পর্যটন নগরী কক্সবাজারে অবৈধ দখলে সরকারি জমি

# ২ লাখ ৬০ হাজার একর বনভুমি
# প্রায় ৪৬ হাজার একর বেদখল
# টেকনাফ ও উখিয়ার প্রায় ১০ হাজার একর বনভূমিতে আশ্রয়শিবির
মো. নেজাম উদ্দিন. কক্সবাজারঃ
কক্সবাজারের কলাতলী হোটেল মোটেল এলাকার পাশ দিয়ে যাওয়া সড়ক ধরে কিছুদূর এগোলে চোখে পড়বে উঁচু পাহাড়ের ঢাল। ওই পথ ধরে যতদূর এগোনো যাবে, শুধু পাহাড়ের ধ্বংসস্তুপ আর হরেক রকম নির্মীয়মান ও নির্মাণ শেষ হওয়া অবকাঠামো দেখা যাবে। কক্সবাজারের ইতিহাস বলে ঝিলংজা মৌজার ওই এলাকার পুরোটা একসময় উঁচু উঁচু পাহাড়ে ঘেরা ছিল। শুধু কক্সবাজার সদর নয়, জেলার রামু, মহেশখালী থেকে শুরু করে কুতুবদিয়া বা সোনাদিয়া দ্বীপজুড়ে বনভূমির নিধনযজ্ঞ বেশি দেখা যাবে।
সরকারি সংস্থা বন বিভাগের হিসাবে কক্সবাজারের ২ লাখ ৬০ হাজার একর বনভূমির মধ্যে প্রায় ৪৬ হাজার একর বেদখল হয়ে আছে। সেখানে ৪৩ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও ৬৯৬টি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে সেখানকার জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ বন দখল করে আছে। প্রায় প্রতিদিন এসব বনভূমির গাছ আর পাহাড় কেটে সেখানে নিত্যনতুন স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বনভূমি উদ্ধার নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা রয়েছে। বন বিভাগ থেকে এসব বনভূমি উদ্ধারের জন্য বার বার চিঠিও দিচ্ছে। কিন্তু বন দখলমুক্ত না হয়ে বরং আরও বেশি দখলের শিকার হচ্ছে। কক্সবাজারে কারা কীভাবে বন ধ্বংস করছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) যৌথভাবে কক্সবাজারের বনভূমি ধ্বংস হওয়া নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল কিছুদিন আগে। তাতে দেখা গেছে, কক্সবাজার জেলায় বন ধ্বংসে এগিয়ে রয়েছে খোদ সরকারি সংস্থাগুলো। নিয়মিতভাবে নিত্যনতুন সরকারি সংস্থা সেখানকার বনভূমি ইজারা নেওয়ার জন্য আবেদন করে চলেছে। অনেক সংস্থা অনুমোদন নেওয়ার আগেই সেখানে স্থাপনা গড়ে তুলছে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটিজ ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন জানান,উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আর সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যালয় স্থাপনের নামে কক্সবাজারকে বনভূমি শূন্য করা হচ্ছে। কীভাবে একটি দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকা ধ্বংস হতে পারে, তার বড় উদাহরণ হতে পারে কক্সবাজার। অথচ বনভূমির উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাই হতে পারত উন্নয়নের মূল বিষয়।
বেলা ও ইয়েসের ওই গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য যে পরিমাণে বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে প্রায় আড়াই গুণ বেশি বনভূমি খোদ সরকারি সংস্থাগুলো বরাদ্দ নিয়েছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসার পর রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে একের পর এক পাহাড়ি বন উজাড় করছিল। গত দুই বছর সেখানে বিকল্প হিসেবে এলপিজি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গা শিবিরের আশপাশের বনগুলো আবারও সবুজ হয়ে উঠছে। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলোর নামে বরাদ্দ পাওয়া জমিগুলোর বন কেটে তৈরি করা হচ্ছে নানা অবকাঠামো।