ফরিদুল মোস্তফার সুখের ঘরে প্রদীপের আগুন!

ইমাম খাইর, ওয়ান নিউজ:
ফরিদুল মোস্তফা খান, দুরন্তপনা-মেধাবী এক সাংবাদিক। কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে কমবেশী সবাই তাকে চেনে। ছোট্ট বয়স থেকে লেখালেখিতে অভ্যস্ত ছিলেন। সংবাদে তার হাত খুবই পোক্ত। একটু ছটপটে স্বভাবের হওয়ায় দুষ্টুমিও রয়েছে। কলমের খোঁচায় অনেকের ‘মনোকষ্টের’ কারণও হয়েছেন। তবু তা ছাপিয়ে এগিয়েছে অনেক দূর। কাজ করেছেন অনেক নামকরা জাতীয় দৈনিকে। সম্পাদনা করেন দৈনিক কক্সবাজারবাণী ও জনতারবাণী ডটকম।

কিন্তু কক্সবাজারের এই মেধাবী সাংবাদিকের সুখের ঘরে এখন দুঃখের আগুন জ্বলছে। টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ (সদ্য বরখাস্ত)-এর ক্ষোভের বলি হয়ে ৬টি মিথ্যা মামলায় ১১ মাস ধরে কারাবাস করছেন। করোনাকালে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানের পরিবারের দুর্দিন যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে গেছে ৩ ছেলে-মেয়ের পড়া লেখা। স্ত্রী, ৩ সন্তান ও বৃদ্ধ মায়ের চরম অভাব অনটনে দিন কাটছে। মামলার খরচ ও সংসারের ঘানি টানতে বিক্রি করেছেন বসতভিটা। তবু শান্তি নেই। প্রতিনিয়ত ভয় তাড়া করছে। অবাক করা বিষয়, ফরিদকে জামিনে কারামুক্ত করতে কোনো উদ্যোগ নেই। এর কারণ কোনো পারিবারিক অন্তর্কলহ নয়। ওসি প্রদীপের ‘ক্রসফায়ারের’ ভয়ে কারাগারকেই নিরাপদ মানছে ফরিদের পরিবার। এই সাংবাদিকের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে এমন ভয়ঙ্কর তথ্য।

স্ত্রী হাসিনা মোস্তফা সিভয়েসকে জানালেন, তার স্বামী সত্য ও বস্তুনিষ্ট সংবাদ করতেন। ওসি প্রদীপের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে লিখে গেছেন। তাই তাকে পরপর ৬টি মামলা দেয়া হয়েছে। ওইসব মামলায় প্রায় ১১ মাস জেলবন্দি। সেখানে ঠিক মতো চিকিৎসা পাচ্ছে না। একটু দেখা করতে অনেক ভোগান্তি পেতে হয়। তদন্তপূর্বক মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার চায় ফরিদের পরিবার।

ফরিদুল মোস্তফার মেয়ে সুমাইয়া মোস্তফা খান জানিয়েছে, তাদের পরিবারের কারো বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই। তারা কখনো অপরাধে জড়ায়নি। শুধু নিউজ লিখার অপরাধে পিতা ফরিদুল মোস্তফার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। কারান্তরীন পিতার মুক্তি দাবী করেছে সুমাইয়া। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- ওসি প্রদীপ কুমার দাশের রোষানলে পড়ে ফরিদুল মোস্তফার ঠিকানা এখন কারাগার। নিরাপত্তার অনিশ্চয়তায় জামিনে বের করার তদবিরও করছে না তার পরিবার। দুর্নীতি ও অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের জেরে এই সাংবাদিককে চাঁদাবাজি, অস্ত্র, মাদক মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে।

সংবাদ লিখার অপরাধে পুলিশি নির্যাতনে ফরিদের দু’চোখ প্রায় অন্ধ, ডান হাত এবং পা ভাঙা, আঙুল থেঁতলানো। শারীরিক কারণে হয়তো আর সাংবাদিকতা করতে পারবে না ফরিদ। পারলেও তার পরিবার তাকে আর এ পেশায় রাখতে চায় না। তার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য- জীবনই যেখানে অনিশ্চিত, সাংবাদিকতা তো সেখানে দুরাশা।

ফরিদের ওপর এমন নির্যাতনের বিস্তারিত জানতে সাংবাদিক-মানবাধিকার কর্মীদের একটি দল শিগগিরই ঢাকা থেকে কক্সবাজারে আসছেন বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয় অনেকের অভিযোগ, জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন ও পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন নিয়ে কয়েকটি প্রতিবেদন করেন ফরিদুল মোস্তফা খান। যার মধ্যে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। অসত্য কিছু বক্তব্য ছাপিয়েছেন। অথচ ওই সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিতে কাজ করে যাচ্ছিলেন পুলিশ প্রশাসন। মেগাপ্রকল্পভিত্তিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন জেলা প্রশাসন তবু একজন সাংবাদিকের উপর বর্বর কায়দায় নির্যাতন মেনে নিতে পারছেনা স্বজন ও সহকর্মীরা। প্রদীপ কুমারদের ভয়ে এতদিন মুখ না খুললেও এখন সাহস করে কথা বলতে শুরু করেছে ভুক্তভোগিরা।

২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর বাসা থেকে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফাকে আটক করে পুলিশ। এরপর কক্সবাজার শহরের সমিতি পাড়ায় বাড়িতে অভিযানে যায়। সেখান থেকে গুলিসহ ২টি অস্ত্র, ৪ হাজার ইয়াবা ও বিপুল পরিমান বিদেশী মদের বোতল উদ্ধার হয় বলে পুলিশ দাবি করে। যদিওবা পরিবারের দাবি, এসব নাটক। সম্পূর্ণ সাজানো। গত বছরের ৩০ জুন ফরিদুল মোস্তফা খানের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় চাঁদাবাজি মামলা রুজু হয়। যার মামলা নং- ১১৫, জিআর নং-৩১৬/১৯। এরপর তাকে পুলিশ হন্য হয়ে খোঁজতে থাকে। আত্মরক্ষায় ঢাকায় আত্মগোপনে চলে যায় ফরিদুল মোস্তফা। নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর গত বছরের ২৮ জুলাই পৃথক আবেদনও করেন।

সাংবাদিক ফরিদের পরিবারের দাবি- উক্ত আবেদনের তদন্ত না করে উল্টো টেকনাফ থানা ও কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের একটি বিশেষ টিম মিরপুর থানার পুলিশের সহায়তায় ‘ওয়ারেন্ট’ দেখিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। আইন অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় কারাগারে না পাঠিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ৬টি মামলা রয়েছে।

উল্লেখ্য, স্বেচ্ছায় অবসর নেয়া সেনা বাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ পুলিশের সাত সদস্যকে ৭ আগস্ট বরখাস্ত করা হয়েছে। এঘটনায় মেজর সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস ৫ আগস্ট বাদী হয়ে ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামী করে টেকনাফ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। ওই দিন রাতেই মামলাটি আদালতের আদেশে টেকনাফ থানায় রেকর্ড হয়।

পরের দিন ৬ আগস্ট ৭ আসামী আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে আবেদন নামঞ্জুর করে সকলকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন টেকনাফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (আদালত নম্বর-৩) এর বিজ্ঞ বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাং হেলাল উদ্দিন। পরে একই আদালত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, ইন্সপেক্টও লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দলাল রক্ষিতকে ৭ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর ও বাকী আসামীদের ২ দিন জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদ করার আদেশ দেয়। ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে র‌্যাব।

Comments are closed.