আরাকান ও রোহিঙ্গা ইতিবৃত্ত
আধুনিক মিয়ানমার সাতটি রিজিওন এবং সাতটি ষ্টেট এ বিভক্ত। রিজিওনগুলি জাতিগত বর্মী সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল এবং ষ্টেটগুলি সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল। রাখাইন ষ্টেট মিয়ানমারের এমনি একটি অঞ্চল, যা প্রধানতঃ সংখ্যালঘু রাখাইন নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত। রাখাইন ষ্টেটে আরো একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীও বিদ্যমান, যারা রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত। রোহিঙ্গারা পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন স্টেটের উত্তরাংশে বসবাসকারী একটি জনগোষ্ঠী। ধর্মের বিশ্বাসে এরা অধিকাংশই মুসলমান। মিয়ানমারের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় কোটি, আর রাখাইন ষ্টেটের জনসংখ্যা ত্রিশ লক্ষ। রাখাইন ষ্টেটের এই জনমিতিতে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে, এই সংখ্যা শুধুমাত্র রাখাইনদের, রোহিঙ্গারা এই হিসাবের অন্তর্ভূক্ত নয়। তাহলে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কত? সরকারীভাবে রাখাইন ষ্টেটে রোহিঙ্গা কেউ নেই, তাই তাদের কোন সংখ্যাও নেই। সরকারী ভাষ্য মতে- রাখাইন ষ্টেটে রোহিঙ্গা বলে কোন কালে কিছু ছিল না, তবে বাংলাদেশে তেমন কিছু থাকলেও থাকতে পারে, বস্তুতঃ পক্ষে বাংলাদেশেরই কিছু লোক ব্রিটিশ আমল থেকে জীবিকার অন্বেষনে রাখাইন ষ্টেটে আগমন করেছে, অবৈধভাবে তাদের কেউ কেউ এখনও রয়ে গেছে, এরা এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি বিদায় হয়, ততই মঙ্গল। তবে রোহিঙ্গা সূত্রগুলির ভাষ্য মতে তথাকথিত রাখাইন ষ্টেটে বর্তমানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা পনের লক্ষ এবং আরো পনের লক্ষ বাংলাদেশে ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শরনার্থী হিসেবে অবস্থান করছে।মায়ানমার সরকার ১৩৫ টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, রোহিঙ্গারা এই তালিকার অর্ন্তভুক্ত নয়। মায়ানমার সরকারের মতে, রোহিঙ্গারা হল বাংলাদেশী, যারা বর্তমানে অবৈধভাবে মায়ানমারে বসবাস করছে। যদিও ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা মায়ামারে কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে।সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানীদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তীতে চাঁটগাইয়া, রাখাইন, আরাকানী, বার্মিজ, বাঙালী, ভারতীয়, মিশ্রণে উদ্ভুত এই সংকর জাতি এয়োদশ-চর্তুদশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পঞ্চদশ শতাব্দী হতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানে রোহিঙ্গাদের নিজেদের রাজ্য ছিল।
১৯৭৪ সাল পর্যন্ত রাখাইন ষ্টেট এর নাম ছিল আরাকান ডিভিশন। আরাকানীরা একসময় গর্বভরে নিজেদের মগ হিসেবে পরিচয় দিত। গর্বের কারন- তারা নিজেদের বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির পীঠস্থান মগধ থেকে আগত রাজবংশের উত্তরসূরী মনে করতো। আসলে হিন্দু ধর্মের পুনঃ জাগরনের কালে মগধ থেকে বৌদ্ধগন বিতারিত হয়ে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যান, তাদের একটি অংশ আরাকানে এসে ঠাঁই নেয়। কালের পরিক্রমায় স্বল্পসংখ্যক মাগধী বৌদ্ধ বৃহত্তর মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে বিলীন হয়ে যান, কিন্তু সমগ্র আরাকানী বৌদ্ধ সমাজকে তাঁরা মগ কৌলিন্যে অভিষিক্ত করে যান।