ফেস মাস্ক ব্যবহারের আদ্যোপান্ত

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ আমরা মাস্ককে আমাদের মুখের সামনে রাখি, তার মাঝেই হাসি, কাশি কিংবা হাঁচি সব দিয়ে থাকি। এরপর সেগুলোকে ভাঁজ করে ব্যাগে কিংবা পকেটে ঢুকিয়ে রাখি পুনরায় ব্যবহারের জন্য। যদিও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ হচ্ছে প্রতিবার বদ্ধ জনপরিসরে যাওয়ার সময় আমাদের অবশ্যই একটি নতুন ফেস মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। ইউগোভ পোল বলছে, অনেক মানুষ মাস্ক ধোয়ার আগেই একাধিকবার ব্যবহার করে এবং ১৫ শতাংশ ব্রিটিশ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য মাস্ক একেবারেই ধোয় না। একইভাবে অর্ধেকের বেশি মানুষ যারা একবার ব্যবহার করা যায় এমন মাস্ককে বেছে নিয়েছে, তারা সেটি একাধিকবার ব্যবহার করছে। তবে উদ্বেগজনক ব্যাপার হচ্ছে ৭ শতাংশ এমন মানুষও আছে যারা কিনা একবার ব্যবহারযোগ মাস্ক ব্যবহার করার পর কখনো তা ফেলে দেয় না।

ফেস মাস্ক তৈরি করা হয় মূলত মুখ ও নাকের মাধ্যমে নির্গত আমাদের শ্বাসযন্ত্রের ড্রপলেটকে আটকানোর জন্য। কিন্তু আমাদের নিজেদের শ্বাসযন্ত্রের ড্রপলেট কি সত্যিই খুব খারাপ? প্রমাণগুলোকে পরীক্ষা করা যাক।

ফেস মাস্কগুলো কীভাবে দূষিত হয় এবং কী ধরনের জীবাণু দিয়ে?

যদি আপনি আপনার ব্যবহূত ফেস মাস্ককে একটি স্বচ্ছ থালায় মুছে ফেলেন এবং সেখানে অণুজীবগুলো বাড়তে দেন তবে আপনি সেখানে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক দেখতে পাবেন। ইউনিভার্সিটি অব লিডসের বায়ুবাহিত রোগ সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ক্যাথ নোয়াকাস বলেন, বেশির ভাগেরই নিরীহ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আপনি যদি আপনার হাত, নাক, মুখ কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশের নমুনা নেন তবে আপনি একই রকম কিছু দেখতে পাবেন। যাই হোক, দীর্ঘস্থায়ী মাস্ক পরার কারণে ঘর্ষণ ও আর্দ্রতার সঙ্গে মিলিত হয়। যার ফলে একীভূত হওয়া এই জীবাণুগুলো ‘মাস্কনে’ নামক প্রাদুর্ভাব শুরু করতে পারে।

মাস্কনে কী?

কনসালট্যান্ট ডারমাটোলজিস্ট ড. থিভি মারুথাপ্পু বলেন, মাস্ক পরার সঙ্গে সম্পর্কিত মুখের সব র্যাশকে এ টার্ম দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যেখানে ব্রণও অন্তর্ভুক্ত। ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ভাইরাসের জন্য মাস্ক যদি ভেক্টর হয়, তবে আমি পরামর্শ দেব আপনি প্রতিদিন মাস্ক ধুয়ে ফেলুন, যদি আপনি তা প্রতিদিন ব্যবহার করে থাকেন।

নরম সুতা যেমন কটনের ক্ষেত্রে ঘর্ষণের সম্ভাবনা কম, যা সিনথেটিক ফাইবারের মতো পলিস্টারের ক্ষেত্রে আবার বেশি, যোগ করেন থিভি।

নোংরা মাস্ক থেকে কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি কেমন?

যদি আপনি কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হন তবে আপনার মাস্কটি মারাত্মকভাবে করোনাভাইরাস দ্বারা দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন কেউ যদি আপনার মাস্কটির সংস্পর্শে আসেন তবে সেক্ষেত্রে তাদের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বেন। তাই আপনার কখনই উচিত হবে না ভালোভাবে হাত ধোয়া ছাড়া নিজের মাস্ক অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা কিংবা স্পর্শ করতে দেয়া।

অন্য মানুষের নিঃশ্বাস ত্যাগের ব্যাপারটি আলাদা। ২০১৯ সালে স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের মাস্কের বাইরে বিভিন্ন ধরনের শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে। যেখানে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অ্যাডেনোভাইরাসও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদিও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ডাটা নেই, যা প্রমাণ করতে পারে যে এমন বাহ্যিক দূষণ কভিড-১৯-এর ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

তাহলে আমি আমার পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফ্যাব্রিক মাস্ককে কতবার ধোব?

