ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ মিলগেট থেকে রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিকেজি চালের দামের পার্থক্য ১২-১৬ টাকা। খুচরা পর্যায়ে একই চালের একেক দোকানে একেক রকমের দাম। সর্বোচ্চ মূল্য ঘোষণা ও উৎপাদন তারিখ না থাকায় যে যার মতো করে দাম নিচ্ছে। আর এর দায় দিচ্ছে একে অপরের ওপর। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রতুল বলছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহ।
মিল মালিক,পাইকারি বাজার ও আড়ত ঘুরে প্রতিটি স্তরে চালের দাম জানার চেষ্টা করে। দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি রাইস মিলারের কাছে জানতে চাওয়া হয় কেজিপ্রতি চালের উৎপাদন খরচ কত? তারা জানিয়েছেন, বর্তমান ধানের বাজারদর অনুযায়ী প্রতিকেজি ভালো মানের মিনিকেট চালের উৎপাদন খরচ ৪২-৪৩ টাকা। তবে ব্রান্ডের চাল কোম্পানিগুলোর এটা সর্বোচ্চ ৪৪ টাকা। মাঝারি মানের চালের উৎপাদন খরচ ৩৮-৩৯ টাকা। রাজধানীতে পৌঁছাতে কেজিতে ২ টাকা পরিবহন ভাড়া যোগ করতে হবে।
বাবু বাজারের আড়তদাররা জানান, তারা প্রতি কেজি ভালো মানের মিনিকেট চাল বিক্রি করছেন ৪৭-৪৯ টাকা দরে। এই চাল কারওয়ান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৫৭ টাকা ও অন্যান্য খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫৮-৬০ টাকা দরে। চাল ব্যবসায়ীর হিসাব অনুযায়ী মিলাররা চাইলে কেজিতে ১ টাকা লাভ করলে রাজধানীর আড়তগুলোতে কেজিপ্রতি ৪৬-৪৭ টাকা দরে চাল সরবরাহ করতে পারে। আর আড়তদাররা তা সর্বোচ্চ ৪৮ টাকা দাম নিতে পারে। এতে আড়তদারদের সর্বনিম্ন ৫০ পয়সা কেজিপ্রতি লাভ থাকবে। আর খুচরা বিক্রেতারা ৫২-৫৪ টাকায় বিক্রি করলেও কেজিতে তাদের লাভ থাকবে কমপক্ষে ৩ টাকা।
উৎপাদন খরচ-খুচরায় দামের এত পার্থক্য কেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ রাইস মিল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, ‘আমরা কেজিপ্রতি চালে ৫০ পয়সা লাভ করি। যাদের খরচ একটু বেশি তারা হয়তো ১ টাকা লাভ করে। সবাই আমাদের দোষ দেয়। আপনারা ও সরকার চালের বাজারের প্রতিটি স্তরের চোতা (ভাউচার) পরীক্ষা করেন। তাহলেই দেখবেন ভূত কোথায়।’
কেজিপ্রতি চালের যৌক্তিক সর্বোচ্চ মূল্য কত হওয়া উচিত তা নির্ধারণ করে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর (ডিএএম)। প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানটি বাজার মূল্য ও যৌক্তিক মূল্য হালনাগাদ করে। ডিএএম বলছে, গতকাল সোমবারের বাজারমূল্য অনুযায়ী এক কেজি মিনিকেট চালের দাম কোনোভাবেই ৫৫ টাকার বেশি হওয়া উচিত না। এ আইন না মানলে রয়েছে শাস্তির বিধান।
এই প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য অনুযায়ী ৫৬ টাকা কেজি দরে মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে। আর সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, কেজিপ্রতি নাজির ও মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৫২-৬২ টাকা দরে। আর মিল পর্যায়ে যদি এক টাকা বাড়ে তবে তা খুচরায় গিয়ে ৩-৪ টাকায় ঠেকে। দেশের শীর্ষস্থানীয় চাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রশিদ অটোর’ মহাব্যবস্থাপক আবুল খায়ের ভূঁইয়া হারুন বলেন, ‘আমরা ভালো মানের মিনিকেট চাল বিক্রি করছি ৪৮ টাকা দরে। বাজারে ধানের দাম কছুটা বেশি। এজন্য একটু বেশি দাম পড়ছে। তবে দুই সপ্তাহ আগে আমরা চালের দাম বস্তায় ৫০ টাকা কমিয়েছি।’ মাঝারি মানের চাল কেজিপ্রতি ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন তারা।
চালের সবচেয়ে বড় পাইকারি আড়ত বাবুবাজারে গত রবিবার প্রতিকেজি ভালো মানের মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫০ টাকা দরে। মাঝারি মানেরটা ৪৬-৪৭ টাকা ও মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৩৬-৩৮ টাকা দরে। রাজধানীর সবয়েচে বড় পাইকারি বাজার কারওয়ানবাজারে প্রতিকেজি ভালোমানের মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৫৬-৫৭ টাকা, মাঝারি মানের চাল ৫৩-৫৪ টাকা।