বস্তুতপক্ষে এই সময়কালের মগ রাজারা হার্মাদ(পর্তুজীজ) জলদ্যস্যুদের সহায়তায় নিজেরাও একটি মগ দস্যুবাহিনী গড়ে তুলে মধ্য ও দক্ষিন বাংলায় লুন্ঠন ও দস্যুতার এক অবর্ননীয় নজীর সৃষ্টি করেছিল। বাংলার এ অঞ্চল থেকে সম্পদ ও মানুষ লুন্ঠন করে মগ রাজারা সমৃদ্ধির শিখরে আরোহন করেছিল, আর বাংলার বিস্তীর্ন অঞ্চলকে বিরান ভূমিতে পরিনত করেছিল। বাংলার অসংখ্য নরনারীকে তারা দাস হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল, আর তাদের অধিকৃত চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশালে স্থাপন করেছিল চরম নৈরাজ্যকর মগের মুল্লুক। অবশেষে ১৬৬৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ তাদের সম্পূর্নরুপে দমন করে চট্টগ্রাম অধিকার করলে চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে মগ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ পালিয়ে চলে যায় আরাকানে, নিজেদের কলংক আড়াল করার নিমিত্তে তারা এত সাধের মগ নামটি বিসর্জন দিয়ে রাখাইন নাম গ্রহন করে।
১৭৮৪ সালে স্বতন্ত্র আরাকান রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। বর্মীরা আরাকান দখল করে নেয় এবং তখন থেকে এটি বার্মা বা মিয়ানমারের একটি রাজ্য। বর্মীদের আরাকান দখল নিরপদ্রুপ ছিল না, আরাকানী বৌদ্ধ এবং মুসলিম জনগোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে একে রক্ষার চেষ্টা করে, কিন্তু তাদের প্রতিরোধ ব্যার্থতায় পর্যবাসিত হয়। সে সময় মুসলিম এবং বৌদ্ধ নির্বিশেষে অনেকে আরাকানী পালিয়ে বৃটিশ শাসিত চট্টগ্রামে পালিয়ে আসে, বেশী আসে রোহিঙ্গা মুসলিমরা। সেখান থেকেও তারা পুনরায় আরাকান মুক্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যার্থ হয়। অবশেষে ১৮২৫ সালে বৃটিশরা বার্মা অধিকার করলে আরাকান বার্মার একটি প্রদেশ হিসেবে বৃটিশ অধিকারভূক্ত হয়। বৃটিশ রাজত্বে নিরাপত্তামূলক পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা আবার আরাকানে ফিরে যায়। বৃটিশ শাসনামলে বার্মার সর্বাত্মক উন্নয়নের ফলস্রুতিতে আরাকানের আকিয়াব একটি বড় সমুদ্র বন্দরে পরিনত হয়। চট্টগ্রামের অধিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে নাবিক এবং সমুদ্র ও নৌসংক্রান্ত কাজে পটুত্ব লাভ করার কারনে আকিয়াবে তাদের কাজের সুযোগ ঘটে, এসময় অনেক চট্টগ্রামবাসী কাজের সন্ধানে আকিয়াবে গমন করে। শুধু চট্টগ্রামের অধিবাসীরাই নয়, সমগ্র বাংলা এমনকি সমগ্র ভারত থেকেই বহু মানুষ ভাগ্যান্বেষনে বার্মায় পারি জমাতে থাকে ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে অং সান জাপানের সহায়তায় স্বাধীনতার লক্ষ্যে BIA গঠন করলে বার্মিজ এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী এবং রাখাইনরা তাতে ব্যাপক সাড়া দিয়েছিল, কিন্তু রোহিঙ্গারা সমথর্ন ও সহায়তা দিয়েছিল ইংরেজদের। এই বিষয়টি ইংরেজদের পছন্দ হলেও বার্মিজ এবং রাখাইনদেন চরমভাবে ক্ষুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি লক্ষ করে শেষ দিকে এসে অং সান পক্ষ বদল করেন এবং এন্টি ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রীডম লীগ(AFPFL) নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে এ্যালাইড ফোর্সেস তথা ইংরেজদের সমর্থন দেন। যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার প্রশ্নে অং সানের সংগে ব্রিটিশদের আলোচনা শুরু হয়। বার্মায় বর্মী ছাড়াও শান, কাচিন, চীন, কারেন ইত্যাদি আরও জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রয়েছে, অং সানকে তাদের সংগে সমঝোতায় আসতে হয়। কিন্তু আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানরা আলাদা কোন জাতি কি না, এ বিষয়ে রাখাইনদের সুস্পষ্ট অভিমত হলো আরাকানের মুসলমানরা হয় আরাকানী, নয়তো বাঙালী, তারা রোহিঙ্গা নয়, সমগ্র বার্মার মুসলমানদেরও একই মত। