ঝাড়ুদার থেকে ডেন্টাল চিকিৎসক, গড়েছেন আলিশান বাড়ি!

বিশেষ প্রতিবেদক:
দৃশ্যমান কোন আয়ের উৎস নেই। পড়াশুনাও গড়েনি এসএসসি পর্যন্ত। কোনো দলের বড় পদেও নেই। তবুও তিনি নিজেকে একজন ডাক্তার বলে দাবী করেন। কক্সবাজার শহরের হাসপাতাল সড়কে দুইটি ডেন্টাল চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে তার। সেখানে কয়েকজন টেকনিশিয়ান থাকেন সবসময়। তবে কোনো ডাক্তার থাকে না।

কিন্তু ডাক্তারের নাম ব্যবহার করা হয়। ওই দুটি ডেন্টাল কেন্দ্রের মালিক দাবী করেন মো. গফুর। সেই সূত্র ধরে অনেকের কাছে তিনি ডাক্তার গফুর হিসেবে পরিচিত। তবে সবাই তাকে ভূয়া ডাক্তার হিসেবে চেনেন।

কক্সবাজার শহরের গরুরহালদা এলাকায় একটি বহুতল ভবনের মালিক গফুর। তিন বছরের ব্যবধানে ভবনটি তৈরি করেছেন তিনি। ভবনের ভিতরে আলিশান কারুকার্য্য। শৈল্পিকভাবে সাজানো হয়েছে। তার রুমের ২য় তলায় সব কিছু নামি-দামি জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। তার আয় বা চলাফেরা সবার চোখে পড়ার মতো। হুট করে বহুতল ভবনের মালিক হওয়া এবং চলাফেরা নিয়ে সবার মাঝে রয়েছে কৌতুহল।

খোদ সদ্য বিদায়ী কক্সবাজার সদর থানা পুলিশও তার বিষয়ে অনুসন্ধান করেছিল। বেশ কয়েকবার তার বাড়িতে অভিযানও চালিয়েছিল। কিন্তু তিনি কৌশলে পালিয়ে গিয়ে রক্ষা পান। মাদক বিরোধী অভিযানে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিল গফুর।

এই গফুরের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে সম্প্রতি একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের নিকট পৌঁছে। ওই রেকর্ডে গফুরের সাথে অপর এক ব্যক্তির কথা হয় ইয়াবা ট্যাবলেটের লেনদেন নিয়ে। গফুর সেখানে ইয়াবার দরদাম ঠিক করেন। দুইজনের মধ্যে বেশ দর কষাকষিও হয়। অডিও রেকর্ডে অনেক তথ্যও রয়েছে মাদক লেনদেন ও দরদাম নিয়ে।

গফুরের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, চার বছর আগেও গফুরের কিছুই ছিল না। তবে এদিক ওদিক বেশ দৌড় ছিল তার। আলিরজাহালস্থ গরুরহালদা এলাকায় একটি জমিতে ছোট্ট ঝুঁপড়ি ঘর ছিল তার। অনেক সময় সে নিজেকে ডাক্তার দাবী করত।

প্রায় ছয় বছর আগে কক্সবাজার হাসপাতাল সড়কস্থ একটি প্রাইভেট ডেন্টাল চিকিৎসা কেন্দ্রে ঝাড়ুদার হিসেবে চাকরি করত। কয়েক বছর ঝাড়ুদার হিসেবে ছিল ওই ডেন্টাল ক্লিনিকে। বিষয়টি হাসপাতাল সড়কের সব দোকানদারের জানা রয়েছে। ঝাড়ুদারের ফাঁকে দাঁতের কিছু কাজও শিখে নেন গফুর। এরইমধ্যে একটি ডেন্টাল কেয়ারের মালিক বনে যান। রাখেন কর্মচারিও।

ডেন্টাল চিকিৎসা কেন্দ্রের মালিক বনে যাওয়ার পরপরেই প্রাইভেট কার নিয়ে চলাফেরা শুরু হয় তার। লাল রঙের একটি প্রাইভেট কার নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেন তিনি। তবে ডেন্টাল কেন্দ্রে বেশি সময় দিতেন না। প্রায় সময় কক্সবাজারের বাইরে থাকতেন। এরইমধ্যে আরেকটি ডেন্টাল চিকিৎসা কেন্দ্র চালু করেন। হাসপাতাল সড়কে মোট দু’টি ডেন্টাল সেন্টার রয়েছে তার মালিকানাধীন। বর্তমান সময়ে তার আয়ের উৎস হিসেবে এই চিকিৎসা কেন্দ্র দেখান তিনি।

