ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী: এখনও বেঁচে আছেন তাঁর কর্মের মাঝে 

 

 

সাবেক সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রদূত, আওয়ামীগ নেতা অধ্যক্ষ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী আমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন সাত বছর আগে। কিন্তু তিনি এখনও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, তাঁর কর্মের মাধ্যমে।

মরহুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর সাথে আমার পরিচয় হয় ১৯৮৯ সালে। তখন আমি কক্সবাজার সরকারী কলেজের ছাত্র ছিলাম এবং কলকন্ঠ গ্রামীণ বিজ্ঞান ক্লাব ও অভিজ্ঞান বিজ্ঞান কেন্দ্রের সাথে জড়িত ছিলাম। অভিজ্ঞান বিজ্ঞান কেন্দ্রের মাদার সংগঠন অভিজ্ঞান মুক্ত কেন্দ্রের উদ্যোগে তখন কক্সবাজার মহিলা কলেজে প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার চিত্রাংকণ প্রশিক্ষণ চলত। সেখানে আমি নিয়মিত উপস্থিত থাকতাম অভিজ্ঞান মুক্ত কেন্দ্রের একজন কর্মী হিসাবে। একদিন সেখানেই পরিচয় হয়েছিল মরহুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর সাথে। তাঁর কনিষ্ট সন্তান, তৎকালে স্কুল ছাত্র তানভীর সরওয়ার রানাও প্রশিক্ষণ নিতেন সেখানে। প্রশিক্ষক হিসাবে চট্টগ্রাম থেকে আসতেন এটিএম জিয়াউদ্দিন চৌধুরী জিয়া (বরইতলীর সাবেক চেয়ারম্যান), রতন দা-সহ ফাইন আর্টস বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটরা।

মরহুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীকে আমি ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতাম। তিনি আমাকে সম্বোধন করতেন ‘বাবাজি’ বলে। মোটামুটি প্রতি সপ্তাহেই দেখা হতো তাঁর সাথে। এছাড়া রাস্তাঘাটে দেখা হলেও কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আবার কোথাও গেলে সফরসঙ্গী করে নিতেন। একদিন তাঁর সাথে দেখা চট্টগ্রাম শহরের কাজীর দেউরী মোড়ে। তিনি রিক্সা নিয়ে ওআর নিজাম রোডের দিকে যাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে তিনি রিক্সা থামালেন। কোথায় যাচ্ছি জিজ্ঞেস করে বললেন, ওঠ। সেদিন সম্ভবত ১৯৯১ সালের ২৪ জানুয়ারী তারিখের সকাল বেলা। আমি যাচ্ছিলাম নাছিরাবাদ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজিত বার্ষিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় যোগ দিতে। অপেক্ষায় ছিলাম বাসের। ওইদিন আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে এসেছেন লালদীঘি পাড়ের জনসভায় ভাষণ দিতে। শেখ হাসিনা ওঠেছেন তাঁর ফুফাত ভাই কাজী আকরামউদ্দিনের ওআর নিজাম রোডের বাসায়। মরহুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী আমাকে নিয়ে শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে গেলেন এবং আমাকে ‘ছাত্রলীগ নেতা’ হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কুশলাদি বিনিময় করে আমি চলে এলাম ওয়েটিং রুমে, স্যার রয়ে গেলেন বৈঠকখানায়। তখন বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল। জাতীয় নির্বাচনের ডামাঢোল চলছে। স্যার ছিলেন রামু-কক্সবাজার আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী।

