নদী ভরাট করে উন্নয়নের সড়ক!

মোঃ নেজাম উদ্দিন,
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলাতে নদী ভরাট করে উন্নয়ন কাজে যাতায়াতের জন্য তৈরি করা হয়েছে সড়ক। আর এতে স্থানীয় প্রশাসনের বিন্দু মাত্র মাথাব্যথা নেই। কক্সবাজারের উত্তর-পশ্চিমে চকরিয়া উপজেলা পেরিয়ে মহেশখালী দ্বীপ। দ্বীপের তিন দিকে বঙ্গোপসাগর, একদিকে কোহেলিয়া নদী। নদীর ওপর বদরখালী সেতু। সেতুটি দ্বীপকে মূল বুকে সঙ্গে বেঁধেছে। মাতারবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব দিকে কোহেলিয়া নদী, উত্তর দিকে উজানটিয়া নদী এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এছাড়া ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে রাঙ্গাখালী খাল।প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম ট্যাক্সি বা রিক্সা। এছাড়া তারা বেশি ভাগ নৌপথে এ ইউনিয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে।
মহেশখালীর গা-লাগোয়া অনুদ্বীপ মাতারবাড়ীতে সমুদ্রবন্দর । ইতিমধ্যে বিদেশ থেকে জাহাজ এসে ভিড়েছে এখানে। উন্নয়ন কর্মকান্ডে মহেশখালী-মাতারবাড়ীর পুরো চেহারা পাল্টে যাচ্ছে এসব কথা শুনে সম্প্রতি দ্বীপের উদ্দ্যেশে যাত্রা করেছিলাম। মাতারবাড়ি ব্রীজ পেরিয়ে কোহেলিয়া নদী দেখছিলাম। এমন সময় স্থানীয় একজন এসে জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কি সাংবাদিক ? আমি হ্যা সূচক বলে নাম জানতে চাইলাম। নাম বললেন বাহাদুর। সে স্থানীয় বাসিন্দা ও পেশাগতভাবে একজন জেলে।
বাহাদুর জানালেন , কোহেলিয়া নদীর পাশেই আমার বাড়ি। আমার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন মাছ ধরা। এখন কোহেলিয় নদী ভরাট করে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে যাওয়ার জন্য রাস্তা করেছে যার কারনে নদী ছোট হয়ে গেছে। তাতে আমাদের এখন মাছ মারতে যেতে হয় জীবনের ঝুকি নিয়ে সমুদ্রে। গত পরশু মাছ মারতে গিয়েছিলাম, কিন্তু কোস্ট গার্ড় আমার জাল নিয়ে কেটে ফেলেছে। এ কেমন বিচার ?
কক্সবাজার জেলার অন্যতম নদীর মধ্যে কোহেলিয়া নদী একটি। তা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় কালারমারছড়া ও মাতারবাড়ী-ধলঘাটার মাঝখানে অবস্থিত কোহেলিয়া নদী । আদিকাল থেকে যুগ যুগ ধরে জোয়ার-ভাটায় আপন গতিতে ভরা যৌবনে প্রবাহিত হত কোহেলিয়া নদীর ¯্রােত । সম্প্রতি সময়ে কক্সবাজারের মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী পুরানো এই কোহেলিয়া নদী বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে । মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে দেশের সর্ববৃহৎ কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য মাতারবাড়ীর দক্ষিণে ১৪’শ ১৪ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে বর্তমানে সেখানে মাটি ভরাট করে প্রকল্পের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চলছে দ্রæতগতিতে। আর সে সব প্রকল্পের বিভিন্ন বর্জ্য ও পলি মাটি গুলো পাইপের মাধ্যমে সরাসরি কোহেলিয়া নদীর উপর ফেলায় দিন দিন ভরাট হচ্ছে এ নদীটি ।
অপর দিকে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে যাতায়াতের জন্য নদী ভরাট করে মাতারবাড়ী ব্রীজ থেকে দক্ষিণে প্রায় বিশাল বড় সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে । স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে সাড়ে ১৩ কিলোমিটার লম্বা এই সড়কটি ব্যবহার হবে শুধু মাত্র কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য । সড়কের জন্য ব্যয় হয়েছে আনুমানিক সাড়ে ৬শত কোটি টাকা। এই সকড়টি নির্মাণের কাজ করছে মীর আকতার হোসেন কনস্ট্রাকশন লিঃ নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্টান ।
যার কারনে নদীটি আরো ছোট হয়ে গেছে। এখন আর সেই নদী নেই । এর ফলে ঐ নদীর উপর চলাচল কারী ইঞ্জিনচালিত লবণের বোট ও বিভিন্ন ধরনের নৌ-যান চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে । মাতারবাড়ীতে নির্মাণাধীন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পলি মাটি নদীর পানির সাথে মিশে গিয়ে বর্তমানে নদীর পানি ঘোলাটে এবং দূষিত হওয়ায় নদীর দু’পাশে প্রায় অর্ধশত চিংড়ি মাছের প্রজেক্টে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে মাছ মারা যাচ্ছে ।
