ডেস্ক নিউজ:
২০২০ সালের শুরুর দিকে বেশ আলোচনা-সমালোচনায় এসেছিল কক্সবাজার সিটি কলেজ ছাত্র মো. করিম বিন সামাদ ওরফে করিম। একই সাথে আলোচনায় ছিল তার বন্ধু শিহাব। বিশেষ করে কলেজে পড়ুয়া ছাত্রদের মাঝে তাদের নিয়ে আলোচনা ছিল অনেক বেশি। অল্প বসয়ী এই কলেজ ছাত্রদের বিষয়ে অবাক করা তথ্য দিয়ে তখন বিভিন্ন সংবাদপত্রে টানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ‘কোটিপতি স্টাইলে জীবনযাপন কক্সবাজারে কলেকছাত্রের’ শিরোনামে তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরপরেই আত্মগোপনে চলে যায় তারা। দীর্ঘ কয়েকমাস আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় টেকনাফে মেজর সিনহা হত্যার ঘটনা ঘটে। সিনহা হত্যাকান্ডের সুযোগে কক্সবাজারের জেলা পুলিশ একযোগে বদলি হয়। ওই বদলির সুযোগে আত্মগোপন থেকে ফের প্রকাশ্যে আসে কলেজ ছাত্র করিম ও শিহাব। তবে তারা এখন পাল্টিয়েছে মাদক ব্যবসার কৌশল।
২০২০ সালের শুরুতে তাদের বিষয়ে সংবাদপত্রে বলা হয়েছিল- মো. করিম বিন সামাদ কক্সবাজার সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। ২০ বয়সী এই ছাত্রের চলাফেরা দেখে সহপাঠিরা সবসময় অবাক হন। তার টাকা খরচ ছিল সবার কাছে রহস্যজনক। নামিদামি বাইক ও প্রাইভেটকার ছাড়া চলে না কলেজছাত্র করিম। কক্সবাজার কলাতলীর তারকামানের হোটেলে রাতযাপন করেন নিয়মিত। দামি ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টে তার নিয়মিত আড্ডা। একটি হোটেলে নিজের জম্মদিনেও খরচ করেছে প্রায় ৪ লাখ টাকা। করিম টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমোড়া বৃটিশ পাড়া এলাকার মো. সেলিমের ছেলে। অল্প বয়সে তাও দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রের এতো টাকা খরচ ও চলাফেরার রহস্য সহপাঠিদের সব সময় ভাবিয়ে তুলছে। এমনকি কক্সবাজার শহরে তার চলাফেরাও রহস্যজনক। নিজের গ্রাম টেকনাফে খুব কম সময়ের জন্য যান তিনি। বেশির ভাগ সময় কক্সবাজার শহরে অবস্থান করেন। তার রয়েছে বহু মোবাইল ফোন নাম্বার।
খোঁজখবর নিয়ে ও সহপাঠিদের সূত্রে জানা গেছে, মো. করিম কক্সবাজার সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন ২০১৭ সালে। ২০১৯ সালে ইন্টার ফাইনাল পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। ২০২০ সালে আবারো ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু অকারণে তিনি পরীক্ষা দিচ্ছেন না বলে সহপাঠিদের সূত্রে জানা গেছে।
সহপাঠিরা জানিয়েছেন, কলেজে আসলে সবাই মো.করিমের দিকে অবাক হয়ে থাকিয়ে থাকেন। একেক দিন একেক ধরণের দামি বাইক নিয়ে তিনি কলেজে আসেন। অনেক সময় বাইকের বহর নিয়েও কলেজে আসতেন। তার চলাফেরা কোটিপতির মতো। অনেক সিনিয়র ভাইদের নিয়মিত টাকাসহ বিভিন্ন সহযোগিতা করেন মো. করিম। কলেজে ভর্তি হওয়ার সুবাদে কক্সবাজার শহরে নিয়মিত অবস্থান করেন তিনি। তবে নিয়মিত ক্লাস করতেন না। শহরে তার একটি গ্রুপও তৈরি হয়। গ্রুপে সবাই তার সমবয়সী। এরমধ্যে কয়েকজন তার কলেজের বন্ধুও।
একটি সূত্রে জানা গেছে- সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরপরেই আত্মগোপনে চলে যায় করিম ও শিহাব। র্দীঘদিন তারা আত্মগোপনে ছিল। পুলিশ তাদের খোঁজও করেছিল। এরিমধ্যে টেকনাফে মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। হত্যাকান্ডের পর কক্সবাজার জেলা পুলিশ একযোগে বদলি হয়। এই বদলির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফের প্রকাশ্যে আসে করিম ও শিহাব।
