রোহিঙ্গা সংকটের চূড়ান্ত সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে

সম্মিলিত এডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে পদক্ষেপ গ্রহণের উপর মানবিক নেটওয়ার্কগুলোর গুরুত্বারোপ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার
কোস্ট ফাউন্ডেশন, কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ), এনজিও প্ল্যাটফর্ম কক্সবাজার (এনজিওপি) এবং রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক যৌথভাবে একটি অধিবেশনের আয়োজন করে। ১২ ডিসেম্বরের অধিবেশনটি ব্যাংককে “রোহিঙ্গা পরিস্থিতির উপর আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া শক্তিশালীকরণ” শিরোনামে চলমান “আঞ্চলিক মানবিক অংশীদারিত্ব সপ্তাহ (আরএইচপিডব্লিউ) ২০২৩” এর মধ্যে আয়োজন করা হয়েছে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থার প্রায় ৭০ জন অংশগ্রহণকারী উক্ত সেশনে  অংশগ্রহণ করেন।
সেশনটি সঞ্চালনা করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী।
সেশনের মূল প্রবন্ধ এবং কোস্ট কর্তৃক সম্প্রতি পরিচালিত একটি সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করেন যুগ্ম পরিচালক (এমইএএল অ্যান্ড রিসার্চ) মোঃ ইকবাল উদ্দিন।
তিনি উপস্থাপনায় রোহিঙ্গা কমিউনিটি ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা পাশাপাশি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে উপস্থিত অংশগ্রহণকারী  একত্রে কীভাবে একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কার্যকর পদ্ধতিতে চলমান রোহিঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়ে আলোকপাত করেন।
এতে প্যানেলে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইউরোপীয় রোহিঙ্গা কাউন্সিল থেকে ডঃ আম্বিয়া পারভিন, রোহিঙ্গা নারী উন্নয়ন নেটওয়ার্ক থেকে মিস শরিফাহ শাকিরাহ, ফরটিফাই রাইটস থেকে জন কুইনলি, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার (ওএইচসিএইচআর) অফিস থেকে জেমস রোডেহেভার ও এশিয়া ডিসপ্লেসমেন্ট অ্যান্ড সলিউশন প্ল্যাটফর্ম (এডিএসপি) থেকে পল লুক ভার্নন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় মোঃ ইকবাল উদ্দিন বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং কিন্তু ১৯৮২ সালের পর তাদেরই নাগরিকত্ব বাতিল ও প্রত্যাখ্যান ঘোষণা করা হয়।
অধিবেশনে বক্তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং শরণার্থী হিসেবে তাদের অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে একটি টেকসই সমাধানের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন। এই নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে একটি সম্মিলিত কণ্ঠস্বর, কার্যকর নেটওয়ার্কিং, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং জবাবদিহিতা জোরদার করার উপর তারা গুরুত্বারোপ করেন। মূল প্রবন্ধে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ও তাদের উপর এর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব, বিশ্বব্যাপী রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচী এবং সমগ্র অঞ্চলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।
আলোচকরা ত্রিপাক্ষিক আলোচনা এবং সম্মিলিতভাবে প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো মোকাবেলার উপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার জন্য একইসাথে অঞ্চল-ভিত্তিক শান্তি স্থাপন এবং উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রাখার লক্ষ্যে এডভোকেসি অব্যাহত রাখা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অর্জন এবং দাবী আদায়ের জন্য সরকার ও সকল ধরণের সংগঠনের মধ্যে অর্থায় বহুপাক্ষিক প্রতিশ্রুতি আদায় ও এর বাস্তবায়নের উপর জোর দেন।
বক্তারা আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট একটি আঞ্চলিক সমস্যা হলেও এর সমাধান মিয়ানমারেই রয়েছে। এবং এখনই সঠিক সময় তাদেরকে দাবি আদায়ের জন্য কি করণীয় ও নেতৃত্বের গুনাবলী ও এর প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর। আমাদেরকে একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত আঞ্চলিক প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করতে হবে এবং মিয়ানমার সরকারের উপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
রেজাউল করিম চৌধুরী সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি অব্যাহত সহযোগিতার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
ইউরোপীয় রোহিঙ্গা কাউন্সিলের (ইআরসি) চেয়ারম্যান এবং রোহিঙ্গা মেডিক্স অর্গানাইজেশনের (আরএমও) সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড. আম্বিয়া পারভিন অনলাইনে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষায় জোর দেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪ মিলিয়ন রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র ১% মানবাধিকার ভোগ করে, বাকি ৯৯% এর রাজনৈতিক বা মৌলিক কোন অধিকারই ভোগ করার স্বাধীনতা নেই। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান মিয়ানমার সরকারের মধ্যেই রয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা, যাতে তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে কার্যকর এডভোকেসি করতে পারে।
মালয়েশিয়ার প্রথম রোহিঙ্গা নারী ও নারী শরণার্থী নেতৃত্বাধীন সংস্থা রোহিঙ্গা উইমেন ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (আরডব্লিউডিএন) এর প্রতিষ্ঠাতা মিস শরিফাহ শাকিরাহ এই অনলাইন ইভেন্টে যোগ দেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের মধ্যে তাদের জীবিকা নির্বাহের অনুমতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
এডিএসপির পক্ষে পল লুক ভার্নন বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান) এর মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক নেটওয়ার্কগুলির ভূমিকা অস্পষ্ট।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের এখন উচিত প্রোগ্রামেটিক যে বিষয়গুলি আছে তার উপর জোর দেওয়া এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা। তিনি আরো যোগ বলেন, বর্তমান অবস্থায় এটা বোঝা যাচ্ছে যে, অঞ্চল-ভিত্তিক সহযোগিতা ও চলমান প্রক্রিয়াগুলি সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে।
ফরটিফাই রাইটস এর পক্ষে জন কুইনলি বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব প্রদানে ক্ষমতা রয়েছে এবং তারা জানে কীভাবে তাদের সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় এবং রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষায় তাদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত।
রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, আমরা চাই রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজি) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা গাম্বিয়ার মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হোক। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, আইসিজি এবং উন্নত রাষ্টগুলোর এই মূহুর্তে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে তাদের নির্বিচার গণহত্যা চালানোর জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা উচিত।
অন্যান্য বক্তারা বলেন, প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য সুযোগ প্রদান করা, তাদের চলাচলের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.