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গারা আলাদা ভাবে জাতিসত্বার আলোচনায় অংশ নিতে পারে নি। আরাকানের পক্ষে আলোচনায় থাকিনরাই অন্তর্ভূক্ত হয়েছে, ফলে স্বাধীন বার্মায় আইনসম্মতভাবে রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের একটি দল মিঃ জিন্নাহর সাথে দেখা করে আরাকানের মুসলিম অধ্যুষিত উত্তর আরাকানকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করার প্রচেষ্টা গ্রহন করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু অং সান এ বিষয়ে জিন্নাহকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে স্বাধীন বার্মা সকল মুসলমানের প্রতি সাংবিধানিক ভাবে সমতা ও মর্যাদাপূর্ন আচরন করবে। ফলে এ বিষয়ে জিন্না আর কোন আগ্রহ দেখান নি। তবে অং সান মোটামুটি ন্যায্যতার ভিত্তিতেই রোহিঙ্গা ইস্যটি সমাধানের পক্ষে অবস্থান গ্রহন করেন, কিন্তু বার্মার স্বাধীনতা লাভের পূর্বেই তাঁর মৃত্য হলে বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমনি আস্থাহীনতার পরিবেশে ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে এবং অং সানের মৃত্যুজনিত কারনে উ নু বার্মার ক্ষমতাভার গ্রহন করেন। উ নু ১৯৫৪ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর এক বেতার ভাষনে রোহিঙ্গাদের একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হিসেবে ঘোষনা করেন এবং সুসংহত বার্মার প্রতি ঐক্যবদ্ধ হতে রোহিঙ্গাদের প্রতি আহবান জানান। রোহিঙ্গারা এই আহবানে মোটামুটি সাড়াও দেয়। স্বাধীন বার্মায় ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা সংসদে নির্বাচিত হতে থাকেন। সেই সাথে আরাকান ষ্টেট গঠনের আলোচনাও মোটামুটি সন্তোষজনক পথেই এগোতে থাকে। দীর্ঘদিন পর একটি শান্তির সুবাতাস বইতে থাকে আরাকানে, রোহিঙ্গাদের মনে জেগে ওঠে আশা। কিন্তু সকল কিছু ভেস্তে যায় ১৯৬২ সালে, যখন জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করেন এবং দেশে সামরিক আইন জারী করেন। সংবিধান বাতিল, পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেয়া, সরকারের নির্বাহী এবং বিচারিক সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, বাক স্বাধীনতা রহিতকরন সহ অনেক গনবিরোধী কার্যকলাপের সাথে সাথে আরাকান ষ্টেট গঠনের প্রকৃয়াও বাতিল করে দেয়। নে উইনের সামরিক সরকার দেশে একটি তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠন করে, দেশের সকল রাজনৈতিক দল বাতিল করে তারা বার্মা সোসালিষ্ট পার্টি প্রোগ্রাম নামে একটি নতুন সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করে। দেশের সকল কার্য নির্বাহের জন্য রেভ্যুলেশনারী কাউন্সিল গঠন করা হয়। আরাকান সমস্যার সমাধানের জন্য এই রেভ্যুলেশনারী কাউন্সিল এক মধ্যযুগীয় নতুন কৌশল অবলম্বন করে, এই কৌশলের সাংকেতিক নাম নাগারনিন। এর আওতায় তারা প্রথমেই দেশের সকল ব্যাংক, বড় শিল্প ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করন করে, আরাকানের ক্ষেত্রে এই কার্যক্রম ছোট বড় সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই করা হয়। বহু দিন ধরে আরাকানের