আমি ওয়েটিং রুমে স্যারের ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। এ রুমে স্যুট পরা ক্লিনশেভড সুদর্শন এক যুবককে দেখলাম আলমারির লুকিং গ্লাসে নিজের সাজসজ্জা ঠিক করতে। তিনি নিজেকে মহানগরী ছাত্রলীগের নেতা বলে পরিচয় দিলেন (এখন তার নাম মনে নেই)। এক পর্যায়ে ওই রুমে প্রবেশ করেন কোঁকড়ানো চুলের এক যুবক। আর  তাকে দেখেই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন সুদর্শন যুবকটি। এসময় আগন্তুক যুবককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন- ‘অ্যাই মফিচ্ছা, তোরে ন আঁই রডদি পিড়াই দে? তুঁই এন্ডে আবার কিল্লাই আইস্শস্?!’ উত্তরে কিছুই বললেন না কোঁকড়ানো চুলের যুবকটি। এরপর তার মন খারাপ করা, ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে সেদিন মনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। পরে জানলাম, কোঁকড়ানো চুলের যুবকটির নাম মফিজুর রহমান। যিনি পরে মহানগরী ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছিলেন। এখন সম্ভবত স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। যাই হোক, পরে ওসমান স্যার বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে তাঁর ভায়রা নাদের খানের নাছিরাবাদস্থ বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন। পথে যেতে যেতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক কথা বললেন। তারমধ্যে একটি ঘটনার কথা এখনও আমার মনে গেঁথে আছে। তিনি বলছিলেন- ‘আমি ছিলাম সেদিন ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সাথে, বঙ্গবন্ধু তখন সরকার প্রধান। রাষ্ট্র পরিচালনার নানা বিষয় নিয়ে তিনি দিক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে দেশের বিমান বাহিনী প্রধান এসে বঙ্গবন্ধুকে জানালেন, ভারত তার দেশের উপর দিয়ে আসা বাংলাদেশগামী সকল বিমানকে এদেশে প্রবেশের আগে ভারতে যাত্রা বিরতি করার নির্দেশ জারি করেছে। একথা শুনে বঙ্গবন্ধুও মুহুর্ত দেরী না করে ভারতের বিমান বাংলাদেশের উপর দিয়ে চলাচলের উপরও একই নির্দেশনা জারি করেন।’ ওসমান স্যারের মুখ থেকে এ কথা শুনে আমার শরীরের উপর দিয়ে এক শিহরণ বয়ে যায়। যুদ্ধ বিধ্বস্ত এক দূর্বল দেশের নেতা হয়েও বঙ্গবন্ধু নিজ দেশের সম্মান বিসর্জন দেননি! কত বড় সাহসী নেতা হলে তিনি একথা বলতে পারেন! কথা শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম। এরই মাঝে নাছিরাবাদ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছাকাছি এসে আমি রিক্সা থেকে নেমে বিজ্ঞান মেলার অনুষ্ঠানে চলে যাই, আর স্যার তাঁর ভায়রার বাসার দিকে চলে যান।

পরদিন বিকালে বিজ্ঞান মেলা শেষ করে আমি যখন কাজীর দেউরী হয়ে চন্দনপুরায় (চট্টগ্রামে গেলে আমি বিজ্ঞানবার্তা সম্পাদক ও কলকন্ঠ গ্রামীণ বিজ্ঞান ক্লাবের কেন্দ্রীয় পরিচালক মহিউদ্দিন ইসলামের বাসায় ওঠতাম) ফেরার জন্য বাসের অপেক্ষা করছিলাম, তখনই ফের দেখা হলো স্যারের সাথে। মলিন চেহারা। রিক্সা থামিয়ে ‘অবাজি আইঅ’ বলে কাছে ডাকলেন। আমি যন্ত্রচালিতের মত তার রিক্সায় ওঠে গেলাম। রিক্সাটি খুলশির দিকে যাচ্ছিল। দেখে তাঁকে চিন্তিত মনে হল। ওমেন কলেজ মোড়ের আগে এক সুরম্য প্রাসাদের সামনে গিয়ে আমরা নেমে পড়ি। এরপর দারোয়ান গেইট খুলে দিলে আমরা ভেতরে প্রবেশ করি। সেখানে আমাদের অভ্যর্থনা জানান চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্যারের ভায়রা জনাব নাদের খান (পেড্রোলো পানির পাম্পের জন্য বিখ্যাত)। চা-নাস্তার ফাঁকে স্যার তাঁর ভায়রাকে নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার কথা জানান। শুনে ভায়রা স্যারকে বললেন- ‘জনপ্রিয়তা থাকলেও আপনারতো টাকা নেই।’ স্যার বললেন- ‘আমার জন্য রামুবাসী চাঁদা তুলবে।’ এরপর স্যারকে তাঁর নমিনেশন প্রত্যাহার না করার পরামর্শ দেন সারের ক্ষুব্দ ভায়রা। পরের কথা সবাই জানে। স্যার দলীয় আনুগত্য দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। সেই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলেও এই আসন থেকে আওয়ামীলীগ প্রার্থী মোস্তাক আহমদ চৌধুরী মাত্র ৯শ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। যদি ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী তাঁর ভায়রার পরামর্শে বিদ্রোহী প্রার্থী হতেন?   চলবে……..

আহমদ গিয়াস

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

কক্সবাজার। 

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.