তাদের কয়েকজন বন্ধু জানান, করিম একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী। কলেজে পড়ার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা কারবারে জড়িত। তার সাথে রয়েছে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া এলাকার শিহাব। টেকনাফ থেকে নিয়মিত বাইকে করে ইয়াবা ট্যাবলেট কক্সবাজারে নিয়ে আসত করিম ও শিহাব। তাদের রয়েছে দুইটি দামি বাইক। এই বাইকের তেলের ট্যাংকে বিশেষ কৌশলে রয়েছে ইয়াবা বহন করার মতো জায়গা। ইয়াবা বহন করতে সহজ হওয়ায় করিম তার বন্ধু শিহাবকে একটি সাড়ে ৪ লাখ টাকা দামের বাইকও কিনে দেন। বর্তমানে সেই বাইকটি শিহাবের কাছে রয়েছে। ওই বাইকের তেলের ট্যাংকে রয়েছে বিশেষ জায়গাও। ভ্রমণের নামে বাইক দিয়ে পাচার করে ইয়াবা। এছাড়া তাদের একটি নছিমন (ছারপোকা) গাড়ি রয়েছে। টেকনাফ থেকে নছিমন গাড়িটি বিভিন্নভাবে কক্সবাজারে ইয়াবা নিয়ে আসে। বর্তমানে নছিমন গাড়িটি নেই বলে জানা গেছে। টেকনাফ থেকে বিশেষ কৌশলে ইয়াবা এনে ঢাকায় পৌছে দেন কলেজ ছাত্র শিহাব। বিমানে করে এসব ইয়াবা পাচার করে শিহাব। এছাড়া তাদের ইয়াবা পাচার গ্রুপে রয়েছে রামুর এক মেয়ে। মেয়েটি তাদের সাথে কক্সবাজার সিটি কলেজে পড়ে। ইয়াবার ছোঁয়ায় মেয়েটিও বানিয়েছে আলিশান বাড়ি।
জানা গেছে- বর্তমানে করিম কক্সবাজার শহরের কালুর দোকান এলাকায় একটি আলিশান ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। তবে সেই ফ্ল্যাটে নিয়মিত থাকেন না। মাঝে মাঝে ওই ফ্ল্যাটে থাকেন তার বন্ধু শিহাব। রয়েছে তাদের সাথে কয়েকজন নারীও। বিভিন্ন সময় তারা প্রাইভেট কার নিয়ে চলাফেলা করেন। কলেজছাত্র করিমের রয়েছে একটি প্রাইভেট কারও। বিভিন্ন সময় ওই কার নিয়ে ইয়াবা পাচার করে বলে জানা গেছে। এছাড়া কক্সবাজার শহরে করিমের সিন্ডিকেটে রয়েছে তার এক মামা ও মামীও। কথিত এই মামা ও মামী থাকেন কক্সবাজার শহরের ১২ নং ওয়ার্ডস্থ লাইট হাউজ মসজিদের পাশে। সেখান তারা বহুতল ভবনও করেছে। যারা নিয়মিত ইয়াবা কারবারে জড়িত রয়েছে। লাইট হাউজ এলাকার ওই ভবনে করিম ও শিহাবের নিয়মিত আড্ডা বলেও জানা গেছে। সেখানে টেকনাফের বিভিন্ন মানুষের আনাগোনাও রয়েছে। কক্সবাজার সরকারি কলেজের পাশে করিমের একজন খালাও রয়েছে। টেকনাফ থেকে এনে এই খালাকে সেখানে বাড়িও করে দিয়েছে করিম। সেখানেও বিভিন্ন সময় আত্মগোপনে থাকে করিম।
আরেকটি সূত্রে জানা গেছে, নুনিয়ারছড়া এলাকার কলেজছাত্র শিহাবের বিষয়ে পুরো এলাকাবাসিও অবগত রয়েছে মাদক কারবার নিয়ে। করিমের ইয়াবার টাকায় আলিশান গেইট দিয়ে ঘরও করেছে শিহাব। শিহাবের পরিবারও বিষয়টি অবগত রয়েছে। মাদক কারবারে শিহাবের মায়ের হাতও রয়েছে বলে জানা গেছে। করিমের বেশির ভাগ টাকা জমা থাকে শিহাবের বাসায়।
অল্প বয়সী এই কলেজছাত্রের হাতে নামিদামি সব বাইক। প্রতিমাসে বাইক পরিবর্তন করেন করিম। প্রতিটি বাইকের মূল্য ৩ থেকে ৫ লাখের মধ্যে। গত দুই বছরে প্রায় ১০টির মতো বাইক পরিবর্তন করতে দেখেছেন সহপাঠিরা। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার শহরে একটি দামি প্রাইভেট কার নিয়ে ঘুরাফেরা করেন। অনেক সময় নোহা গাড়িও চালান নিজে। প্রাইভেট কার নিয়ে বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেন এবং দামি রেস্টুরেন্টে খাবার দাবার ও আড্ডা জমান। এক লাখের বেশি দামে মোবাইল ফোনও তার হাতে। গলায় ও হাতে পড়েন র্স্বণের চেইনও।
এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে অনুসন্ধান চলে করিম ও শিহাবের বিষয়ে। তাদের বিষয়ে খোঁজ নিতে পুলিশ প্রশাসনের একটি দপ্তরে সব তথ্য প্রদান করা হয়। অনুসন্ধান করে ওই দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, করিম একজন ইয়াবা কারবারি। কলেজে পড়ার আড়ালে সে ইয়াবা কারবারে জড়িত হয়ে পড়ে। ওসি প্রদীপের আমলে টেকনাফে ব্যাপক ধরপাকড়া চলার কারণে গা ঢাকা দিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করেছিল। এরপর দীর্ঘদিন আত্মগোপনেও ছিল। তবে তার বিরুদ্ধে মামলা বা কোনো অভিযোগ নেই।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.