ডেস্ক নিউজ
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে শুক্রবার (২ জুলাই) সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে। এ নিয়ে ( ২০২০ সালের মে থেকে ২০২১ সালের ২ জুলাই সকাল ৮ টা পর্যন্ত) করোনা ইউনিটে এক হাজার ১১৭ জন মারা গেলেন। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৬৩ জন। বাকিরা করোনা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার (২ জুলাই) সকাল ৮টার মধ্যে মারা যাওয়াদের মধ্যে ১২ জন করোনা আক্রান্ত ছিলেন। বাকি পাঁচজন মারা যান উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। মারা যাওয়াদের ১০ জনই রাজশাহীর। বাকিদের মধ্যে চাঁপাইনবাগঞ্জের তিন জন, নাটোরের দুই, নওগাঁ ও পাবনার একজন করে রোগী রয়েছেন। এদের মধ্যে আইসিইউতে মারা যান তিন জন। পজিটিভ ১২ জনের মধ্যে রাজশাহীর সাত জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুই, নাটোরের দুই ও পাবনার একজন রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, এ নিয়ে চলতি (জুলাই) মাসের দুই দিনের মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৯ জন। এদের মধ্যে করোনা পজিটিভ ছিলেন ১৭ জন। এর আগে গত জুন মাসে এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা যান ৪০৫ জন। এদের মধ্যে করোনা পজিটিভ ছিলেন ১৮৯ জনের।
হাসপাতালের পরিচালক আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৬ জন। একই সময় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫৫ জন। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ৪০৫ বেডের বিপরীতে চিকিৎসাধীন আছেন ৪৬৮ জন। আইউসিইউতে চিকিৎসাধীন ১৮ জন।
রামেক হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০২০ সালের মার্চ মাসে হাসপাতালে কোনও করোনা রোগী ছিল না। পরের মাস এপ্রিলে হাসপাতালে ভর্তি হন ২৫ জন। ছাড়পত্র পান ২৩ জন। একই বছরের মে মাসে ১৯৭ জন ভর্তি হয়, হাসপাতালে ছাড়পত্র পান ১৮২ জন। এই মাসে করোনার উপসর্গ নিয়ে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়। জুন মাসে ৫২৪ জন ভর্তি হলেও ৪১৪ জন ছাড়পত্র পান। এই মাসে করোনার উপসর্গ নিয়ে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়। জুলাই মাসে ৭৭৫ ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬৭৫ জন। এই মাসে বছরটিতে সর্বোচ্চ করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয় রামেক হাসপাতালে। হাসপাতালটিতে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১১ জনের।
এছাড়া আগস্ট মাসে ৭৫৪ জন ভর্তি হলেও চিকিৎসা শেষে ৬৭১ ছাড়পত্র পেয়েছেন। এই মাসে করোনার উপসর্গ নিয়ে ৯৭ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে পজিটিভ হয়ে মারা যান ২৬ জন। সেপ্টেম্বর মাসে ৪০৩ ভর্তি হয়ে ছাড়পত্র পান ৩৭৪ জন করোনা রোগী। করোনার উপসর্গ নিয়ে ৫০ জনের মৃত্যু ছাড়াও পজিটিভ ছিলেন ১৩ জন। অক্টোবর মাসে ২৮৮ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে ছাড়া পেয়েছেন ২৯৪ জন। এই মাসে করোনা পজিটিভ হয়ে ৬ জনসহ উপসর্গ নিয়ে ২৮ জনের মৃত্যু হয়।
নভেম্বরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২৭০ জন ভর্তি হয়ে ২২৭ জন ছাড়পত্র পেলেও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩১ জনের। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের। একই বছরের ডিসেম্বরে ৩০০ জন ভর্তি হয়। ছাড়পাত্র পান ২৭০ জন। এসময় উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৩৪ জনের। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ হয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন ১১ জন নারী ও পুরুষ। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে কমে যায় করোনা আক্রান্ত রোগী সংখ্যা। এই মাসে ২৩১ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে ২১১ জন বাড়ি ফিরেছেন। এই মাসে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয় ২৯ জনের। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ ছিলেন চার জন। ফেব্রুয়ারি মাসে ২০১ জন করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ১৯৩ জন রোগী। উপসর্গে নিয়ে ১৭ জনের মৃত্যু হলেও এই মাসে মাত্র একজন করোনা পজিটিভ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