প্রতিদিন ডিএএম বাজার মূল্য হালনাগাদ করে। যৌক্তিক মূল্যও নির্ধারণ করে। ওই প্রতিষ্ঠানেরই হিসাব বলছে, গতকাল সোমবার প্রতিকেজি চিকন চাল বিক্রি হয়েছে ৫১-৫৬ টাকা। বাস্তবে এর দাম আরও বেশি। কিন্তু কেন বিক্রেতা কেজিতে ১ টাকা বেশি নিয়েছে তা আর খতিয়ে দেখা হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাঝেমধ্যে ভোক্তা অধিকার, র্যাব ও সিটি করপোরেশনের দুএকটি অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে চালের দামের বাস্তবায়ন।
এমন অস্বাভাবিক দামের পার্থক্যের দায় নিতে চায় না কেউ। মিলাররা বলছেন আড়ত ও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়, আড়তদাররা বলছেন মিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এজন্য দায়ী আবার খুচরা ব্যবসায়ীরা দোষ চাপাচ্ছেন আড়তদার ও মিলারদের। সরকার বলছে, সব স্তরেই সমস্যা। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল সংকট, চালের বাজার নিয়ন্ত্রকদের প্রভাব ও নাগরিক সচেতনতার জন্য দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তবে তারা নিয়মিত চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএএমের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যখন ফেব্রুয়ারিতে মিলার ও আড়তদারদের সমন্বয়ে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে চালের দামের বিষয়ে কথা বলি তখন চাল কল মালিকরা যেভাবে কথা বলছে তা রীতিমতো অবাক করার মতো বিষয়। তারা সচিবদেরও মানতে চায় না। মন্ত্রীদেরও সেভাবে কেয়ার করে না। একজন চালকল মালিক তো হুমকি দিয়েই বলে দিল যে, ‘আমাদের লাখ লাখ বস্তা চাল গুদামে পড়ে আছে। দাম নিয়ে বেশি চাপাচাপি করলে চাল কিনব না।’ অথচ তার কয়েক দিন পরেই সেই একই মালিক সরবরাহ সংকট দেখিয়ে চালের দাম বাড়িয়ে দিলেন। এমন পরিস্থিতিতে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। তবে সব মন্ত্রণালয় মিলে একত্রে চেষ্টা করলে কিছুটা হয়তো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।’
বাংলাদেশ রাইস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি কাওসার আলম খান বলেন, ‘আসলে আমাদের দেশে চালের কোনো বাজার নেই। যে যেমন পারে, সে তেমন বিক্রি করছে। অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক এখানে কাজ করছে। নইলে আমাদের থেকে খুচরা পর্যায়ে কেজিতে দামের পার্থক্য ১০-১২ টাকা হয় কীভাবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘চালের দামের এই অস্বাভাবিক পার্থক্যের পেছনে ভোক্তা ও প্রশাসনেরও গাফিলতি আছে। ভোক্তা স্থানীয় বাজার থেকে চাল কেনার সময় তেমন দরদাম করে না। আর প্রশাসনও তেমন নজরদারি করতে পারে না। যার ফলে খুচরায় যে যেমন পারছে বিক্রি করছে। আপনি (এই প্রতিবেদক) দেখবেন, একই বাজারে একই মানের চাল ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানম বলেন, ‘স্থানভেদে চালের দামের অস্বাভাবিক পার্থক্য। দেশে সব পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারিত আছে। কিন্তু কৃষিপণ্যের নেই। মুশকিল হলো চালের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষমতা কেবল কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের। তারপরও আমরা জেলাপ্রশাসক ও ভোক্তা অধিদপ্তরকে বলেছি যাতে কেউ চাল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে।’ চালের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
ডিএএমের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘চালের দাম এত বেশি হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কৃষি বিপণন আইনকে আরও কীভাবে জোরদার করা যায় সে বিষয়ে কাজ করছি। নতুন আইনের বিধি প্রণয়ন হলে চালের বাজারের অস্থিরতা কিছুটা দূর করা যাবে।’

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.