# ল্যাবের নেই অনুমোদন
# ভুয়া প্যাথলজিষ্ট দিয়ে রোগীর রিপোর্ট
# জরাজীর্ণ স্যাতস্যাতে ল্যাব রুম
# রোগী আনতে কাজ করে দালালচক্র
# প্রশাসনের নেই নজরদারী
কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ
ভবনের বাইরে নেই কোন প্যাথলজিক্যাল ল্যাবের সাইনবোর্ড।বাইরে থেকে বুঝার উপায় নেই ভিতরে ডুকলেই তাদেও রয়েছে বিশাল ডক্টরস ল্যাব এর কার্যক্রম। যেন এটি একটি ভূতুড়ে ল্যাব।রাস্তার পাশে একটি ভবনের ভিতরে গিয়ে নজরে আসে উপরে যাওয়ার ছোট সিড়ি। স্যাতস্যাতে চারপাশে ময়লায় ভরা।উপরে উঠতেই সামনে নজরে আসলো একটি রুম। এই রুমের একপাশে একটি মাইক্রোস্কোপ, কিছু রক্ত সংগ্রহ করার জন্য টিউব, আর কিছু মাইক্রোস্কোপে ব্যবহার করার জন্য ¯øাইড গøাস , ব্যস এই নিয়ে জরাজীর্ণ একটি রুমে শুরু করে দিয়েছে প্যাথলজিক্যাল ডক্টরস ল্যাব। এখানে প্রতিদিন শতশত মানুষ তাদের রোগ নির্ণয়ে বিভিন্ন ধরনের টেষ্ট করছে প্যাথলজিক্যাল টেকনেশিয়ান পরিচয়দানকারী এনামুল হক।পরীক্ষায় যেকোন একটি সমীকরণ দেখিয়ে তৈরি করছে রিপোর্ট। পাশের আরেকটি রুমে শুয়ে থাকতে দেখা যায় বেশ কয়েকজন মহিলা রোগী। তাদের স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। যেন এক বিশাল হাসপাতাল।তবে দেখা নেই কোন এমবিবিএস ডাক্তারের। রয়েছে শুধু পল্লী চিকিৎসক সাহাব উদ্দিন। ডক্টরস ল্যাবে রোগী আনতে বাইশারী, গর্জনিয়া ও ঈদগড়ের বিভিন্ন এলাকায় গ্রামে গ্রামে কমিশন ভিত্তিক দালালচক্র কাজ করছে বলে জানা গেছে। দালালদেও ৪০% পর্যন্ত কমিশন দেয় বলে একটি বিশেষসুত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড় ই্উনিয়নের প্রধান বাজারটি ঘুরে ডক্টরস ল্যাব নামে প্রতিষ্টানের খোজ খবর নিতে গিয়ে এমন তথ্য বেরিয়ে আসে প্রতিবেদকের কাছে ।
চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড়ের মৃত এমদাদ হোসেন এর পুত্র এনামুল হক বেশ কয়েকবছর ধরে পরিবার নিয়ে ঈদগড়ে বসবাস করছেন।। তিনি ঈদগড় ডক্টরস ল্যাব মালিক্। তিনি নিজেকে একজন প্যাথলজিক্যাল টেকনেশিয়ান দাবি করলেও কোন ধরনের সার্টিফিকেট নেই বলে জানা গেছে।
ঈদগড় বাজারে এনামুল হক দীর্ঘদিন ধরে এই প্যাথলজিক্যাল ল্যাব চালিয়ে আসছে বলে স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে । যদিও তার দাবি গত দুবছর ধরে তিনি এই ব্যবসা করছেন। তার রয়েছে নিজস্ব পল্লী চিকিৎসক। সেই চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা লিখে দিয়ে বাধ্য করে ডক্টরস ল্যাবে যাওয়ার জন্য। রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা ফি বাবত ৩০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে। তার কোন সরকারী প্যাথলজিক্যাল সার্টিফিকেট না থাকলেও কিছু অভিজ্ঞতার কারনে রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় বিভিন্ন সমীকরণ দেখিয়ে একটা রিপোর্ট বানিয়ে রোগীর হাতে তুলে দেন । এর প্রেক্ষিতে স্থানীয় তার আওতাধীন থাকা পল্লী চিকিৎসক সাহাব উদ্দিন বানিয়ে দেন একটি প্রেসক্রিপশন। আর তাতে হালাল হয়ে যাচ্ছে ভুয়া প্যাথলজিষ্ট এনামুল এর রিপোর্ট।
এনামুল হক সিভিল সার্জন কক্সবাজার থেকে অনলাইনে আবেদনের একটি কপি প্রতিবেদকে দেখালে তাতে দেখা যায় এই ডক্টরস ল্যাবকে সি ক্যাটাগরির দেখানো হয়েছে। এই কাগজে গত ১৬ মার্চ আবেদন করা অনলাইন কপিতে নতুন হিসাবে দেখানো হয়েছে। এদিকে এলাকাবাসির ও এনামুলের কথা বেশ কয়েকবছর ধরে এই ল্যাব চালু রয়েছে। প্যাসিলেটি ক্যাটাগরি দেখানো হয়েছে ডায়াগনেষ্টিক সেন্টার হিসাবে। তবে সরেজমিনে তা নেই। আর এটি কক্সবাজার সিভিল সার্জন এর একজন কর্মচারি করিম নামের কারো সহায়তায় তা তিনি পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এটি নিতে যে ডকুমেন্ট দিতে হয় তা ভুয়া বলে জানা যায়।
