পাহাড় কেটে রেলপথ

মোঃ নেজাম উদ্দিন,কক্সবাজার।
কক্সবাজারের রামুতে নির্বিচারে পাহাড় কেটে রেল লাইনের কাজ করছে ম্যাক্স গ্রæপ নামের কনস্ট্রাকশন কোম্পানী । কয়েকদিন আগে প্রতিবেদক রশিদ নগর, জেটির রাস্তা, নুনাছড়ি, নন্দাখালীসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘুরে পাহাড় কাটার চিত্র দৃশ্যমান হয়েছে। অনুমোদনের বাইরে দুই কোটি ২০ লাখ ঘনফুট পাহাড় কাটার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক, ঠিকাদার, মাটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে ৫০লাখ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
নোনাছড়ি মসজিদের পাশে জাগের হোসন ও আবুল কাসেম এর বাড়ি ছিল পাহাড়ের ছুড়ায় তা এখন কেটে সমান কওে ফেলা হয়েছে। জাগের হোসন ও আবুল কাসেম প্রতি গাড়ি মাটির মুল্য পেয়েছে ১শত টাকা করে।
পাশর্^বর্তী মাহমুদুল হকের বাড়িও ছিল পাহাড়ের ছুড়ায় তা কেটে এখন সমান করে পেলা হয়েছে । স্থানীয় মাহমুদুল হকের স্ত্রী বলছে রেল লাইনের জন্য মাটি প্রয়োজন তাই ম্যাক্স গ্রæপের মাধ্যমে এই মাটি নিয়ে যাওয় হচ্ছে।
নোনাছড়ি একটি চায়ের দোকোনে বসলে আমরা সাংবাদিক পচিয় পেলে স্থানীরা ম্যাক্স কিভাবে পাহাড় কাটছে তা তুলে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। নন্দাখালীর স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রশিদ জানান, আমি পাহাড়ের চুড়ায় থাকি । পাহাড় না কেটে উপরে ঘর বেধে বিগত ৩০বছর ধরে বসবাস । স্থানীয় আবছার নামের একজন ম্যাক্স গ্রæপের নাম দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। ম্যাক্স কোম্পানী কাজ শুরু করার পর আমার বাড়ির পাহাড় কেটে ফেলেছে । তাতে আমি ঘরহীন হয়ে গেলাম।
এদিকে রামু উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ম্যাক্স গ্রুপে বেশ কিছু পাহাড় কেটে সাবাড় করে ফেলেছে।তাতে জোয়ারিয়ানালার আবছার নামের একজনের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়রা বলছে আবছার ম্যাক্স গ্রুপের হয়ে পাহাড় কেটে রেল লােইনের জন্য মাটি নিয়ে যায় প্রতিদিন।
এদিকে ম্যাক্স কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে রামুর দায়িত্বরত মোঃ ইকবাল বলছেন, তারা পরিবেশ আইন মেনে পাহাড় কাটছেন! রেল লাইনের জন্য যতটুকু কাটা দরকার ঠিক ততটুক পাহাড় কেটে সমান করে রেল লাইনের জন্য তৈরি করছে বলে তার দাবি।
নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে চট্টগ্রামের কক্সবাজার সদর ও রামু উপজেলার প্রকৃতি ও পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। আর্থিক জরিমানার বিধান দিয়ে কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে পাহাড় কর্তন।
একদিকে যেমন স্থানীয় পাহাড় খেকোরা পাহাড় কেটে সাবাড় করছে অন্যদিকে সরকারি প্রজেক্ট দেখিযে হরদম পাহাড় কাটছে ম্যাক্স গ্রæপ নামের এই কোম্পানী।
রশিদ নগর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড় আওয়ামীলীগ এর সভাপতি শহর আলী জানান, সরকার উন্নয়ন করতে বলেছে কিন্তু এইভাবে পাহাড় কাটতে বলেনি। ম্যাক্স গ্রæপ যেভাবে পাহাড় কাটা শুরু করেছে এবং যে ভাবে পাহাড় কেঠেছে তা কি তারা ফিরিয়ে দিতে পারবে? জেটি রাস্তার মাথা এলাকার স্থানীয় আমির হোসেন জানান, ম্যাক্স গ্রæপ রেল লাইন এর কাজ করছে । আমরা ষাধুবাধ জানাই। কিন্তু তারা নির্বিচারে যেভাবে পাহাড় কেটেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা । আমার মনে হয়না এঘুরো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানেন। মনে হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে এমন কাজে হাত দিয়েছে। আমরা স্থানীয়রা অনুরোধ করবো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেন কাজ চলাকালিন একবার হলেও প্রজেক্ট দেখে যান।
তিন হাজার ৬শ’ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা এনআরবি গেøাবাল ব্যাংকের তৎকালিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার এই ম্যাক্স গ্রæপের ডাইরেক্টরশীপে আছে বলে একটি সুত্র জানিয়েছে । তারা বলছে যদি গোয়েন্দা বিভাগ এটি সুক্ষভাবে তদন্ত করে তবে পিকে হাওলাদার ম্যাক্স গ্রæপের সাথে জড়িত আছে তা বেরিয়ে আসতে পারে।

