হে কাপ্তাই তুমি রবে স্মৃতির অ্যালবামে

নার্গিস পারভিন, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে:
প্রয়োজনের তাগিদে প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছি আমি। ছকে বাঁধা জীবন আমার তবুও কাপ্তাইয়ের নয়নাভিরাম মনোমুগ্ধকর পরিবেশ আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না।ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায়বন্দী প্রবাসী জীবন হতে আমার বিগলিত চিত্ত বারবার ঘুরে বিচরণ করে কাপ্তাই আর কাপ্তাই মানেই আমার ছেলেবেলা।

দিনগুলো মোর সোনার খাঁচায় রইল না,সেই নানা রং এর দিনগুলো কখনো ফিরে আসবে না জানি। অনেকটা সময় পারকরে আমি আজ অনেক দূরে ফেলে আসা দিনগুলো আমাকে দারুণভাবে ভাবায়। আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের মাঝে জড়িয়েছিল আমার ছেলেবেলা। খুব বেশি মনে পড়ে কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাঁধের কথা। বিশেষ করে পরীক্ষা শেষ হলে ঈদের সময় বাঁধে না গেলে মনে হতো- বড় কিছু মিস করে ফেলেছি। সবাই মিলে বাঁধে ঘুরতে চলে যেতাম দল বেধে, স্বাধীন চিত্তে বুক ফুলিয়ে বাধেঁর উপর ঘুরে বেড়াতাম ছিল না কোন পিছুটান।সাথে মায়ের বুকুনি তো আছেই তারপর ও সুযোগ পেলে যখন তখন বাধেঁ যেনো যেতেই হবে।মনটা কেমন বদলে যেত বাঁধে গেলে।ঈদের সময় বাঁধে না যেতে পারা মানে এবারের ঈদ টাই হয়নি এমন অনুভূতি বিরাজ করা।নতুন জামা পড়ে সোডিয়াম লাইটের নিচে বাঁধে ঘুরে বেড়ানোর মজাই ছিল আলাদা,সোডিয়াম লাইট গুলো গায়ের পোষাকের রং পাল্টে দিত এসব নিয়ে হাসাহাসি মজা করা ও সব বন্ধুদের সাথে একসাথে এক জায়গায় দেখা হয়ে যাওয়া কোলাকুলি করাই ছিল আমাদের ঈদ। এই জীবনে আর কখনো সেই ঈদ ফিরে আসবে না। সময় বড় বেশি স্বার্থপর।

আজ কাপ্তাই নিয়ে লিখতে বসে মনে পড়ে গেলো আমার সাথীদের কথা, যাদের নাম না লিখলেই নয়। লুনা, সুমি, মর্জিনা, ছন্নি, মন্টি, রুবি শিউলি, লাইজু, পান্না, দিবা, চিনু, শিউলি, ইতি, শর্মি, চম্পা, সম্পা , আঁখি, বাবু, ,রেবা, আয়েশা, দেলোয়ারা, হোসনা, রাবেয়া, ফেরদৌসি, পান্না, শাহিনুর, রবিন, কোহেন, মিথুন, বাপ্পী, টিপু , সুমন, সাইফুল, মনির, সুমন, শান্তু, নাসির, লালু, আফজাল, পারভেজ, ফরহাদ, মফিজ, হয়ত অনেকের নাম এই মুহুর্তে মনে নেই।

আমার সাথীরা তোদের খুব মিস করি আজ এই লেখার মাধ্যমে সবাইকে আমার অফুরন্ত ভালবাসাটুকো ছড়িয়ে দিলাম।যে যেখানে আছিস ভাল থাক। তোরাই আমার প্রকৃত বন্ধু কাপ্তাইয়ের মাটি আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে একে অপরকে ভালবাসতে হয়। বন্ধন কাকে বলে, কাপ্তাইয়ের সব কিছুই ব্যতিক্রম যা পৃথিবীর কোথাও নেই।মানুষে মানুষে কত মিল, সুখেদুঃখে একে অপরের পাশে থাকা, শুধু প্রশান্তি আর প্রশান্তি। আমরা কাপ্তাইর সবাই ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একাকার।কাপ্তাইয়ের কৃষচুড়া আমি আর কোথাও দেখিনি। ছায়া সুনিবিড় পরিবেশ, সচ্ছ নির্মল, শান্ত প্রকৃতি আর কোথাও দেখিনি। কাপ্তাইয়ের শাকসবজি, ফলের মত স্বাদ কোথাও পাইনি।

খুব ইচ্ছে ছিল সারাজীবন যদি কাপ্তাই থাকতে পারতাম। তবে নিয়তির খেলা সব কে কোথায় যায় কেউ জানে না।প্রতিটা জায়গা খুব মিস করি প্রিয় বিদ্যালয় (বিদুৎ উন্নয়ন বোর্ড মাধ্যমিক বিদ্যালয় )ও বিদ্যালয়রে সংলগ্ন পরিবেশ বড় মাঠ, গ্যালারি ,বট গাছ, তাল গাছ, কৃষ্নচুড়া গাছ, সেই সাথে শ্রদ্বেয় শিক্ষক শিক্ষিকা বৃন্দ ও বিদ্যালয়ের সকল নিয়ম কানুন ,এসেম্বিলি, কুজকাওজ, ঝুমুর নৃত্য , সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রিড়া প্রতিযোগিতা , সিনেমা হলে স্বাধীনতা বিষয়ক ভিডিও দেখানো , সেই শহীদ মিনার প্রভাত ফেরি , রোযার মাসে সাইরেনের ধ্বনি , বন্ধু-বান্ধবী আমি কখনো মন হতে মুছে দিতে পারব না।

কোথায় যে হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো বুঝতে পারিনা। আর কি কখনো ফিরে আসবেনা সেই দিনগুলো? অনেক কিছুই আজ স্মৃতি। গতকাল যা চিরন্তন বাস্তব ছিল আগামীকাল তা স্মৃতি হবে- এটাই সত্য। ফেলে আসা দিনগুলোতে যা হারিয়েছি তা আর কখনো ফিরে পাবনা। কাপ্তাইয়ের স্মৃতি সারাক্ষণ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, যা শুধু উপলব্ধি করা যায়। কাউকেই বুঝাতে পারিনা। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু মনের অজান্তে মনে পড়ে শুধু কাপ্তাই। চোখ বন্ধ করলেই দেখি কাপ্তাইয়ের বাঁধের সেই মুগ্ধ রুপ, দূরে আকাশ হেলান দিয়ে ওই পাহাড় ঘুমাই। মেঘে ছেয়ে যাওয়া বিশাল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা সাথে কর্ণফুলী নদী মিলেমিশে একাকার। কাপ্তাইর বাঁধ যেনো জাদু জানে বাঁধের পরিবেশ মানুষের মনকে কেমন যেনো বদলে দেয় । পরিশেষে এটাই বলব- হে কাপ্তাই “তুমি রবে নিরবে হ্রদয়ে মম” স্মৃতির অ্যালবামে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.