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বড় ঢল বাংলাদেশে আসার পর তাদের টেকনাফ ও উখিয়ার ৬ হাজার ১৬৪ একর বনভূমিতে আশ্রয়শিবির স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। বন বিভাগের কাছ থেকে ওই সংরক্ষিত বনভূমির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া জমির পরিমাণ হচ্ছে ১৪ হাজার ৩৭২ একর। যার বড় অংশ সরকারি সংস্থা। এসব জায়গায় সরকারি সংস্থাগুলো কার্যালয়সহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করছে। কক্সবাজারে দিন দিন রক্ষিত এবং সংরক্ষিত বনভূমি দখলের ঘটনা ঘটছে। দখলকৃত এসব জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে ঘর-বাড়ি, খামার ও মার্কেট। এ পর্যন্ত জেলায় ৪৭,৯১৪ দখলদারের হাতে ধ্বংস হয়েছে ২৫০০৭.৬৯ একর বনভূমি। আর সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে বন্দোবস্ত ও রোহিঙ্গাদের জন্য ধ্বংস করা হয়েছে আরও ২৪৩৫১.৮৪ এরক বনভূমি। সবকিছু মিলে কক্সবাজারে মোট বনভূমির ৩৯ শতাংশের অধিক বনভূমি ধ্বংস হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি, বনদস্যু ও প্রভাবশালীরা এসব দখলবাজিতে জড়িত। প্রকাশ্যে দখলের ঘটনা ঘটলেও বন রক্ষায় তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি বন বিভাগ। তবে বন বিভাগের দাবি, অতীতে যা দখল হয়েছে তা উদ্ধারের পাশাপাশি অবশিষ্ট বন রক্ষায় সচেষ্ট রয়েছেন তারা।
বন বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগে রক্ষিত ও সংরক্ষিত মিলে মোট বনভূমি রয়েছে ১২৫২৫৬.৭৭৩৯ একর। যেখানে সংরক্ষিত বন ১ লাখ ৯৫০.৮৪৪ এবং রক্ষিত জমি ২৪২২৯.৩২ একর। মোট জমি থেকে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে ৪৭৮৭.৮৪ একর। আর ৪৭,৯১৪ জন দখলদার গিলে খেয়েছে ২৫০০৭.৬৯ একর। এ হিসেবে বনবিভাগের মোট ৪৯৩৫৯.৫৩ একর জমিই ধ্বংস হয়েছে। পাল্লা দিয়ে বনভূমি দখল হলেও তা রক্ষায় কার্যকর কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছেনা। বরং নীরব ভূমিকা পালন করছে বনবিভাগ। দিন দিন বনভূমি ধ্বংস হওয়ার ফলে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাবেক সভাপতি ফজলুল কাদের বলেন, শিল্পায়নের এ যুগে জলবায়ু পরিবর্তনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বাতাসে বাড়ছে কার্বনের পরিমাণ। এরইমধ্যে বাংলাদেশে দিন দিন বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কক্সবাজার রক্ষা করতে বেদখল হওয়া বনভূমি উদ্ধার করে বনায়ন সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই।
বন বিভাগের দাবি, বনভূমি উদ্ধার নিয়ে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় সভাও করেছে বন বিভাগ। তবে, লোকবল সংকটের কারণে বনভূমি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে দাবি করেছে বন বিভাগ।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সরওয়ার আলম জানান, ৪০ শতাংশ জনবল সংকট রয়েছে আমাদের। তাই বিশাল বনভূমি রক্ষা করা আমাদের জন্য কঠিন। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি বেদখল হওয়া সব জমি উদ্ধারের। ১০০ দিনের কর্মসূচিতে আমরা ৮ হাজার একর জমি উদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে জমি উদ্ধারে দ্রæতই কাজ শুরু করা হবে।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন সরকার জানান, সর্বশেষ ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে দখলদারের বিরুদ্ধে ১৩১টি মামলা করা হয়েছে। আমরা ১৫ হাজার একর জমি উদ্ধারের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। ধীরে ধীরে বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার করা হবে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জাহিদ ইকবাল জানান, বন বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী বনভূমি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.