নাটকীয় কিছু ঘটিয়ে তবুও জেতার সুযোগ!

ওয়ান নিউজ ক্রীড়া ডেক্সঃ ২০০৬ সালে ফতুল্লা। প্রায় এক যুগ পর ঢাকার মিরপুরেও কি বাংলাদেশের ক্রিকেটে তেমন একটা বিয়োগান্ত ঘটনা লেখা হয়ে থাকবে? নাকি শেরে বাংলায় বাংলার বাঘা খেলোয়াড়রা জেগে উঠবেন চতুর্থ দিনের সকালে। যেমনটা সাকিব-মিরাজরা এখানেই জেগে উঠেছিলেন এই সেদিন। গত অক্টোবরেই তো এক সেশনের এক অবিশ্বাস্য তুফানে টাইগাররা শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে ভাসিয়ে দিয়েছিল। তুলে নিয়েছিল ঐতিহাসিক জয়। ক্রিকেট বড় মহান অনিশ্চয়তার খেলা। এই যে প্রায় আড়াইটা দিন প্রথম টেস্টের চালকের আসনে বাংলাদেশ, তারপর তৃতীয় দিনের শেষ বিকেলে চিত্রটা এভাবে পাল্টাবে কে ভেবেছিল? চতুর্থ ইনিংসে ২৬৫ রানের টার্গেট জয় এই উইকেটে এশিয়ার বাইরের দল এমনকি অস্ট্রেলিয়ার জন্যই কঠিন। তবে অসম্ভব যে নয় তা বুঝিয়ে দিয়েই এই দিনটা চওড়া হাসি নিয়ে শেষ করেছে তারা। আর ১৫৬ রান করলেই দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ তে লিড তাদের। ২ উইকেটে ১০৯ রান নিয়ে মঙ্গলবারের খেলা শেষ করেছে তারা। বাংলাদেশের চাই ৮টি উইকেট মাত্র!

ইমরুল কায়েস যখন ন্যাথান লায়নের লাফিয়ে ওঠা বলে আউট হলেন তেমন কোনো উচ্ছ্বাস করেননি অস্ট্রেলিয়ানরা। কারণ উইকেটে যে আচরণ করছে তাতে নিজেদের পরিণতির কথা ভেবেই হয়তো উল্লাসের প্রেষণা মেলেনি। উইকেটে নেমে অসি ব্যাটসম্যানরা টেরও পেলেন সেটা। ২৮ রানেই নেই ম্যাট রেনশ ও উসমান খাজা। ১ রানের ব্যবধানে বিদায়, পরপর দুই ওভারে। চলে যেতে পারতেন ডেভিড ওয়ার্নারও। কিন্তু সৌম্যর হাতে জীবন পেয়ে যেমন দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন তেমনি আগ্রাসী ব্যাটিং করে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ ভদ্রলোকের মতো ওয়াক করা শুরু করেছিলেন দুই উইকেট পড়ার পর। তবে থার্ড আম্পায়ার বলে দিয়েছেন আউট না। স্পিনে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড় এবং বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটসম্যান বহাল তবিয়তে আছেন।

স্মিথ সবচেয়ে বড় ভয় আগে থেকেই। ৪ বছরে যার ২০ সেঞ্চুরি! এশিয়ায় এর আগে তেমন সফল না টেস্টে, কিন্তু তিনি তো ডেভিড ওয়ার্নার! মঙ্গলবার শেষ বিকেলের আলোয় স্বাগতিকদের ভুগিয়ে গেলেন এই দুই। স্পিনটা যে তারা ভালোই খেলেন তার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। স্মিথ কিছুটা ধৈর্য্য নিয়ে ব্যাট করলেও ওয়ার্নার খেলছেন স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক মেজাজেই। মাত্র ৯৬ বলে করেছেন ৭৫ রান। হাফ সেঞ্চুরি স্পর্শ করেছেন ৬৪ বলে। স্মিথ অপরাজিত আছেন ২৫ রানে। বুধবার সকালের শুরুতেই এ দুই ব্যাটসম্যানকে দ্রুত ফেরাতে না পারলে বড় দুঃখ টাইগারদের অপেক্ষায় তা কি আর বলতে!

তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ২২১ রানে অল আউট হওয়ার পর বোলিংয়ে টাইগারদের শুরুটা ছিল কাঁপিয়ে দেওয়া। ২৮ রানে দুই উইকেট তুলে নিয়ে চেপে ধরেছিল প্রতিপক্ষকে। রেনশকে এলবিডাব্লিউর ফাঁদে ফেলেছিলেন মিরাজ। আর অফ ফর্ম উসমান খাজা সাকিবের বলে আত্মহত্যা করে তাইজুলের তালুবন্দি হয়েছেন। তবে পার্থক্যটা গড়ে দেন ওই ওপেনার ওয়ার্নারই। সাকিবের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান তিনি। ধরি ধরবোনা করে বলে হাত ছোঁয়াতেই পারেননি সৌম্য সরকার। তখন ১৪ রানে ওয়ার্নার।

আবহাওয়ার রিপোর্ট বলছিল, দুপুরের পরে মিরপুরে ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ঝড়টা বয়ে গেলো ভিন্নভাবে। দ্বিতীয় সেশনে মাত্র ৯ বলই লন্ডভণ্ড করে দিল টাইগারদের। ৫ উইকেটে ১৮৬ রান থেকে হয়ে গেল ৮ উইকেটে ১৮৬ রান। ০ রানে ৩ উইকেট হারানোর কষ্টের তীব্রতার চেয়ে বড় আক্ষেপ মুশফিকের আউটের ধরণে।

দারুণ এক স্ট্রেইট ড্রাইভ করেছিলেন সাব্বির। চার পাবেন আশা ছিল তার। কিন্তু বিধিবাম, বল লাগলো উইকেটে। সাব্বির হয়তো আফসোস করছিলেন চার হলো না বলে। বোধোদয়টা হয়তো হয়েছিল তার লায়নের ভোঁ দৌড়েই। কারণ উইকেট ভাঙার আগে যে হাত ছুঁয়েছিল। কি কুক্ষণেই যে আলতো হেঁটে উইকেট থেকে বের হয়েছিলেন মুশফিক। ফেরার তাড়া অবচেতনে ছিল না বুঝি! দুর্ভাগ্য তার। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। সে দুর্ভাগ্যের রেশ কাটতে কাটতে নেই স্কোর বোর্ডের আরও ২ উইকেট। আর এর শেষ উইকেটটা সাব্বির স্বয়ং। মুশফিক ৪১ রান করেছেন। সাব্বিরের সাথে জুটিটা ৪৩ রানের।

প্রায় দুই বছর টেস্ট দলে ফিরে নজর কাড়তে ব্যর্থ হন নাসির হোসেন। অ্যাগারের বলে লাইন মিস করে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে পড়েন তিনি। ০ এবার। তারপরই আবার আলোচনায় সাব্বির। ব্যাটের কানায় লাগা বলে ক্যাচের শিকার। আউট। যদিও টিভি রিপ্লেতে দেখা গিয়েছে বলের সাথে ব্যাটের স্পর্শই হয়নি। অথচ আগের দিনেই ব্যাটে বড় এজ হওয়ার পর নিয়েছিলেন রিভিউ। এদিন না লাগার পরও নিলেন না! কেন কে জানে, ২২ রানেই তাই তার ফেরা।

এই টানা তিনের মিছিলের পর মিরাজ মাঠে ঠুকেছিলেন মারার জন্যই। তার যে ৩০০ রানের লিডের স্বপ্ন! জেতার জন্য ওটা তার কাছে যুতসই মনে হয়েছিল আগের দিন। অ্যাগারের এক ওভারে তিনটি চার মেরে দিলেন। শফিউল ইসলাম (৯) তার সাথে। লায়নকে একটা ছক্কাও হাঁকিয়ে দিলেন। তবে পরের বলেই শর্ট লেগে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। নবম উইকেটে তাদের ২৮।

