চক্ষু কীভাবে রোজা রাখবে?

ড. মাহফুজ পারভেজ

রমজান মাসের প্রতিটি ক্ষণ সীমাহীন রহমত, বরকত মাগফেরাত ও নাজাতের দ্বারা ভরপুর। দিনে ও রাতে রোজা, নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দান, সাদাকার মাধ্যমে পবিত্র রমজানের অফুরন্ত রহমত, বরকত, মাগফেরাত ও নাজাত হাসিলের জন্য শরীর ও আত্মাকে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নির্দেশিত পথ ও পন্থায় নিয়োজিত করা অত্যাবশ্যক।

রমজানে পানাহার ও কাম রিপুর কবল থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রোজা পালনের সময় সবাইকে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, চোখেরও রোজা রয়েছে। অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো চোখকেও রোজায় শরিক করতে হবে। চোখের রোজা হলো হারাম বস্তু থেকে চোখকে সংযত রাখা। অশ্লীল ও নিষিদ্ধ বস্তু না দেখা চোখের রোজার অংশ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেছেন:

‘হে নবী, আপনি মমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই হচ্ছে, তাদের জন্য উত্তম পন্থা। কেননা, তারা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে পূর্ণভাবে জানেন। হে নবী, আপনি মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে’ (সুরা নূর: আয়াত ৩০-৩১)।

বস্তুতপক্ষে চক্ষু হচ্ছে হৃদয়ের জানালা এবং রুহের দরজা। এ পথ দিয়ে ভালো জিনিস যেমন প্রবেশ করতে পারে, তেমনিভাবে এমন মন্দ জিনিসও প্রবেশ করতে পারে, যেগুলো কষ্ট, গোনাহ ও শাস্তির কারণ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখো।’ সহিহ বোখারির ৬২২৯ নম্বরে বর্ণিত এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি তার দৃষ্টিকে সংযত করবে না, সে চারটি বিপদে পড়বে। বিপদগুলো হলো:

* তার মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে এবং তার কাজে কখনো স্থিরতা আসবে না।

* যা সে দেখলো, তা অর্জিত না হওয়ায় তার মনে সব সময় আফসোস ও পেরেশানি থাকবে। না পাওয়ার বেদনা তাকে সব সময় দহন করবে।

* অসংযত দৃষ্টির দ্বারা মন বিক্ষিপ্ত থাকায় ইবাদতের একাগ্রতা ও স্বাদ চলে যাবে। ঈমান আর একিনের উপলব্ধি শুধু ঐ ব্যক্তিরা অনুভব করবে পারে, যে তার দৃষ্টিকে সংযত করে।

* অসংযত দৃষ্টির দ্বারা অন্যের ইজ্জত, আব্রু, হারাম ও অশ্লীল বস্তুর দিকে নজর চলে যাওয়ায় অবশেষে বড় বিপদের সৃষ্টি হয়।

ফলে রোজার সময় দৃষ্টিকে সংযত রাখা বিশেষভাবে প্রয়োজন। চোখের হেফাজত করে রোজাকে এবং রমজানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহকে পরিপূর্ণ, পূর্ণাঙ্গ, কলুষমুক্ত এবং সার্থক করা অপরিহার্য্য। তাই চোখের রোজার জন্যে দৃষ্টিকে সংযত রেখে রোজায় শামিল করার ব্যাপারে মনোযোগী হওয়ার দরকার রয়েছে। শুধু রোজায় নয়, দৃষ্টিকে সব সময়ের জন্যেই সংযত, নিয়ন্ত্রিত, পাপ ও অন্যায় থেকে মুক্ত রাখলে পাঁচটি উপকার পাওয়া সম্ভব। এগুলো হলো:

* দৃষ্টিকে সংযত রাখার মাধ্যমে আল্লহ তায়ালার আদেশের আনুগত্য হয়।

* মন পরিচ্ছন্ন ও প্রশান্ত থাকে।

* ফিতনা, ফাসাদ, বিপদ ও পাপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

* আত্মউপলব্ধি ও জ্ঞান বৃদ্ধি পেয়ে অন্তর্দৃষ্টি প্রশস্ত হয়।

* মন পবিত্র থাকার সুবাদে অন্তরে নূর বা আলো সঞ্চারিত হয়।

মাহে রমজানের অতি পবিত্র ও মোবারক সময়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় রোজা পালনের কালে চোখকে হেফাজত করা অতীব জরুরি। রোজা ও অন্যান্য আমলকে বিশুদ্ধ রাখার জন্য চোখের দৃষ্টিকে লাগাম ধরে সামলিয়ে রাখার বিকল্প নেই। রোজা রেখে অশ্লীল ও উস্কানিমূলক দৃশ্য, ছবি, চলচ্চিত্র, টিভি দেখা হলে তার কুপ্রভাব চোখ বেয়ে সমগ্র দেহ ও মনে নেতিবাচক ক্রিয়া করতে পারে এবং রোজা ও অন্যান্য আমল-আখলাকের চরম ক্ষতি করতে পারে। ফলে খাদ্য ও কামের নিবৃত্তি দ্বারা শরীরকে যেমন কৃচ্ছ্বতার মাধ্যমে রমজানে হেফাজত করা হয়, তেমনিভাবে চোখের নিয়ন্ত্রণ ও হেফাজত করাও রোজার মাস রমজানের অন্যতম দায়িত্ব।

মন্তব্য করুন

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্র রিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোন মন্তব্য বা বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোন ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য বা বক্তব্য সংশোধনের ক্ষমতা রাখেন।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.