মূলত প্রতিবার ব্যবহারের পরই আমার উচিত মাস্ক ধুয়ে ফেলা। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর রায়না ম্যাকইনটাইরে বলেন, প্রতিদিন মাস্ক পরার পর সেটি দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা এটা পরীক্ষা করেছি এবং সার্জিক্যাল ও কাপড় উভয় ধরনের মাস্কেই ভাইরাসের উপস্থিতি দেখেছি।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসর উইলিয়াম রিসটেনপার্ট বলেন, বারবার ধোয়া বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যখন আপনি সংবেদনশীল কারো সংস্পর্শে আসবেন। সম্প্রতি তিনি আবিষ্কার করেছেন যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দূষিত ধূলিকণায় ভ্রমণ করতে পারে।

আরেকটি পৃথক গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন যে সাধারণ পরিধানের সময় ফ্যাব্রিক মাস্ক থেকে ধুলো বের হয়: আপনি ভাবতে পারেন, যদি কেউ সংক্রমিত হয় এবং তারা যদি ফ্যাবিক বা সুতি কাপড়ের মাস্ক পরে যা কিনা বেশ দূষিত, তবে এটা সম্ভব যে সে কণাগুলো ভাইরাস বহন করছে। তার মতে, অবশ্যই আপনি প্রতি ২০ মিনিট অন্তর মাস্ক ধুতে পারবেন না। কিন্তু প্রতি পাঁচ কিংবা ছয়দিন পর হলে সেটা বেশ লম্বা একটা সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

কীভাবে এটি ধোয়া উচিত?

গরম পানিতে ধোয়া সবচেয়ে ভালো, যদিও মাস্ক সাধারণ লন্ড্রিতেও যেতে পারে। ম্যাকইনটাইরে বলেন, অবশ্যই ন্যূনতম ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সাবান দিয়ে ধুতে হবে। তিনি এর আগে ভিয়েতনামের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে কাপড়ের মাস্কের একটি ট্রায়াল সম্পন্ন করেছিলেন এবং সেখানে দেখেছিলেন যে সার্জিক্যাল মাস্কের তুলনায় এটা স্টাফদের কেবল সুরক্ষা দিতেই ব্যর্থ না, বরং এটি অসুস্থতার ঝুঁকিও অনেক বাড়িয়ে দেয়। তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেটা মূলত মাস্কের সমস্যা ছিল না। সমস্যা ছিল, সেগুলো প্রায়ই হাত দিয়ে ধোয়া হতো।

ম্যাকইনটাইরে বলেন, যেসব স্বাস্থ্যকর্মীর কাপড়ের মাস্ক হাসপাতালের লন্ড্রিতে ধোয়া হতো সেগুলো সার্জিক্যাল মাস্কের মতোই ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা প্রদান করত। ঠাণ্ডা বা কুসুম গরম পানিতে হাত দিয়ে ধোয়া পর্যাপ্ত না।

মাস্ক পরার আগে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। ম্যাকইনটাইরে বলেন, আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে মাস্কগুলো আরো বেশি ছিদ্রযুক্ত যে কারণে সেগুলো কম কার্যকর।

মাস্ক ১০ মিনিট পরে সেটি যদি খুলে ব্যাগে রাখা হয়, তবে পরদিন কি পরা যাবে?

এ প্রশ্নের উত্তরে ম্যাকইনটাইরে বলেন, যদি এটা সতর্কতার সঙ্গে ও নিরাপদে করা হয় তবে ঠিক আছে। আপনাকে প্রথমে নিজের হাত স্যানিটাইজ করে নিতে হবে ও তারপর কেবল স্ট্র্যাপ বা কানের দিকের অংশ ধরে এটি সরাতে হবে এবং পরে সেটিকে জিপ লাগানো ব্যাগে রেখে দিতে হবে। একইভাবে হাত স্যানিটাইজ করে এবং মুখের অংশ না ধরে সেটিকে পুনরায় পরতে হবে।

কেন আমার মাস্ক রাখার জন্য আলাদা পাত্রের প্রয়োজন?

কারণ হ্যান্ডব্যাগ ও পকেট প্রায়ই চাবি এবং না ধোয়া হাত রাখার জন্য ব্যবহূত হয়, যা নোংরা হতে পারে। পাশাপাশি অন্য একটি ছোট ঝুঁকিও আছে যে আপনার মাস্ক অন্য জিনিসগুলোকে দূষিত করতে পারে। নোয়াকিস বলেন, আমি সব সময় বলি, মাস্ককে এমনভাবে নিতে হবে, যেন এটি দূষিত।

মাস্ককে কি অ্যালকোহল বা জীবাণুনাশক দ্বারা স্প্রে করা যাবে, ধোয়ার পরিবর্তে?

সেক্ষেত্রে আপনার জীবাণুনাশক রাসায়নিক দ্রব্য নিঃশ্বাসে টেনে নেয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে ধোয়া কেবল করোনাভাইরাস দূর করে না, এর ফলে অন্য জীবাণু, ঘাম ও শ্লেষ্মাও দূর হয়। তাই স্প্রে কোনো বিকল্প নয়।

দ্য গার্ডিয়ান

Comments are closed.