ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে কভিড-১৯-এ মৃতের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়েছে। গত কিছুদিন থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার হ্রাস পাওয়ার পরও গড়ে প্রতিদিন কভিড-১৯-এর কারণে ৭০০ মানুষ মারা যাচ্ছে। জনস হপকিন্স সেন্টারের সিনিয়র স্কলার এরিক টোনার বলেন, আমরা রোগের এমন স্তরের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি, যা বেশ বাজে ব্যাপার। এর পরও সদ্য করোনা আক্রান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অন্য রাজনৈতিক নেতারা নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়ার পক্ষে কথা বলে আসছিলেন। আগস্টেই দক্ষিণ ডাকোটায় পাঁচ লাখ মোটরসাইকেল আরোহী জড়ো হয়েছিল বার্ষিক স্টুরগিস শোভাযাত্রায়। যাদের উৎসাহ দিয়েছেন রাজ্যের গভর্নর ক্রিস্টি নোয়েম। এ শোভাযাত্রা দেশব্যাপী মৃত্যু ও হাজারো সংক্রমণের দিকে চালিত হয়েছে। একটি গবেষণায়ই মূলত জানা গেছে এ তথ্য।
করোনাভাইরাসের উত্থানের মাঝেও যুক্তরাষ্ট্রে চলেছে ইনডোর ক্যাম্পেইন। যেখানে শত শত মানুষ মাস্ক ছাড়াই উপস্থিত হচ্ছে। এমনকি ওহাইওতেই ট্রাম্প বলেছিলেন, ভাইরাসে কার্যত কেউই আক্রান্ত হচ্ছে না। অথচ এর কদিনের মাথায়ই আক্রান্ত ট্রাম্প নিজে ও ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। এর মাঝে হ্রাস পাওয়ার দুই মাস পর ফের দেশব্যাপী সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে, যা এখন গড়ে প্রতিদিন ৪০ হাজার।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসি সম্প্রতি বলেছেন, এ শীতে মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে দেশটিকে সংক্রমণ গড়ে প্রতিদিন ১০ হাজারে নামিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, আমি সংখ্যাটিকে খুব নিচে দেখতে চাইব। একটি দেশ হিসেবে গড়ে চল্লিশ হাজার সংক্রমণে আটকে পড়া খুবই অনিশ্চিত একটি অবস্থা। অবশ্যই আরো ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়া যেত। মে মাসে ইউএস বায়োমেডিকেল অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির সাবেক প্রধান রিক ব্রাইট বলেছিলেন, কোনো ধরনের জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়া দেশটি আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে শীত কাটাবে। এখন সম্ভবত দেশটি সে পথে হাঁটতে শুরু করেছে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র কেবল এখানে উদাহরণ মাত্র, ফ্লু ও সর্দিজ্বরের মৌসুমে অপ্রস্তুত বা স্বল্প প্রস্তুত সবগুলো দেশকেই বেশ বাজেভাবে ভুগতে হবে বলে এরই মধ্যে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের মতে, সংক্রমণের বর্তমান হারে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা দুই হাজারে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। এ দলটির মডেল অনুযায়ী যে অনুমান তাতে এ বছরের শেষে গিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা হতে পারে চার লাখ। মডেলারদের হিসাব একটু দ্রুতগতির হলেও তা বাস্তবতা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ডাটা সায়েন্টিস্ট ইউইয়াং গো যিনি সবচেয়ে বেশি সঠিক ভবিষ্যদ্বাণীর মডেলটা প্রদান করেছেন তিনি বলেন, এটা মানুষকে নিশ্চয়তার একটা বোধ দেয়, যখন কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।
যদিও সামনের দিনগুলোতে মহামারী মোকাবেলার জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে। তার পরও এখানে পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে, ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বললে, সেখানে কোনো সীমানা নেই, মানুষ যেখানে খুশি যেতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ যদিও মনে করেন যে এখানে আশার কোনো আলো নেই, তার পরও কোনো কোনো সম্প্রদায় ও কর্মক্ষেত্রে হয়তো প্রাদুর্ভাব থামানোর লক্ষ্যে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। তার পরও কোনো কিছু হয়তো যথেষ্ট হবে না। নেতৃত্বের বিশৃঙ্খল অবস্থার দায় হয়তো সবাইকে বহন করতে হবে। এপিডেমিওলজিস্ট বিল হানাগে বলেন, আমি এমন কাউকে চিনি না যে কিনা ভালো কিছু প্রত্যাশ করছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে পরিস্থিতি আসলে কতটা খারাপ হতে পারে।
সামনের দিনগুলোতে আবহাওয়া একটি প্রধান ও আবশ্যিক ফ্যাক্টর হতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, ঠাণ্ডা অঞ্চলগুলোতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশিই দেখা যাবে, যেটি কিনা শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য ভাইরাসের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে। যদিও সেটি কেন ঘটবে নিশ্চিতভাবে তা কেউ বলতে পারে না। জনস হপকিন্সের এপিডেমিওলজিস্ট জাস্টিন লেজার বলেন, অনেক রোগ নিয়ে চলমান বিতর্ক আছে। এটি কি সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়, যা কিনা মৌসুমি পরিস্থিতি দিয়ে প্রভাবিত? নাকি এটা কেবলই প্রকৃত বায়োলজিক্যাল এবং ফিজিক্যাল প্রক্রিয়া?
