ছিঁচকাঁদুনে বনাম মেয়েরা
মাহবুবা সুলতানা শিউলি
সবসময় লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, মেয়েরা কোন কারণ ছাড়াই কাঁদে অর্থাৎ ছিঁচকাঁদুনে। আজ প্রসঙ্গটা নিয়ে লেখার পিছনে ছোট্ট একটা কারণ আছে।
দিন দু’এক আগে সদ্য প্রয়াত দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার ব্যুরো চিফ শ্রদ্ধেয় হেলাল হুমায়ুন ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে কথা বলছিলাম (তিনি ৩০ অক্টোবর’১৬ রবিবারে মারা যান)।
একই এপার্টমেন্টে থাকার সুবাদে আমাদের প্রায় দেখা সাক্ষাত হয়। বহু গুণের ও বর্ণীল জীবনের অধিকারী হেলাল হুমায়ুন ভাইয়ের কথা বলতে বলতে ভাবী বারবার কেঁদেছেন। বললেন, আমাদের সন্তানদের ওনি এমন শিক্ষা দিয়েছেন, যেন সন্তানরা কোন দিন মিথ্যা অহংকারের কারণে নষ্ট না হয়ে যায়।
হেলাল হুমায়ুন ভাইয়ের চার জায়গায় জানাযা পড়া হয়েছিল। তাঁর গ্রামের বাড়ীর জানাযাতে ২০ হাজারের ওপরে মানুষ হয়েছিল। সকল জানাযা শেষ করে তাঁর সন্তানেরা ঘরে ফিরে মাকে বলেছে- মা, মাগো আমাদের বাবা যে এতবড় মানুষ ছিলেন।
তাঁর জানাযায় হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে, কত মানুষ তাঁর সুনাম করেছেন তা বলে কয়ে শেষ করা যাবেনা মা। আমাদের বাবা শুধুই ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠান।
অথচ বাবা আমাদের কোনদিনও বুঝতে দেননি তিনি কত বড় সম্মানী ব্যক্তি ছিলেন। মিথ্যে অহংকারের গরিমায় আমাদের পথ যেন বিচ্যুত না হয়”।
ভাবীর কথা শোনে আমিও অশ্রুসিক্ত হয়েছি। আর মনেমনে ভাবলাম, আপন জুয়েলার্স এর মালিক মি. দিলদার আহমেদ এর পুত্র সাফাতের চরম নষ্টামির পিছনে ওর বাবার কুমন্ত্রণাই দায়ী।
যাই হোক প্রসঙ্গে ফিরে আসি, আমরা মেয়েরা কেন এত ছিঁচকাঁদুনে?
যে মেয়ে ছোটকাল থেকে বাবা-মায়ের আদরের দুলালী হয়ে বেড়ে ওঠে অথচ সে-ই মেয়েকেই একসাগর জল বিসর্জন দিয়ে চিরচেনা আপনজনদের রেখে নতুন করে আরো অনেকের সাথে হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। এত মনোবল কোথা থেকে আসে? এত শক্তি কোথায় পায়? কিভাবে সম্ভব এটা?
নতুন সংসারে কতভাবে, কত কৌশলে সবাইকে আপন করে নিতে হয়, সবার আপন হতে হয়! সময়ের সাথে মা হবার প্রস্তুতি। সন্তান কনসিভ করার প্রথমদিন থেকে শুরু করে প্রতিটিদিন যেন এক একটা কঠিনসময়।
সেই কঠিনসময় শেষ করে কোলজুড়ে সন্তান আসে।(একজন মানুষ ৪৫ ইউনিট ব্যথা একবারে সহ্য করতে পারে, কিন্তু একজন মা যখন একটি শিশুকে জন্ম দেন তখন তিনি ৫৭+ ইউনিট ব্যথা সহ্য করেন! এ ব্যথা শরীরের ২০ টা হাড় একসাথে ভেঙ্গে যাওয়ার ব্যথার থেকেও বেশী!
কতটা কষ্ট করে মেয়েটি তার সন্তানকে জন্ম দেয়! এত শক্তি কোথায় পায়? কোথা থেকে আসে? অথচ দেখুন, সন্তানটি একটু হোঁচট খেলেও মেয়েটি কান্না করে। বাচ্চাটি কিছু খেতে চাচ্ছেনা, বাচ্চাটিকে খাওয়ানোর জন্য কত কসরত করতে হয়, কোনমতে বাচ্চা খাওয়া শেষ করলে খুশীতে মেয়েটি আবারও কেঁদে ওঠে।
যে মেয়ে সন্তান ধারণ করা থেকে শুরু করে জন্মদেবার মত এত কঠিন সময়ের মধ্যে যায় সেই-ই আবার বাচ্চা খায়নি বলে কাঁদবে বা খেয়েছে বলেও আনন্দে কাঁদবে!
এরকম আরো লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি উদাহরণ আছে যা লিখে শেষ করা যাবেনা।
এখন প্রশ্ন হলো– মেয়েরা কেন ছিঁচকাঁদুনে?
আমার দাদীমা, আমার নানীমা, আমার মা, আমার শাশুড়ি মা, আমার বোন, ফুফু -খালা সবাই ছিঁচকাঁদুনে। আমি আরও বেশী ছিঁচকাঁদুনে। আমার পতিবর মাঝেমাঝে দুষ্টুমি করে বলে,”আমার ছিঁচকাঁদুনে লক্ষ্মী বউ”। তখনও কেঁদে ফেলি। কি অদ্ভুত ব্যাপার!!
সবার কথা বাদই দিলাম। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ম্যাডামও তো কম ছিঁচকাঁদুনে না! তিনি তাঁর বাবা-মাসহ সকল রক্ত সম্পর্কীয়দের একদিনে হারিয়েছেন। আজ তিনি যে অবস্থানে আছেন নতুন করে আর তাঁর পাওয়ার বা হারানোর কিছু নেই।
কিন্তু প্রশ্নটি হচ্ছে, এ মানুষটি কিভাবে ঐ পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন? কি সেই অমিত শক্তি!!
এখন মনে হচ্ছে উত্তরটি পেয়েছি। যে অমিত শক্তির বলে মেয়েরা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে পারে, নিজেকে ভাঙ্গতে পারে, গড়তে পারে, যেকোন পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে পারে, সেই অমিত শক্তিটি হচ্ছে দু’চোখের জল।
মেয়েরা কথায় কথায় কাঁদতে পারে বলেই সবকিছু পারে। চোখের জলের সাথে সব মেয়ের দুঃখ-কষ্ট গুলি ধুয়ে মুছে যায়। নিজেকে আবার নতুনকরে আবিষ্কারের পথ দেখায়।
__________
প্রবন্ধ ও কলাম লেখক:
মাহবুবা সুলতানা শিউলি, মেম্বার বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.