বৃটেনের নির্বাচন এবং জেরেমি করবিন

গত ৮ জুন বৃটেনের সাধারণ নির্বাচনে লেবার দলের নেতা জেরিমি করবিন সরকার গঠন করতে পারেননি সত্য তবে নির্বাচনে জিতেছেন বৃটেনের মজলুম শ্রেণি। এবারের নির্বাচনে বিগ মিডিয়া ও এলিট ক্লাসের নেতা ছিলেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির তেরেসা মে আর অন্য পক্ষ ছিলো বিধ্বস্থ শ্রেণির মজলুম মানুষ তার নেতা জেরিমি করবিন।

করবিন লেবার দলের এমপি ছিলেন ছয় বার। তাকে লেবার নেতৃত্ব কখনও পছন্দ করেনি। যে কারণে মন্ত্রী করা দূরে থাক কখনও ছায়ামন্ত্রী সভার সদস্য পর্যন্ত করেনি। করবিন বাম ঘরানার লোক। লেবার দলের নেতৃত্বে যে এলিট শ্রেণীটি দীর্ঘদিনব্যাপী বহাল ছিলো, তারা মূলত ছিলেন কনজারভেটিভ নেতাদের চরিত্রগুণের অধিকারী।

টনি ব্লেয়ার দীর্ঘদিন লেবার দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি লেবার দলের সব চারিত্রিক গুণাবলী বিনষ্ট করে বৃটেনকে যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের ভূমিকায় এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। তার ইশারায় বৃটিশ গোয়েন্দারা বলেছিলো ইরাকের কাছে রাসায়নিক অস্ত্র রয়েছে। ইরাক যুদ্ধের মূল বাহানা তো ছিল এটাই। ব্লেয়ার নিকৃষ্টভাবে ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত ছিলেন।

হয়তো অনেকে জানেন, আমি ইরাক যুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে রিপোর্ট করেছি। বিবিসি, ডয়েসে ভেলে (জার্মানী) রেডিও, বাংলাদেশের চ্যানেল আই ও অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজে রিপোর্ট করেছি দীর্ঘ ৫১ দিন ধরে। টনি আর বুশের নৃশংতা দেখা হয়েছে কাছ থেকে। তাই ধান বানতে শিবের গীতের মতো মনে হলেও বললাম কথাগুলো।

টনি ব্লেয়াবের সময় লেবার পার্টিতে বিভাজন ছিলো। নিউ লেবার আর ওল্ড লেবার। নিউ লেবাররা ছিলো এলিট শ্রেণী আর ওল্ড লেবাররা ছিলো সাধারণ শ্রেণির লোক। টনি ব্লেয়ারের পর লেবারের নেতা হন গর্ডন ব্রাউন। গর্ডন ব্রাউনের পর ওল্ড লেবারের করবিন লেবার দলের নেতা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং বিপুল ভোটে লেবার দলের নেতা নির্বাচিত হন।

করবিন লেবার পার্টিকে তার জন্মের প্রতিশ্রুতিতে ফিরিয়ে এনেছেন। করবিন যখন লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হয়ে ছায়া মন্ত্রীসভা গঠন করেন তখন তার ছায়া মন্ত্রীসভায় নিউ লেবারের কোনো নেতা যোগ দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। মিডিয়া মুগলরা আর অভিজাতরা মনে করেছিলেন করবিন বৃটিশ রাজনীতিতে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকাই পালন করতে পারবেন না।

এবারের অপ্রত্যাশিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে লেবার পার্টিকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন করবিন। লেবার পার্টির সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন না পেলেও এলিট শ্রেণি এবং মিডিয়ার ভুল ত্রুটিকে উপেক্ষা করে জোরালো অবস্থানে নিয়ে লেবারকে পৌঁছিয়েছেন।

কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, করবিন আগামী নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের পটভূমিকা এ নির্বাচনে রচনা করে রাখলেন।

ধনবাদীদের দাপট, বিগ মিডিয়াগুলোর প্রচারণায় মনে হয়েছিলো লেবার পার্টি এবং করবিন যেন স্রোতে ভেসে যাবে। বিগ মিডিয়াগুলো তেরেসা মে কে এমনভাবে প্রোজেক্ট করেছিলো যে তিনি যেন মার্গারেট থেচারের চেয়েও বেশী জনপ্রিয় অবস্থানে রয়েছেন।

বৃটিশ জনগণ যেন ব্রেক্সিট-এ দরকষাকষির জন্য তার বাক্স ভর্তি করে ভোট দেবেন। বিগ মিডিয়াগুলোর প্রচারণা দেখে মনে হয়েছিলো যে বৃটেনের মানুষের পেট পিঠ কিছু নেই হয়তো বা তাদের জন্ম হয়েছিলো ধনীদের ধন বাড়ানোর কাজে। কামলার কাজ করতে আর তাদের কৃপার জন্য চোখ তুলে চেয়ে থাকবে।