ছোট বড় প্রায় সকল ব্যাবসা কার্যক্রম রোহিঙ্গাদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছিল, সুতরাং এই পদক্ষেপের কারনে রোহিঙ্গাদের আর্থিক অবস্থান ভেঙ্গে পড়ে। কয়েক বছরের মধ্যে আরাকানের আর্থিক ক্ষমতা রোহিঙাদের কাছ থেকে বর্মী এবং নব্য রাখাইন সম্প্রদায়ের কাছে চলে যায়। গনতান্ত্রিক সরকারের সময় বিভিন্ন সরকারী চাকুরিতে যে সকল রোহিঙ্গাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তাদের অনেককে বরখাস্ত করা হয়, অন্যদের জন্য এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়, যাতে তারা চাকরী ছাড়তে বাধ্য হয়। নতুন ভূমি বন্দোবস্থ অনুযায়ী কৃষিজমি এবং কৃষিকার্য থেকে রোহিঙ্গাদের অপসারন করা হয়। এইভাবে রোহিঙ্গাদের সার্বিকভাবে পঙ্গু করে দেয়ার পর ১৯৭৮ সালে শুরু করা হয় অপারেশন কিং ড্রাগন অপারেশন। এটা ছিল সমগ্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর সম্মিলিত সামরিক এবং বেসামরিক সার্বিক আক্রমন। অনেক রোহিঙ্গার মৃত্য হয় এবং অনেকে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে যায়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের নজরে এলে বার্মা দাবী করে বাংলাদেশ থকে কিছু বাঙালী নাশকতার উদ্দ্যেশ্যে বার্মায় এসে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে গোপনে অবস্থান করছিল, সরকার একটি আদম সুমারীর আয়োজন করেছে বলে তারা ধরা পড়ার ভয়ে পালিয়ে গেছে। জিয়াউর রহমানের তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার এই রোহিঙ্গা শরনার্থীদের আগমনে কিঞ্চিত অর্থাগমের সম্ভাবনা এবং কিঞ্চিত আলগা মাতুব্বরি ফলানোর সুযোগ খুঁজে পায়। জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংগঠন UNHCR প্রথমে দ্বিধায় ছিল যে এরা আদৌ বার্মিজ রোহিঙ্গা শরনার্থী, নাকি অনুপ্রবেশ কারী বাঙালী। কিন্তু বিধিনিষেধ ও বাধা সত্বেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসল ঘটনা প্রকাশ পায়, বিশেষতঃ প্রখ্যাত সাংবাদিক ফ্রাঙ্কুইস হাউটার এ বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে আন্তর্জাতিক মহলের টনক নড়ে। আন্তর্জাতিক চাপে বাংলাদেশ ও বার্মার মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সংগঠিত হয় এবং সে অনুযায়ী ১৯৭৯ সালে UNHCR এর নথিভূক্ত তিন লক্ষ শরনার্থীর মধ্যে দুই লক্ষ শরনার্থী আরাকানে ফিরে যায়। ধারনা করা হয় সমপরিমান কিংবা আরও বেশী শরনার্থী বাংলাদেশী সমাজে মিশে যায়। এর পরপরই বার্মার জান্তা সরকার একটি নাগরিকত্ব আইন প্রনয়নের কাজে হাত দেয় এবং ১৯৮২ সালে তা কার্যকর করে। এই আইন অনুযায়ী বার্মায় তিন ধরনের নাগরিক আছে; এক- যে সমস্ত জাতিস্বত্বা ১৮২৩ সালের পূর্ব থেকে বার্মায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, সেই জাতিস্বত্বার সকল মানুষ বার্মার নাগরিক। দুই- যারা ১৮২৩ সালের পর বার্মায় এসেছে, কিন্তু ১৯৪৮ সালের সিটিজেন এ্যাক্ট অনুযায়ী নাগরিকত্ব লাভ করেছে, তারা সহযোগী নাগরিক। তিন- যারা সহযোগী নাগরিকত্ব গ্রহন করতে পারে নি, তারা ন্যাচারালাইজড নাগরিক, নতুন ভাবে আবেদন করে তারা অপেক্ষমান তালিকাভূক্ত হতে পারে। নাগরিকত্ব প্রদানের সকল প্রকৃয়া করেছে কাউন্সিল অব ষ্টেটস, তাদের বিবেচনা অনুযায়ী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির প্রায় সকল মানুষ ১৮২৩ সালের পরে বার্মায় আগমন করেছে, সুতরাং রোহিঙ্গা যেমন কোন জাতিস্বত্বা নয়, এরা বার্মার নাগরিকও নয়। কেউ একজন বার্মার নাগরিক না হলে