নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
কক্সবাজার জেলায় হারিয়ে যাচ্ছে খেলাধুলার মাঠ। এক সময় শহরে বা উপজেলাগুলোতে খেলার মাঠের অভাব ছিল না। যার কারণে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা নিয়ে সময় পার করত শিশু- কিশোররা। কিন্তু বর্তমান সময়ে খেলাধুলার মাঠ হারিয়ে যেতে বসেছে। যার কারণে খেলাধুলা না করতে পেরে অলস সময় পার করতে হচ্ছে শিশু- কিশোরদের।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় অসংখ্য খেলার মাঠ ছিল আর এসব মাঠে বিভিন্ন ধরনের খেলার আয়োজন করা হত। খেলোয়াড়দের পদচারণায় মুখরিত থাকত খেলার মাঠ। বর্তমানে খেলার মাঠ কমে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে খেলাধুলা। খেলার মাঠের অভাবে অনেকে ছেড়ে দিচ্ছে খেলাধুলা। ছোট ছোট শিশুরা খেলার মাঠে না যেতে পেরে বাসার বারান্দায় অথবা বাসার সামনের রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে খেলাধুলা করছে। অন্যদিকে কিশোররা খেলাধুলা ছেড়ে সময় পার করতে ঝুঁকে পড়েছে বাজে আড্ডায়। হাতেগোনা কয়েকটি মাঠ থাকলেও খেলাধুলার বদলে এসব মাঠের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মেলা অথবা রাজনৈতিক জনসভার দখলে থাকে সারা বছর।
পাড়া মহল্লায় ছোট- বড় মাঠ ছিল কিন্তু এখন আর ছোট মাঠগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। হাতেগোনা বড় কয়েকটি মাঠ রয়েছে।
কক্সবাজারে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। সরকারের আন্তরিকতায় এই সব প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হলে এই পর্যটন নগরী কক্সবাজার শুধু দেশে নয় আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ন শহর হিসাবে খ্যাতি পাবে। আমরা সবাই হবো এই গর্বিত কক্সবাজারের অংশিদার
শুধু জেলা শহর নয় প্রত্যেক উপজেলাতেও খেলার মাঠ গুলো আগের মত ভাল অবস্থায় নেই। বন্ধ হয়ে গেছে বেশির ভাগ খেলার মাঠ। তাই খেলার মাঠ ঠিক রেখেই সমস্ত উন্নয়ন করার দাবী জানিয়েছে সচেতন মহল। একই সাথে রোহিঙ্গা সংকটের ফলে স্থানীয়দের জন্য বরাদ্ধের ৫% ক্রীড়াখাতে খরচ দাবী জানিয়েছে ক্রীড়ামুদিরা।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন জানান, বর্তমানে কক্সবাজার শহরে বেশির ভাগ খেলার মাঠ বন্ধ হয়ে গেছে। যে সব মাঠে আগে নিয়মিত বিভিন্ন লীগ আয়োজন হতো সে সব মাঠ এখন কাটাতার বা ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। যেমন ঐতিহ্যবাহী জেলে পার্ক মাঠ এখন বলতে গেলে বন্ধ , বাহারছড়া গোলচত্ত্বর মাঠে নিয়মিত বিভিন্ন লীগ সহ টূর্নামেন্ট আয়োজন থাকতো সারা বছর। কিন্তু বর্তমানে সেই মাঠ উন্নয়নের নামে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে।
কেন্দ্রীয় ঈদগাও মাঠ ছিল অঘোষিত ইনডোর স্টেডিয়াম। এখানে বছরে ২ বার ঈদের নামাজ পড়া হলেও এই মাঠে সারা বছর জুড়ের স্থানীয় কিশোর যুবকরা ভলিবল, ফুটবল, ক্রিকেট, হাডুডু খেলায় মাতিয়ে রাখতো। কিন্তু বর্তমানে অর্ধেক মাঠে আরসিসি ঢালাই দিয়ে পুরো মাঠকে খেলার অকোজো করা হয়েছে। ফলে এই মাঠে আর খেলা হয়না। এখন ইট, বালি বিক্রেতা এবং গাড়ী পার্কিংয়ে দখল থাকে এই মাঠ।