চিংড়ি প্রজেক্টের ইজারাদারদের প্রতি বর্ষা মৌসুমে শত কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয় । চিংড়ি খাত থেকে সরকার প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের চাকা সচল রাখলেও এনিয়ে স্থানীয় প্রশাসন কোন মাথাব্যথা করছেনা। । এমতাবস্থায় যদি কোহেলিয়া নদীটি হারিয়ে যায় তাহলে এক দিকে যেমন এ নদীর উপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার জেলে পরিবার সহ অন্যান্য পেশার লোকজন যেমন বিভিন্ন ইঞ্জিন চালিত নৌ-যানে থাকা শ্রমিক , লবন শ্রমিক ও চাষীরা বেকারত্ব হবে। তেমনি ভাবে নদীর উভয় পাশে থাকা শতাধিক চিংড়ি প্রজেক্ট গুলোতে মাছের দূর্দিন দেখা দিবে। এতে সরকারও বিশাল অংকের রাজস্ব হারাবে।
কোহেলিয়া নদী দিন দিন ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ায় জেলেদের জালে আগের মত তেমন আর ধরা পড়ছেনা সামুদ্রিক মাছ । ফলে বেকারত্ব ও অনাহারে অর্ধাহারে দিন যাপন করছে হাজারো অধিক জেলে পরিবার । স্থানীয় জেলে হাসান বলছিলেন, এখন যেখানে সড়ক হচ্ছে সেখানে আমরা জাল বসাতাম এখন ভরাট করে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে।
আরাফাত বলছিলেন, এমনভাবে আমাদের রিজিক ধ্বংস করে ফেলবে ভাবতে পারি নাই। যেখানে আমরা জাল দিয়ে মাছ ধরতাম সেখানে এখন গাড়ি নিয়ে চলাচল করার জন্য সড়ক নির্মাণ কাজ চলছে।
বর্তমানে কোহেলিয়া নদীটি ভরাটের কারনে ভাটার সময় ছাড়াও পূর্ণ জোয়ারেও এখন বড় ও মাঝারি লবন বোট সহ বিভিন্ন ইঞ্জিন চালিত নৌ-যান চলাচল করতে পারছে না । আগে এ নদীতে দেখা যেত পাঁচ হাজার মণ ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন লবণের বোট চলাচল করতে । শুধু তাই নয় এ নদীর উপর নির্ভরশীল বিভিন্ন শ্রেণির পেশার মানুষের একমাত্র আয়ের উৎস মাছ , কাঁকড়া ও লবন নিয়ে । কোহেলিয়া নদী হারিয়ে যাওয়া মানে মহেশখালীর প্রায় লক্ষাধিক মানুষের জীবন জীবিকা ধ্বংস হয়ে যাওয়া । নদীতে জেগে ওঠা চর গুলো একের পর এক খন্ড খন্ড ভাবে দখল করে নিচ্ছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ভূমি দস্যুরা । তারা প্রথমে ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের তৈরি করে। তার পর নদীর চর অবৈধ ভাবে দখল করে নেয়। ফলে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে কোহেলিয়া নদী । এভাবে একের পর এক ভূমিদস্যুরা নদীর চর দখলে নিলেও এ নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের । অন্যদিকে মাতারবাড়ী ব্রীজের উত্তর পাশে ব্রীজ লাগোয়া নদী থেকে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে গর্ত করে বালি বিক্রি করছে এক শ্রেণির স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু মানুষ। এতে মাতারবাড়ীর একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম এ ব্রীজটি হুমকির মূখে রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা কক্সবাজার জেলা সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী জানান, আমরা কোহেলিয়া নদী পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। দেখে অবাক হয়েছি। এমন একটি জীবন্ত সত্তা নদী ভরাট করে কিভাবে সড়ক তৈরি করতে পারে? আমাদের বুঝতে বাকি নেই নদী ভরাট করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবেনা বিধায় তারা এই পথ বেঁচে নিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল জানান , যে কোন কারনে কোহেলীয়া নদী মারা গেলে এখানকার শত শত জেলে এবং লবণ চাষী ও ব্যবসায়ীর জীবন হুমকির মুখে পড়বে । কাজেই প্রকৃতি এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরো বলেন , কোহেলীয়া নদীর আশেপাশে চলমান অপরিকল্পিত ভরাট ও দখল প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা সহ যতাযত ভাবে কোহেলীয়া নদীর সীমানা নির্ধারণ করে তা উদ্ধার করা উচিৎ ।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এর সদস্য শারমিন মুর্শেদ জানান, কোহেলিয়া নদীর সাথে অন্যায় করা হচ্ছে।নদী জীবন্ত,তার প্রবাহ পথে কেউ বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে না।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নদী রক্ষার জন্য নদী রক্ষা কমিশন,নদী উদ্ধার-বাজেট ঘোষণা করেছেন।মানুষের জীবনকে হুমকিতে ফেলে তিনি কখনো উন্নয়ন করবে না।সরকার জনগণের ভাল চায়। মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের নাম দিয়ে কিছু অসাধু কোহেলিয়া নদী ভরাট করে সড়ক নির্মাণ করছে। যার কারনে নদী ছোট হয়ে গেছে আর তাতে মাছ নেই। মানুষ কর্ম-জীবিকাহীন হচ্ছে।নদী-মাছ ধ্বংস হচ্ছে। কোহেলিয়ার তীরে যুগ যুগ ধরে বসবাস করা মানুষের সভ্যতা বিলীন হওয়ার পথে।পৃথিবীর কোন দেশ এভাবে নদী দখল করে উন্নয়ন হচ্ছে না।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ড় তানজির সাইফ আহমেদ জানান কোহেলিয়া নদীটি খনন করা হলেও আবারো পলিমাটি এসে ভরে যাবে। যার কারণে আমরা এটি খননের উদ্যোগ আপাতত গ্রহণ করি নাই।

 

 

 

 

 

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.