ভারতে দেখেছি ক্ষত্রিয়রা রাম নাম নিয়ে দলিতদের মাথা তুলতে দেয় না আর সেই দলিতেরাই রাম নামের ভক্ত। রাম নাম নিয়েই তারা ক্ষত্রিয়ের পায়ে মাথা ঠেকায়। বৃটেনেও এরূপ একটা নিম্নশ্রেণি আছে যারা ধনবাদীদের কৃপার মুখাপেক্ষি হয়ে থাকে। তারা কৃপার মুখাপেক্ষি হওয়ার মাঝে আত্মার সন্তুষ্টি খুঁজে পায়।

করবিন সম্ভবতো বৃটেনের দরিদ্র জনগণের চরিত্রের এ বৈশিষ্ট্য খুবভালভাবেই অবলোকন করেছেন। এ নির্বাচনে করবিন যুবাগোষ্ঠীর দ্বারস্থ হয়েছেন খুব বেশী। যুবা গোষ্ঠী তাকে বিমুখ করেনি।

যেখানে ১৫ শতাংশ যুবা গোষ্ঠী তেরেসা মে কে সমর্থন করেছেন সেখানে ৭১ শতাংশ যুবক করবিনের জন্য কাজ করেছেন আর করবিনকে ভোট দিয়েছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৫১ শতাংশ লোক লেবারের পক্ষে ছিলো।

ক্যামেরুন অহেতুক একটা গণভোটের আয়োজন করে শেষ পর্যন্ত গণভোটে পরাজিত হয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তেরেসা মে-র এই নির্বাচনের ঝুঁকি গ্রহণটাও ছিলো অহেতুক। পার্লামেন্টে কনজারভেটিভ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিলো যা দিয়ে তিনি অনায়াসে আরো তিন বছর প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল থাকতে পারতেন।

ব্রেক্সিটে দরকষাকষির জোর বাড়াতে গিয়ে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করলেন। আম ছালা সবই হারালেন। আগে পার্লামেন্টে ১৬ সদস্যের মেজরিটি নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিলো। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে তাদেরকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হল, যার পার্লামেন্টে সদস্য সংখ্যা ১০ জন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ দলটার উপর তেমন নির্ভর করা যায় না। যে কোনো সময় তারা সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারেন। তেরেসা মে আগামী বছরের মে- জুন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকে কিনা কে জানে!

রক্ষণশীল দলের সবাই তেরেসা মে-র উপর বিরক্ত। তাদের একটা প্রশ্ন কেন তিনি অসময়ে অকারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে গেলেন? এখন যে কোনো মুহূর্তে আর একটা নির্বাচনের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে পথ চলতে হবে। বৃটেনে অনুরূপ অপ্রত্যাশিত নির্বাচনের ফলাফল এযাবৎ ভাল হয়নি।

হ্যারল্ড উইলসন ১৯৭০ সালে আর ১৯৭৪ সালে এডওয়ার্ড হীথ অপ্রত্যাশিত নির্বাচন করে কোনো ভাল ফলাফল লাভ করতে পারেনি। যদি অপ্রত্যাশিত কারণে পুনরায় বৃটিশ জাতি নতুন নির্বাচনের সম্মুখীন হয় তবে রক্ষণশীল দলের ভরাডুবি অবধারিত।

কারণ তাদের অদূরদর্শিতার কারণে বৃটেন বারবার নির্বাচনের সম্মুখীন হচ্ছে। গত ৫০ বছরের বৃটিশ জাতির নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এরূপ একটা ধারণাই বদ্ধমূল হয়।

মনে হয় লেবার দলের করবিনের জন্য শিগগিরই একটা অপ্রত্যাশিত সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। এখন থেকেই করবিনকে কঠিন দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। এবারের নির্বাচনে তিনি কতগুলো খাতকে জাতীয়করণ করার কথা বলেছেন।

৬০ ও ৭০ এর দশকে লেবার পার্টি অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। মনে হয় জাতীয়করণের সে সময়ের ফলাফল নিরীক্ষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সঠিক হবে।

শিক্ষাখাতে তিনি ফি মওকুফ করার কথা বলেছেন। খৃষ্ট জাতি কখনও পরিপূর্ণ খৃষ্টান হতে পারেনি। আমি করবিনের মুখাবয়বে যীশুর অবয়বের ছাপ দেখি। আচরণেও যীশুর মতো সরল এবং দুঃখী মানুষের দুঃখে ভারাক্রান্ত।  তার সময়ে হয়তো বৃটেনের খৃষ্ট জাতি পরিপূর্ণভাবেই খৃষ্টান হবে- এ প্রত্যাশার সঙ্গে করবিনকে ক্ষমতায় দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

আনিস আলমগীর : সাংবাদিক ও শিক্ষক।
anisalamgir@gmail.com

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.