আগের দিনের ১ উইকেটে ৪৫ রান নিয়ে উইকেটে নেমেছিলেন তামিম ইকবাল ও তাইজুল ইসলাম (৪)। নাইটওয়াচম্যান টিকে ছিলেন পাঁচ ওভার। এরপর তামিমের সঙ্গে জুটি বাধার চেষ্টা করেছিলেন ইমরুল (২)। তবে ভাগ্যটা তার মন্দই ছিল। লায়নের লাফিয়ে ওঠা বলে ব্যাট ছুয়ে চলে যায় ওয়েডের হাতে। ইমরুল বিদায় নেওয়ার পর সবাইকে কিছুটা অবাক করে মাঠে নামেন মুশফিক। হয়তো প্রথম ইনিংসের সমালোচনা মাথায় রেখেই এ সিদ্ধান্ত। আগের ইনিংসে ফ্রেশ থাকার পরও চারে সাব্বিরকে নামিয়ে নিজে নেমেছিলেন পাঁচে। এবার ৮০ ওভার কিপিং করেও আগে নামলেন। সিদ্ধান্তটা দলের জন্য কাজেরই ছিল।

তামিমের সঙ্গে দারুণ এক জুটি উপহার দেন মুশি। ৬৮ রানের। ইনিংস মেরামত ও প্রতিরোধের। ৬৭ রানে দলের ৩ উইকেট পড়ার পর। তামিমও এগিয়ে যাচ্ছিলেন নিজের পঞ্চাশতম টেস্টে সেঞ্চুরির দিকে। কিন্তু লাঞ্চের পর দুঃস্বপ্নের মতো ৫ উইকেট পড়েছে। তার প্রথমটি তামিমের। প্যাট কামিন্সের এক্সট্রা বাউন্সে বোকা হয়ে যান তিনি। প্রথমে রক্ষণাত্মক ভঙ্গীতে খেলতে গিয়ে ছেড়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু ওখানেই সর্বনাশ। গ্লাভসে হালকা চুমু খেয়ে বল চলে গেলো ওয়েডের হাতে। আম্পায়ার আলিম দার সংশয়ে ছিলেন। শুরুতেই আউট দেননি। কিন্তু পাশে দাঁড়ানো গ্লেন ম্যাক্সওয়েলই রিভিউ নেওয়ার কথাটা বললেন অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথকে। আর রিপ্লেতে হক আই বলে দিল, তামিম আউট। আগের ইনিংসে ৭১, এবার ৭৮। ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি মিস করার জোড়া আক্ষেপ নিশআচয়ই কষ্ট দিচ্ছে তামিমকে।

সেঞ্চুরি না পেলেও সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের দুই ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরির রেকর্ডটা স্পর্শ করেন তামিম। এ নিয়ে ৬ বার দুই ইনিংসেই হাফসেঞ্চুরি করেন তামিম। তামিমের বিদায়ের পর তার আগের ইনিংসের পার্টনার সাকিব পারেননি দলের হাল ধরতে। মাত্র ৫ রান করেই খেয়ালী মেজাজে বল আকাশে তুলে উইকেটটা উপহার দিয়ে এসেছেন এই ম্যাচের এখন পর্যন্ত হিরো। লায়নকে কেন হুমকি মনে করেছিল টাইগাররা তার প্রমাণ এই স্পিনারের ইনিংসে ৬ ব্যাটসম্যান শিকার।

তবে লায়ন পারলে সাকিব-মিরাজ-তাইজুলরা নয় কেন? এই আশায় বুক বেধেই নাটকীয় কিছুর অপেক্ষা। ওই যে, ক্রিকেট যে মহান অনিশ্চয়তার খেলা!

সংক্ষিপ্ত স্কোর : (তৃতীয় দিনশেষে)
অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস : ১০৯/২ (৩০ ওভার) (ওয়ার্নার ৭৫*, স্মিথ ২৫*, রেনশ ৫, খাজা ১; সাকিব ১/২৮, মিরাজ ১/৫১, নাসির ০/২, মোস্তাফিজ ০/২, তাইজুল ০/১৭)।
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস : ২২১/১ (৭৯.৩ ওভার) (তামিম ৭৮, মুশফিক ৪১, মিরাজ ২৬, সাব্বির ২২, সৌম্য ১৫, শফিউল ৯, সাকিব ৫, তাইজুল ৪, ইমরুল ২, মোস্তাফিজ ০*, নাসির ০; লায়ন ৬/৮২, অ্যাগার ২/৫৫, ১/৩৮, খাজা ০/১, হ্যাজলউড ০/৩, ম্যাক্সওয়েল ০/২৪)।
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস : ২১৭/১০ (৭৪.৫ ওভার)।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ২৬০/১০ (৭৮.৫ ওভার)।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.