করোনাভাইরাস খুব সহজেই দুর্বল ভেন্টিলেশন আছে এমন স্থানে চালিত হয়, গবেষণা অনুযায়ী এটি কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকে। আরেক এপিডেমিওলজিস্ট এমিলি গারলে বলেন, এটা বদ্ধ ঘরে আরো তীব্র হয়ে ওঠে।
পাশাপাশি আর্দ্রতাও এখানে ভূমিকা পালন করে। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত প্রমাণ অনুযায়ী ছোট কণা কম আর্দ্রতায় অনেক দূর অবধি ভ্রমণ করতে পারে। শীতের শুষ্কতা ভাইরাসকে মানুষকে সংক্রমণের সামনে বেশ দুর্বল করে দেয়। পাশাপাশি শীতেই মানুষের কাশির সমস্যা বেড়ে যায়। তারা তখন ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হওয়ার ঝুঁকিতেও থাকে।
সাধারণ মৌসুমি ভাইরাস বিশেষ করে ইনফ্লুয়েঞ্জারও নেতিবাচক প্রভাব থাকবে। এদিক থেকে ধাক্কা আসার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে বয়স্ক লোকদের মাঝে। প্রথমে সর্দিজ্বর কিংবা ফ্লুতে সংক্রমিত হলে সেটি শ্বাসতন্ত্রের সিস্টেমকে দুর্বল করে দেবে। এরপর সার্স-কোভ-২ হানা দিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে পড়বে। ফ্লুর কারণে হাসপাতালগুলো এরই মধ্যে বেশ বিপাকে পড়েছে। সে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরাও একসঙ্গে দুটি ‘টুইনডেমিক’ নিয়ে উদ্বিগ্ন অবস্থায় আছেন। হাসপাতালগুলো পোস্ট-ফ্লু জনিত নিউমোনিয়া রোগী এবং কভিড-১৯-এর সংক্রমণ নিয়ে দ্বিগুণ চাপে পড়তে পারে। তাই বলা হচ্ছে, করোনাভাইরাস মহামারী ঠেকানোর জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ফ্লু, সাধারণ সর্দিজ্বর এবং অন্যান্য মৌসুমি ভাইরাসকেও নিয়ন্ত্রণ করবে। আগের বছরগুলোর তুলনায় এ বছর হয়তো অনেক বেশি মানুষ ফ্লু ভ্যাকসিন নেয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে। ফলে এ শীতে হয়তো মৃদু ফ্লু মৌসুমের দেখা মিলতে পারে। তাই স্কুল বন্ধ রাখা, ভ্রমণে বিধিনিষেধ, সামাজিক দূরত্ব এবং মাস্ক পরা নাটকীয়ভাবে ফ্লুর সংক্রমণকে কমিয়ে দিতে পারে। এ পরিস্থিতি ভূমিকা রাখবে সার্স-কোভ-২-এর সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও, যেটি আরো বেশি সংক্রামক ও দ্রুত বিস্তৃত হয়ে থাকে।সূত্রঃবণিক বার্তা ।
এখন ক্লাস্টার যেকোনো জায়গায় দেখা যেতে পারে, সেটি হতে পারে ফ্যাক্টরি, অফিস কিংবা আবাসিক এলাকায়ও। তবে প্রকাশ না হওয়া একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংক্রমণ বাড়ার নেপথ্যে ভূমিকা রাখে বার ও রেস্টুরেন্ট। তাই আগামী শীত মৌসুমে এদিকটিও মাথায় রেখে ব্যবস্থা নিতে হবে কর্তৃপক্ষগুলোকে।
নিউ ইয়র্কার থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তরিত

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.