ডেন্টাল সেন্টারে ঝাড়ুদারের আগে তিনি বিভিন্ন জায়গায় দিনমজুরের কাজ করতেন। গ্যারেজেও চাকরি করেছিল বহু বছর। পৈত্রিক কোনো সম্পত্তি ছিল না এই গফুরের।

কিন্তু গত তিনবছরে তার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তিন বছর আগের ঝুঁপড়ি ঘর ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করেন। বর্তমানে ভবনটি চারতলা পর্যন্ত প্রস্তুত হয়েছে। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে আলিশান ভবনটি করেছেন তিনি। গত দেড় বছর আগে আলিরজাহালস্থ এসএম পাড়া এলাকায় কোটি টাকা খরচ করে জমিও ক্রয় করেন গফুর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চার বছর আগে থেকেই মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ে গফুর। প্রথমে ফেন্সিডিল ব্যবসায় যুক্ত ছিল। মাদকে তার একটি একটি সিন্ডিকেটও রয়েছে। যে সিন্ডিকেটে বেশ কয়েকজন মহিলাও রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য আটকও হয়েছিল। ফেন্সিডিলের সূত্র ধরে জড়িয়ে পড়ে ইয়াবা কারবারে। শহরের বেশ কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারির সাথে বেশ সখ্যতাও রয়েছে গফুরের। নিয়মিত তাদের দেন মাসোহারাও।

ইয়াবা কারবার করতে গিয়ে শহরের বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মিও রয়েছে এই গফুর। নিয়মিত ক্যাসিনোও চলে গফুর সিন্ডিকেটের। বেশ কয়েকটি হোটেলে তাদের ক্যাসিনো কারবার চলে বলে জানা গেছে। অল্প সময়ে মাদকের টাকায় ঝাড়ুদার গফুর আজ কোটিপতি। গত এক বছর আগে গফুরের মাদক কারবারের সংশ্লিষ্টতা পান কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ। পুলিশ তার বিষয়ে অবগতও হয়েছিল। হাতেনাতে মাদকসহ আটক করতে অনুসন্ধান করছিল পুলিশ। তবে সে কৌশলে পালিয়ে বেড়াতো।

সর্বশেষ গত দুই মাস আগে (টেকনাফে সিনহা হত্যার দুদিন আগে) তার বাড়িতে অভিযানে যান সদ্য বিদায়ী কক্সবাজার সদর থানার একদল পুলিশ সদস্য। কয়েকটি টিমে ভাগ করে তার বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। কিন্তু কৌশলে পালিয়ে যায় গফুর। এরপর থেকে কিছুদিন আত্মগোপনে ছিল গফুর। যখন মাদক বিরোধী অভিযান থমকে যায, তখন এলাকায় ফিরে আসে গফুর। গত একমাস ধরে এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরছে সে।

সদ্য বিদায়ী কক্সবাজারের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, গফুর একজন চিহ্নিত মাদক কারবারি। তার বিষয়ে অনেক কিছু তথ্য রয়েছে। সুযোগমতো না পাওয়ায় তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশের চেষ্টা ছিল। দিনের মতো পরিস্কার তার মাদক কারবার। চিহ্নিত মাদক কারবারিদের সাথে চলাফেরাও ছিল তার। তার ইতিহাস খুঁজলেই বের হয়ে আসবে মাদকের সংশ্লিষ্টতা।

গরুর হালদা এলাকার এক ব্যক্তি জানান, গফুরের নিজ বাড়ি হলো নুনিয়াছড়া ছয় নাম্বার এলাকায়। ওই এলাকার মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে গফুর। তবে বহু বছর ধরে গরুর হালদা এলাকায় বসবাস গফুরের। যেখানে বর্তমানে চারতলা ভবন তৈরি করেছে। যে ভবনের দুই তলায় গফুর নিজেই থাকেন। মসজিদের সাথে লাগোয়া গফুরের ভবনটি। এমনকি দুই তলা গফুরের রুম থেকে একটি গোপন জানালাও তৈরি করা হয়েছে। অভিযানের সময় গফুর কৌশলে ওই জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়। জানালা দিয়ে কৌশলে দরজা তৈরি করা হয়েছে। এলাকার সবাই জানে গফুর মাদকের সাথে জড়িত।

এবিষয়ে মুঠোফোনে গফুর বলেন, আমি মাদকের সাথে কোনোভাবে জড়িত নই। আমার ডেন্টালের দোকান রয়েছে। দোকানের আয় দিয়ে আমার সংসার চলে। ইয়াবা লেনদেন ও দরদামের অডিও নিয়ে আমি কিছুই জানি না। এসব ষড়যন্ত্র আমার বিরুদ্ধে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.