সেন্টমার্টিনের ভাঙা জেটি আর কত বছর?

নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রতি বছর দেশ-বিদেশের লাখ লাখ পর্যটক ছুটে যান দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে। কিন্তু মৌসুম শুরুর আগেই জাহাজ ভেড়ার একমাত্র জেটি ভেঙে পরিণত হয়েছে মরণ ফাঁদে। অথচ প্রতিবছর অক্টোবর থেকেই পর্যটকদের আগমন ঘটে। হাজার হাজার পর্যটকের পদভারে মুখরিত হয় এই জেটি ঘাট। তবে এখন পর্যন্ত ভাঙা জেটি সংস্কারের কাজ শুরু না করায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখছেন স্থানীয়রা। সেই সঙ্গে ভ্রমণপিপাসুদের আগমনে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি লোকসানের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে জেটির পার্কিং পয়েন্ট সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও দু’টি গাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন থেকেই জেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসসহ প্রতিনিয়ত জোয়ারের পানির উত্তাল ঢেউ একের পর একে জেটিতে আঘাত করতে থাকে। ফলে জেটির পন্টুনে ছোট-বড় ফাটল দেখা গিয়েছে। নষ্ট হয়েছে জেটির অধিকাংশ অংশ, রেলিং ও সিঁড়ি নষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকে সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়নি জেলা পরিষদ।

স্থানীয়রা বলছে, জাহাজ কিংবা ট্রলার পর্যটক নিয়ে ভেড়া এই জেটিটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকলেও সংস্কারের উদ্যোগ নেই। ফলে যেকোন মুহুর্তে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। কয়েক বছর ধরে সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রবাল দ্বীপটির জেটির অনেকাংশ ভেঙে পড়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে পল্টুন। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে জেটিটি আরেক দফা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে জেটিটি কারণে অনেকটা চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ‘বর্তমানে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় জেটিটি ‘মরণ ফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। যেকোনো সময় দুর্ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত জেটিটির সংস্কার প্রয়োজন।’

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত জেটিটি সংস্কার না করায় চলাচলে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। এটি দ্রুত সংস্কারের জন্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু এখনও কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে জেটির পার্কিং পয়েন্ট সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও দু’টি গাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন থেকেই জেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। প্রতিবছর জেলা পরিষদ এই জেটি ইজারা দিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করলেও কোনো ধরনের মেরামতকাজে হাত দেয়নি।’ চেয়ারম্যানের অভিযোগ, জেলা পরিষদ প্রতি বছর নিজস্ব বাজেট থেকে জেটি সংস্কার না করে জাহাজ মালিকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে লোক দেখানো কাজ করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পারভেজ চৌধুরী বলেন, ‘জেটিটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাতে একদম ভেঙে গেছে। সম্প্রতি আমি নিজেও জেটিটি পরিদর্শন করেছি। এটি মেরামত করার জন্য আমাদের একটা প্রজেক্টও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি জেটির কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য জাহাজ মালিক ও কর্ণফুলী শিপইয়ার্ড সহযোগিতা করতে রাজি আছেন। আমরাও চাচ্ছি দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ করতে।’

কক্সবাজার জেলা পরিষদ প্রধান নির্বাহী হিল্লোল বিশ্বাস বলেন, ‘জেটিটি ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণে রাজস্ব আদায় করা হয়। তবে জেটিটি অনেক আগেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে। এটি মেরামতের জন্য ১ কোটি ৮২ লাখ টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যাবো। এরপর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মেরামতের কাজ শুরু হবে।’

এদিকে দ্বীপকে ঘিরে যেসব ব্যবসায়ী দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগ করেছেন তাদের দিন কাটছে শঙ্কায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটক পারাপারে ৮-১০টি জাহাজ, ২শ’-৩শ’ বাস-মিনিবাস, শতাধিক মাইক্রোবাস, ২শ’ ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান, ৪শ’ ট্যুরিস্ট গাইড এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা সেন্টমার্টিনকে ঘিরে পরিচালিত হয়। ভাঙ্গা জেটির কারণে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেই মুখ থুবড়ে পড়বে পর্যটন ব্যবসা। এতে ঝুঁকিতে পড়বে অন্তত ৩০ হাজার লোকের জীবন-জীবিকা ও কর্মসংস্থান। দ্রুত সময়ের মধ্যে জেটির মেরামত সম্ভব না হলে পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে সরকার।

সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলরত জাহাজ ‘কর্ণফুলী এক্সপ্রেস’র এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি পেলেই জাহাজ চলবে। তাই আমরাও জাহাজ চলাচলের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছি। আশা করছি আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজ চলবে।’

নীল দিগন্ত রিসোর্টের মালিক জহিরুল হক বলেন, ‘চলতি মাসেই পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের জেটিতে জাহাজ ভেড়ার কথা রয়েছে। আমরাও সেই অনুযায়ী পর্যটকদের আতিথেয়তার বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’

দ্বীপের হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আগামী মাসের শুরুর দিকে দ্বীপে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে। এর আগেই জেটিটি সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা না হলে হুমকির মুখে পড়বে পর্যটন ব্যবসা। এছাড়াও জেটিটি এভাবে পড়ে থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

উল্লেখ্য, সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ যা মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণে এবং কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে ১৭ বর্গ কিলোমিটারের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ। স্থানীয় ভাষায় সেন্টমার্টিনকে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ বলেও ডাকা হয়। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এ দ্বীপটি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন স্থান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। নীল আকাশের সঙ্গে সমুদ্রের নীল জলের মিতালী, সারি সারি নারিকেল গাছ এ দ্বীপকে করেছে অনন্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পর্যটন মৌসুমে মাসে দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখেরও বেশি পর্যটক ভিড় জমান সেন্টমার্টিনে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.