মো. হাবিবুর রহমান, সিভয়েস, রাউজান:
বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন আবু আহম্মেদ। শরীরে বাসা বেধেছে নানা রোগ। ইফতারের আগ মুহূর্তে ইনসুলিন ইনজেকশন নিয়ে ব্যস্ত তিনি। ছেলে-মেয়ে সবই আছে, নেই শুধু সন্তানদের ভালোবাসা। আপন মানুষগুলোর ভালোবাসা কিংবা যত্ন থেকে বঞ্চিত এমন আরও অনেক মানুষের ঠাঁই হয়েছে রাউজানের আমেনা-বসর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
করোনা প্রথম ধাক্কা সামলে এবার এসেছে দ্বিতীয় ঢেউ। তবে ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও করোনার টিকিও ছুঁতে পারেনি সন্তানদের অবহেলিত এই মা-বাবাদের। রাউজানের নোয়াপাড়ায় গড়ে ওঠা এ বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে বর্তমানে আছেন ২৫ জন। এদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত তো দূরের কথা উপসর্গ পর্যন্ত দেখা যায়নি কারো মধ্যে।
তবে এমন ভালো সংবাদের মধ্যেও খারাপ সংবাদ হলো করোনার ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতে বৃদ্ধাশ্রমের মা-বাবা কেমন আছেন, করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কি-না— খবর নেয়নি কোনো সন্তান। সন্তানরা তো খবর রাখেইনি, দেশের অবহেলিত এ প্রবীণ শ্রেণির মানুষের খবর রাখেনি সংশ্লিষ্টরাও।
রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠী টিকা পাওয়ার কথা থাকলেও ‘স্বাস্থ্য ঝুঁকির’ অজুহাতে তা নিতে পারেননি কেউ। রেজিস্ট্রেশন করলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েই নিতে হবে টিকা। তবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাইরে কাউকেই যেতে দেওয়া হচ্ছে না। উপজেলার স্বাস্থ্যবিভাগও গায়ে পড়ে খোঁজ রাখেনি বৃদ্ধাশ্রম খ্যাত এখানকার বাসিন্দাদের। সরকারিভাবে প্রথম ডোজের টিকা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ায় আর তাদের টিকা নেওয়ার সুযোগ নেই।
বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা চাঁদপুরের সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলেরা থেকেও পাশে নেই। এখন সর্বশেষ আশ্রয় এই বৃদ্ধাশ্রম। আল্লাহ এ করোনা পরিস্থিতিও ভালো রেখেছেন। এখানে আমরা সবাই ভালো আছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে এখনো কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়নি।’
শফি নামে আরেক বৃদ্ধ বলেন, ‘আমার ভাইরা এখানে দিয়ে গেছে। প্রায় ৩ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। প্রথম দিকে একটু সমস্যা হতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া চাই করোনার এ পরিস্থিতি যাতে আল্লাহ ঠিক করে দেন।’
আবু আহমেদ বলেন, ‘আমার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে সবই আছে। কপাল খারাপ তাই এখানে থাকতে হচ্ছে। শরীরে নানা রোগ বাসা বেধেছে, ওষুধ সেবন করছি। আপন মানুষগুলোকে কাছে পাচ্ছি না, আমার ঘরে আমি থাকতে পারছি না। এই যন্ত্রণা আমাকে খুঁড়ে খাচ্ছে।’
আমেনা-বসর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. ফারুক বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে এখন পর্যন্ত কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়নি। উপসর্গ না থাকায় করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনাও দিতে হয়নি।’
কতজন টিকা গ্রহণ করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রেজিস্ট্রেশন করলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে টিকা দিতে হবে। সে কারণে আমাদের এখানে আশ্রিত কোন বৃদ্ধ করোনার ভ্যাকসিন গ্রহণ করেনি। বয়স্কদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে টিকা প্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীরা এখানে এসে টিকা দিলে ভালো হবে।’
এই প্রসঙ্গে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দ্বীন বলেন, ‘রেজিস্ট্রেশন না করলে টিকা কেমনে গ্রহণ করবে! বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকা প্রদান করতে পারবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন আর প্রথম ডোজ নেওয়ার সুযোগ নেই। গত সোমবার প্রথম ডোজ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত প্রথম ডোজ প্রদান কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। করোনার ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ প্রদান কার্যক্রম বন্ধের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত রাউজানে ১৯ হাজার ২০০ জন করোনার ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছেন। গত সোমবার পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছেন ৯ হাজার ৯০০ জন।’

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.