এদিকে কক্সবাজারবাসীর স্বপ্ন রেল লাইন সড়ক। আর তাতে যাতায়াত হবে সুন্দর ও পর্যটনখাতেও বাড়বে ব্যবসা। সব মিলিয়ে আশায় বুক বেধে আছে কক্সবাজারবাসী। রেল লাইনের কাজ শুরু হয়েছে প্রায় দুই বছর হতে চলেছে। এখনো কাজের ৪০% কাজ হলেও বাকি কাজ ধীরগতিতে চলছে বলে এমন অভিযোগ তুলছে সাধারণ মানুষ । তাতে রেল লাইনের পাশে থাকা হাজারো মানুষের ভোগান্তি শেষ নেই।
চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত পর্যটন নগরী কক্সবাজারের ঘুমধুম পর্যন্ত ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১২৮ কিলোমিটার রেল লাইন প্রকল্পের কাজ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক সংযুক্তা দাশ গুপ্তা জানান, পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। রামুতে বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। যদি পাহাড় কাটার কোন তথ্য পাই আবারো অভিযান পরিচালনা করা হবে।
দীর্ঘদিন থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার অর্ধকোটি মানুষ স্বপ্ন দেখছিল এ রেললাইন নির্মাণের। সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলেও কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে যথাসময়ে রেললাইন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ তাদের। প্রায় দুই বছর আগে রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক ফজলুল কাদের চেীধুরী জানান, আমরা উন্নয়ন বিরোধী নই । আমরা পরিবেশের পক্ষে কথা বলি।যদি ম্যাক্স গ্রæপ পাহাড় কেটে থাকে তাদের বিরোদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহনের সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করছি।
ইয়ুর্থ ইনভাইরেন্টমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) এর প্রধান নির্বাহী এম ইব্রাহিম খলিল মামুন জানান, গত বছরের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্ট কক্সবাজারের সাতটি উপজেলার পাহাড়, টিলা, পাহাড়ি বন কাটা রোধে এবং সমুদ্রসৈকত রক্ষার বিষয়ে রুল দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে এই অপকর্ম থেমে থাকেনি। পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক নেতা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। পাহাড় কাট বন্ধে আমাদের সকলের এগিয়ে আসতে হব্
েপ্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। যার পুরোটাই এডিবির। প্রথম ধাপে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার সদর পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার রেল লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে কক্সবাজার থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার ১০০ কিলোমিটারে ট্রেন চলবে ঘন্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার যেতে সময় লাগবে ১ ঘন্টা ২০মিনিট। তবে এই প্রকল্পের বড় সমস্যা হলো চট্রগ্রাম থেকে দোহাজারী রেল লাইন। এই লাইনের অবস্থা খুবই শোচনীয়।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২৮ কিমি রেলপথে স্টেশন থাকছে ৯টি।
এগুলো হলো- সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগাঁও, রামু, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও ঘুমধুম।
বহুল প্রতীক্ষিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মানকাজ দ্রæত শেষ করার দাবী জানিয়েছেন জনসাধারণ।

 

 

 

 

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.