রোহিঙ্গাদের জন্য সেইফ জোন প্রস্তাব ‘ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র’
ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে সেইফ জোন (নিরাপদ অঞ্চল) প্রস্তাবকে ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়েছে বিএনপি। দলটির নেতাদের দাবি, এই পদক্ষেপ বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের জন্য বিপজ্জনক ও স্বার্থবিরোধী।
একইসঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে অতীতে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের যে সব চুক্তি হয়েছে, সেগুলোকে ভিত্তি করে পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিএনপি নেতারা।
রাজধানীর গুলশানে লেকশোর হোটেলে রোববার বিকালে এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় বিএনপি নেতারা এসব মতামত তুলে ধরেন।
‘মিয়ানমারে গণহত্যা ও বাংলাদেশের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে বিএনপি। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলাম।
সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে বিএনপির জাতীয় ঐক্যের আহ্বানকে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাখ্যান করা দুখঃজনক।
তিনি বলেন, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। আর এজন্য জাতীয় ঐক্যের দরকার। বিএনপি এই বিষয়ে অভিজ্ঞ। কারণ জিয়াউর রহমান (১৯৭৮ সালে) ও খালেদা জিয়ার সময়েও (২০০৫ সালে) রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। তখন তাদের ফেরত পাঠিয়ে নাগরিকত্ব দিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করা হয়েছিল।
ড. মোশাররফ বলেন, সেই দায়বদ্ধতা থেকে বিএনপি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে। কিন্তু জাতীয় ঐক্যের ডাকে সাড়া না দিয়ে ক্ষমতসীনরা এনিয়ে দলীয় রাজনীতি করতে চাচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বেশ কিছু প্রস্তাবও রাখেন বিএনপির এই নীতিনির্ধারক। সেগুলো হলো-
১. রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনে চাপ সৃষ্টি করতে হবে এবং অস্থায়ীভাবে থাকতে দিতে হবে।
২. সংকট মোকাবেলা ও সমাধানে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান করছি।
৩. যেসব রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃত দিতে হবে।
৪. মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের এসব নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নিতে হবে। এজন্য যথাযথ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণ করে মিয়ামারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
৫. রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিএনপি সরকারের অভিজ্ঞতা নিয়ে অতীতের চুক্তির আলোকে সংকট নিরসনের আহ্বান জানাচ্ছি।
৬. প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে সেইফ জোন সম্পর্কে যে কথা বলেছেন তা পরিষ্কার করার আহ্বান জানাচ্ছি। এটা হবে বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গাদের জন্য বিপজ্জনক, ভয়ঙ্কর ও স্বার্থবিরোধী। সেইফ জোন প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করছি। এনিয়ে যেন আর কথা না হয়। সেইফ জোন বিষয়টি ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করছি।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলকে ধন্যবাদ জানিয়ে ড. মোশাররফ বলেন, ‘তারা মিয়ানমারের গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিষদ গুরুত্ব দিয়ে এখানো রেজ্যুলেশন নিতে পারেনি। আশা করি, তারা এমন পদক্ষেপ নেবে যাতে এই মানবিক বিপর্যয় সমাধান হয়।’
সভায় সভাপতির বক্তব্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে গণহত্যা চালাচ্ছে। সমগ্রবিশ্ব সোচ্চার হলেও বাংলাদেশ সরকার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তারা এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে।
সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এই ধরনের জাতীয় ইস্যুতে সরকার জাতীয় ও বিশ্বকে একত্রিত করলেও এখন উল্টো আমাদের সরকারকে একত্রিত করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এখন কোনো অবস্থানে আছে সেটি পরিষ্কার নয়। লোক দেখানোর জন্য সরকার এ অবস্থান নিয়েছে।’
সেইফ জোন প্রস্তাবের সমালোচনা করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘সেইফ জোন কোথাও কখনো কাজ করে না। কোনো দেশেই কাজ করেনি।’
রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত-চীন-রাশিয়ার বিতর্কিত অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের যারা বড় শক্তি তারা এক্সক্লুসিভ জাতির পক্ষে কাজ করছেন। যদি ক্ষমতাধররা এই কাজ করেন তবে এটি ভবিষ্যতে ভয়াবহ অবস্থায় যাবে। এটি শুধু মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘১৯৭৮, ’৯৩, ’০৫ সালেও এই সংকট দেখেছি। আন্তর্জাতিক চাপ দিয়ে বার্মিজ সরকারকে বোঝাতে হবে রোহিঙ্গারা যতই ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হোক না কেন তাদের নির্মূল করা যাবে না। এটা করা গেলে অনেকাংশে সংকট কমে যাবে। সেইফ জোনের কথা বলে ছাড় দিলে চলবে না।’
সভায় বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, নজরুল ইসলাম খান, রিয়াজ রহমান, সাবিহউদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালাম, এম মোরশেদ খান, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, নিতাই রায় চৌধুরী, সুকোমল বড়ুয়া, মুজিবুর রহমান সরোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল প্রমুখ।
সেমিনার সঞ্চালনা করেন সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ।
এছাড়া সভায় জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, জাপান, কুয়েত, ইরান, ফ্রান্স, পাকিস্তান, সুইজারল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেদারল্যান্ডসহ মোট ১২টি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তবে চীন, ভারত এবং রাশিয়ার কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.