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সংলগ্ন পিটি স্কুল মাঠ ছিল বৃহত্তর রুমালিয়ারছড়ার প্রাণ এই বিশাল মাঠে সারা বছর জুড়ে থাকতো খেলাধুলা। স্থানীয় স্কুল কলেজগুলোর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে গন্যমান্য ব্যাক্তির জানাযা সহ অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার হতো এই মাঠ। তবে সম্প্রতি এই মাঠে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশিক্ষন সেন্টার করায় অর্ধেকের চেয়ে বেশি মাঠ দখল হয়ে গেছে। এবং বাকি মাঠে নির্মাণ সামগ্রী রাখার কারনে খেলাধুলা বঞ্চিত হচ্ছে এলাকার হাজারো শিশু কিশোর। এছাড়া কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন খেলার মাঠটিতে এখন ২ টি বিল্ডিং করার কারনে সেটিও আর খেলার উপযুগী নেই বললেই চলে।
জেলা ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক মাসুদ আলম বলেন, কক্সবাজার শহরের পার্শ্ববর্তি খুরুশকুল ইউনিয়নের ডেইলপাড়ায় একটি উপজেলা মাঠ ঘোষনা করা হলেও সেটা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এছাড়া এই ইউনিয়নের কৃষ্টর দোকান এলাকায় একটি বিশাল মাঠ ছিল। সেখানে সারা বছর খেলাধুলার থাকতো। সেই মাঠ এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে রামু, টেকনাফ, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া উপজেলাতে উপযুক্ত কোন খেলার মাঠ নেই বলে জানান স্থানীয় উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা। ব্যাতিক্রম শুধু উখিয়া উপজেলা। সম্প্রতি এই উপজেলায় একটি আর্ন্তজাতিক সংর্স্থার কর্তৃক ২ টি খেলার মাঠকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
জেলা ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ও চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় ফুটবল দলে রয়েছে কক্সবাজারের ৪ জন গর্বিত সন্তান। তারা হলেন চকরিয়া উপজেলার ইব্রাহিম, জিকু, সুশান্ত এবং মহেশখালী উপজেলার সবুজ। এবং জাতীয় ক্রিকেট দলের টেস্ট দলের অধিনায়ক সৌরভ প্রতিনিয়ত কক্সবাজার বাসীর সম্মান বাড়াচ্ছে। সেই সাথে স¤প্রতি বিশ^কাপ জয়ী অনূর্ধ ১৯ জাতীয় ক্রিকেট দলে কক্সবাজারের সন্তান হাসান মুরাদ আমাদের নতুন করে সম্মান বাড়িয়েছে। যদি খেলার মাঠগুলোকে ঠিকমত সংরক্ষণ করা যায় তাহলে কক্সবাজারে জাতীয় মানের খেলোয়াড় আরো তৈরি হবে।
এদিকে কক্সবাজার শহরের আলোচিত কয়েকটি খেলার মাঠসহ প্রত্যেক উপজেলার সংকুচিত, দখলকৃত মাঠগুলো পুনরুদ্ধার এবং সব খেলার সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান। গত ১২ মার্চ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি কক্সবাজার শাখা কর্তৃক আয়োজিত খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও ক্রীড়া উন্নয়ন বিষয়ক এক সেমিনারে জেলা প্রশাসক মোঃ হোসেন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লাকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এই কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে জেলা সব খেলার মাঠের বর্তমান চিত্র তুলে আনা এবং করণীয় সম্পর্কে প্রতিবেদন দেবেন বলে জানান। ওই প্রতিবেদন মোতাবেক সব সংরক্ষণসহ করণীয় সম্পর্কে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জেলা প্রশাসন সুত্র জানিয়েছেন।
এ ব্যপারে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন বলেন, খেলার মাঠ সংরক্ষণ এটা বর্তমান সময়ের সব চেয়ে সঠিক দাবী। এখন থেকে প্রতিটি সংস্থার কাছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে জানানো হবে খেলার মাঠ রেখেই উন্নয়ন কার্যক্রম চালানোর জন্য।
| |
পরের খবর

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.