া, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, পটুয়াখালী সদর, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ, কলাপাড়া, চরফ্যাশন, মনপুরা, তজুমদ্দিন, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, ভোলা সদর, হাতিয়া, রামগতি ও কমলনগর।

চলছে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসকদের অনকূলে পর্যাপ্ত খাদ্য সামগ্রী ও অর্থ বরাদ্দ দেয়া আছে। এছাড়াও ২৭টি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা দিতে ১৬ হাজার ৫০০ শুকনা ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘উপকূলীয় জেলা, উপজেলাসমূহে ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য আদান-প্রদানে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এনডিআরসিসি (জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্র) ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানে সার্বক্ষণিক কাজ করেছে।’

এনামুর রহমান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূটির (সিপিপি) ৭৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াও স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, আনসার ভিডিপির স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছে। ঝড় আঘাত হানলে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত ছিল। মানবিক সহায়তার যথেষ্ট সংস্থান আগে থেকেই করা ছিল। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার জন্য যথেষ্ট মাস্ক এবং স্বাস্থ্য উপকরণ নিশ্চিত করা হয়েছিল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. মোহসীন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে কিছু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রস্তুত করা হয়েছে। আরেকটা সভা করে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন করা হবে। মাঠের কাজ শেষ হলে অল্প সময়ের মধ্যে আমরা সেটা করব।’

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ মোকাবেলায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ১৮টি যুদ্ধজাহাজ, মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফট ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী জরুরি উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তিন স্তরের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কোটি মানুষ

এদিকে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পেলেও এর রোষের শিকার হয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যটিতে কয়েক ঘণ্টা তাণ্ডব চালিয়েছে ইয়াস। এতে উপকূলীয় দিঘা ও সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রায় এক কোটি মানুষের ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন একজন।

বুধবার সন্ধ্যায় নবান্ন থেকে সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসব তথ্য জানান। শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যাবেন মুখ্যমন্ত্রী।

বুধবার নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে সকাল ৯টা নাগাদ আছড়ে পড়ে অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’। আলিপুর আবহাওয়া অফিস বুধবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটের বুলেটিনে জানায়, ওডিশার বালেশ্বরের দক্ষিণে ইয়াসের আঘাত শুরু হয়েছে। সেই সময় ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৩০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার।

ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিল প্রশাসনও। পশ্চিমবঙ্গ এবং ওডিশার উপকূলবর্তী এলাকায় লাল সতর্কতা জারি হয়। পশ্চিমবঙ্গে ইয়াস আছড়ে পড়ার আগেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০ জেলায় নামানো হয় সেনাবাহিনী।

ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় মঙ্গলবার সারারাত রাজ্যের সচিবালয় নবান্নেই ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাতভর কন্ট্রোলরুম থেকে নজর রেখেছেন পরিস্থিতির ওপর। বুধবার সকালেও একাধিকবার সাংবাদিক বৈঠক করে পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন রাজ্যবাসীকে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.