এছাড়া মার্চ মাসে ভর্তি হন ৩৩৪ জন করোনা রোগী। তাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৭২ জন। এই মাসে তিন জন করোনা পজিটিভ হয়ে মারা গেলেও উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৩১ জনের। এপ্রিল মাসে ৬৫৪ জন ভর্তি হয়েছিল। পুরোমাসে চিকিৎসা সেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ৫২০ জন। এই মাসে উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৭৯ জনের। আর পজিটিভ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের। মে মাসে ৮০৮ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৬১৭ জন। উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ২২৮ জনের। এছাড়া করোনা পজিটিভ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫৩ জনের। সর্বশেষ জুন মাসে এক হাজার ৩৯৭ জন করোনা আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৯৮৫ জন। এই মাসে করোনার উপসর্গে মারা গেছেন ৪০৫ জন রোগী। আর শুধু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৮৯ জনের নারী ও পুরুষের। যা মৃত্যুর দিক থেকে সর্বোচ্চ।
এদিকে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ৯৯ ভাগই করোনাবাইরাসে আক্রান্ত। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর করোনায় আক্রান্ত নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের কোভিড ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এর পর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠায়। নমুনা পরীক্ষার আগে যারা মারা যায় তাদের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার তালিকায় রাখা হয়।
তিনি আরও বলেন, উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া দুই-একটার নমুনা নেগেটিভ আসে। তারা আক্রান্ত হওয়ার ১০ থেকে ১২ দিন পর হাসপাতালে এসেছে। এরই মধ্যে তারা করোনামুক্ত হয়েছেন। তবে করোনায় যে ক্ষতি হয়, এতে তারা মারা যান।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. কাউয়ুম তালুকদার বলেন, হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন আমাদের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। সে প্রতিবেদন অনুযায়ী যারা করোনা শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন, তাদের তালিকা বিভাগীয় কার্যালয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদফতরে পাঠানো হয়। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার বিষয়ে কোনও তথ্য পাঠানো হয় না। তবে মারা যাওয়ার পর কারও নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ আসে এবং সেটি যদি আমাদের নজরে আসে তার নাম করোনায় মৃতের তালিকায় যুক্ত করা হয়। কিন্তু এ ধরনের কোনও নাম এখনও পাননি বলে জানান এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
হাসপাতালের পরিচালকের দফতরের কর্মকর্তা সাখাওয়াত সুমনের পাঠানো প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত বছরের মার্চ মাসে এ হাসপাতালে করোনা ইউনিট খোলা হয়। তবে রোগী ভর্তি শুরু হয় এপ্রিল থেকে। প্রথম রোগী মারা যান মে মাসে।
এদিকে রাজশাহীতে করোনা সংক্রমণ বেড়েছে। বৃহস্পতিবার দুই ল্যাবে রাজশাহী জেলার ৪৬৭ নমুনা পরীক্ষা করে ১৯৮ জনের শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। যা আগের দিনের চেয়ে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়ে করোনা শনাক্তের হার ৪২ দশমিক ৪০ শতাংশ। যা আগের দিন বুধবার ছিল ৩৯ দশমিক ৯০ শতাংশ।
এর আগে মঙ্গলবার ৩২ দশমিক ০৬ শতাংশ, গত সোমবার ৩৬ দশমিক ৯২ শতাংশ, রবিবার ২৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ, শনিবার ২৯ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং শুক্রবার ৩৪ দশমিক ৫০ শতাংশ ছিল করোনা শনাক্তের হার।
শামীম ইয়াজদানী জানান, বৃহস্পতিবার রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল পৃথক দুটি ল্যাবে তিন জেলার ৫৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ এসেছে ২২১ জনের। রাজশাহী জেলা ছাড়াও অপর দুই জেলার মধ্যে চাঁপাইনবাগঞ্জের ৮৫ জনের নমুনার মধ্যে ২৩টি পজিটিভ এসেছে। আর নওগাঁর একজনের নমুনার পরীক্ষ করে সেটি নেগেটিভ আসে।
উল্লেখ্য, ঈদের পর থেকে রাজশাহীতে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকে। শনাক্তের হার ৬০ শতাংশের উপরে উঠলে গত ১১ জুন সিটি করপোরেশন এলাকায় এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করে প্রশাসন। পরে সেটি দুই দফা বাড়িয়ে ৩০ জুন মধ্য রাত পর্যন্ত করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার থেকে নতুন করে সরকারি ঘোষিত সাতদিনের কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.