ঈদগড় বাজারে পাশবর্তী একটি চেম্বারে থাকা মেডিসিন,শিশু,বাত-ব্যাথা,শ^াসকষ্ট ও ডায়াবেটিস রোগের অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাঃ মোঃ নাজমুল হোসাইন জানান, আমার কাছেও বেশ কিছু ডক্টরস ল্যাব এর রিপোর্ট নিয়ে রোগী এসেছে। যে রিপোর্ট গুলো আমার হাতে এসেছে সেগুলো রোগীর অবস্থা ও রিপোর্ট এর সাথে মিল থাকে না। তার পরেও রোগীর অবস্থা দেখে অনেকক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে থাকি । যদি আমি ঐ রিপোট ফলো করি তবে রোগীর ক্ষতি হতে পারে তাই আমি প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যাই। যদি অবস্থার পরির্বতন না হয় ভালো চিকিৎসার জন্য জেলা হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিই রোগীদের। কারণ সেখানে সবধরনের পরীক্ষা করতে পারে এবং দক্ষ চিকিৎসক রয়েছে। এতে রোগী প্রানের ঝুকি থাকেনা।
স্থানীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই ভুয়া প্যাথলজিষ্ট বেশ কয়েকবছর যাবত এখানে এই ল্যাব খুলে ব্যবসা করে আসছে । এই প্যাথলজি থেকে ভুয়া রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ সেবনে অনেক মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছে ।
ডক্টরস ল্যাবে আসা জয়নাল আবেদীন নামের এক রোগী জানান, আমি ডাক্তার শাহাব উদ্দিন কে আমার অসুস্থার কথা বললে তিনি আমাকে ম্যালেরিয়া সহ বেশ কয়েটি পরীক্ষা করার জন্য লিখে দেন আর আমাকে উপরে ডক্টরস ল্যাব থেকে তা পরীক্ষা করার জন্য বললে আমি উপরে গিয়ে এনামুল নামের উনার সাথে দেখা করে নির্দিষ্ট পরিমানের ফি দিয়ে পরীক্ষা করায়। রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি ঔষুধ লিখে নেওয়ার জন্য ।
স্থানীয় যুবক জানান, এনামুল অনেক বছর যাবত এখানে এই ল্যাব পরিচালনা করছে। সরকারি কোন অনুমোধন নেই। তার নিজেও কোন সার্টিফিকেট নেই আমরা যতটুক জানি। তারপরেও সে কিভাবে এই প্যাথলজিক্যাল ডক্টরস ল্যাব চালাচ্ছে আমাদের বোধগম্য নয়। প্রশাসনের নজর দেওয়া উচিৎ বলে মনে করছি কারন এত যেকোন মুহুর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এ ব্যাপারে সরাসরি প্যাথলজিষ্ট পরিচয় দানকারী এনামুল হক এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমি প্যাথলজিষ্ট এর উপর ডিপ্লোমা করেছি। আমার ডি-ল্যাব ডিপ্লোমা আছে আর এই ডিপ্লোমা দিয়ে প্যাথলজিক্যাল ল্যাব পরিচালনা করছি। প্রতিবেদক তার ডিপ্লোমার কাগজপত্র দেখতে চাইলে তা ঘওে আছে বলে তিনি তা দেখাতে পারেননি।
পল্লী চিকিৎসক সাহাব উদ্দিন জানান, আমি ডক্টরস ল্যাবের নিচে চেম্বার করি তাই আমার কাছে যা রোগী আসে তা ডক্টরস ল্যাব থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে।। এনামুল হক এর কোন ডিগ্রী আছে কিনা তার কাছে জানতে চাইলে সে বলে আমি এ সম্পর্কে কিছু জানিনা সে ল্যাব চালাচ্ছে রোগীদের পরীক্ষা করতে হলে ওখান থেকে পরীক্ষা করিয়ে আমাকে রিপোর্ট দেখায় আর আমি সেইমতে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছি।
কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন ডাক্তার মাহবুবর রহমান এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, একটি প্যাথলজিক্যাল ল্যাব চালাতে হলে ্একজন ডিগ্রীধারী ও অনুমোদিত প্যাথলজিষ্ট থাকতে হবে। উনার স্বাক্ষর থাকবে রিপোর্টে । ডি ল্যাব -ডিপ্লোমাধারী কেউ রিপোর্ট দিতে পারে কিনা প্রশ্ন করলে, এটি কোনভাবেই সম্ভব নয় বলে জানান। তিনি আরো বলেন কেউ যদি আমাকে লিখিত অভিযোগ করে তবে তার বিরোদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিব।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা জানান, আমি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম এমন একটি ল্যাব ঈদগড় বাজারে আছে । আমরা রামু উপজেলা প্রশাসন সবসময় সজাগ।যে কোন অন্যায় রুখতে বদ্ধ পরিকর। অচিরেই সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে যদি অবৈধ প্রতিষ্টান হয়ে থাকে তা হলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.