সে কোন রকম নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে পারবে না, কোন স্থাবর সম্পদের মালিক হতে পারবে না, সরকারী চাকুরীর জন্য আবেদন করতে পারবে না, কোন রকম ব্যাবসা পরিচালনা করতে পারবে না, উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে পারবে না, কতৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত এলাকার বাইরে যেতে পারবে না, এমনকি বিয়ে করতে হলেও কতৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে, এবং সে অনুমতি লাভের সম্ভাবনা খুবই কম।
১৯৮৮ সালে স্বাধীন বার্মার রুপকার অং সানের কন্যা অং সান সুকি দেশে এসে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক লীগ নামে নতুন দল গঠন করেন। গনতন্ত্রের দাবীতে সোচ্চার হয়ে ওঠে বার্মার ছাত্র সমাজ এবং জনগন, এরই পরিপ্রেক্ষিতে নে উইনের পতন ঘটে, এবং অবশেষে ১৯৯০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে অং সান সু কির দল বিপুল বিজয় অর্জন করলেও সামরিক জান্তা নির্বাচন বাতিল করে দেয়, ধরপাকর এবং ব্যাপক নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলন দমন করতেও সক্ষম হয়। জনগনের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য প্রথমে বাংলাদেশে একটা ছোট্ট সামরিক অভিযান চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু বিডিআর এবং সেনা সদস্য হত্যা ও অপহরন করা হয়। বর্মী সরকারের অভিযোগ- বাংলাদেশ বর্মী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিচ্ছে। এরপর পূর্বতন কায়দায় আবার রোহিঙ্গাদের উপর অভিযান চালিয়ে তাদের ঠেলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ১৯৯২ সালে এপ্রিল নাগাদ বাংলাদেশে UNHCR এর হিসাব অনুয়ায়ী তিন লক্ষাধীক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু প্রবেশ করে। তখন খালেদার সরকার আবার কিছু অর্থাগমের উপলক্ষ্য খুঁজে পায়, সংগে যুক্ত হয় নতুন দানব “জামায়াতে ইসলামী”। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সাম্প্রদায়িক অর্থ নিয়ে এসে কিছু রোহিঙ্গাকে নতুন ধরনের দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের ধান্ধা শুরু করে এই পরনো পাপীরা। এর মধ্যেই আবার আলোচনা ও দেন দরবার শুরু হয়, কিন্তু রোহিঙ্গারা এবার বার্মায় UNHCR এর সরাসরি তত্বাবধান ছাড়া ফিরে যেতে অস্বীকার করে। বর্মী নাগরিকত্ব আইনের সকল বিষয় মেনে নিয়ে UNHCR আরাকানে তাদের কিছু কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি লাভ করে এবং নানা আলোচনার পর অধিকাংশ তালিকাভূক্ত রোহিঙ্গা বার্মায় ফিরে যায়, কিন্তু অনেকে ফিরে যেতে অস্বীকার করে। সুতরাং ১৯৯২ সালে বৈধ এবং অবৈধভাবে যে সকল রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের অধিকাংশই আর ফেরত যায় নি। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে অং সান সুকি মিয়ানমারের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে অনেকেই রোহিঙ্গাদের ভাগ্যোন্নয়নের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু সে সে আশার গুড়ে বালি পড়তে খুব একটা সময় লাগে নি। সুকি ক্ষমতায় আরোহণের জন্য গনতন্ত্রকামী নেত্রী, শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেলেও এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে তিনি আর যাই হোন, মানবতাবাদী নেত্রী নন।
লেখক আরিফ উল মওলা
সহ সভাপতি
কেন্দ্রীয় কমিঠি
বাংলাদেশ মৎসজীবি লীগ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.