সোনার দাম বাড়ছে কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক:
করোনাভাইরাসের কারণে গত মার্চ থেকে সামাজিক অনুষ্ঠান প্রায় বন্ধ। জুয়েলার্স ব্যবসায়ীরাও বলছেন, নতুন করে সোনার গহনা বানাতে দোকানমুখী হচ্ছেন না ক্রেতারা। অর্থাৎ সোনার চাহিদা আগের চেয়ে কয়েকগুণ কমেছে। অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম হলো চাহিদা কম থাকলে সেই জিনিসের দাম কমে। কিন্তু সোনার ক্ষেত্রে হচ্ছে তার ঠিক উল্টো। সোনার দাম বাড়তে বাড়তে অনেকেরই নাগালের বাইরে চলে গেছে।
বিশ্ববাজারে ডলারের মতো সোনাও একটি কারেন্সি বা মুদ্রা। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনা ও ডলার দুটোই কিনে রাখে এবং ব্যবসা করে। বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোতে ডলারের দাম পড়ে গেছে। ফলে চীনসহ বিভিন্ন দেশে অনেকেই ডলার বিক্রি করে সোনা কিনতে শুরু করেছে। এতে সোনার চাহিদা বেড়ে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামও বাড়ছে।
জানা গেছে, করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম প্রায় ৫শ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে গত এক সপ্তাহেই প্রতি আউন্স সোনার দাম বেড়েছে আড়াইশ ডলার করে। যে কারণে দেশের বাজারে সোনার চাহিদা কমলেও দাম বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের সোনা যাতে দেশের বাইরে না যায় সে জন্যই দাম বাড়ানো হয়। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্যই সোনার দাম বাড়ানো হয়। চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স করার জন্য এটা করতে হয়।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পরও দেশের বাজারে দাম যদি না বাড়ানো হয়, তাহলে ভারতসহ দুনিয়ার সব দেশের মানুষ বাংলাদেশ থেকে অল্প দামে সোনা কেনা শুরু করবে। বাংলাদেশ হবে স্মাগলিংয়ের অভয়ারণ্য।
দিলীপ কুমার আগরওয়ালা আরও বলেন, করোনার কারণে দেশে সোনার চাহিদা কমে গেলেও সোনার দাম বাড়ছে। এর প্রধান কারণ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা। তিনি উল্লেখ করেন, সোনা এক ধরনের কারেন্সি। আন্তর্জাতিক নিয়ম হলো ডলার অথবা সোনা নির্দিষ্ট পরিমাণ রিজার্ভ থাকলেই কেবল টাকা প্রিন্ট করা যায়। করোনার কারণে পৃথিবীজুড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে সব দেশকে টাকা প্রিন্ট করতে হচ্ছে। যে কারণে পৃথিবীর সব দেশের রিজার্ভ বাড়াতে হচ্ছে। এতে সোনার চাহিদাও বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছে করলেই টাকা প্রিন্ট করতে পারে না। টাকা প্রিন্ট করতে হলে হয়তো ডলারের রিজার্ভ থাকতে হবে অথবা গোল্ডের রিজার্ভ থাকতে হয়।
তিনি মনে করেন, আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আমেরিকার ওপর এখন কেউ আস্থা পাচ্ছে না। আমেরিকার নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সোনার দাম বাড়তেই থাকবে।
তিনি জানান, যারা বাংলাদেশকে সোনা চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করতো, তারা টন টন সোনা বাংলাদেশে এনে অন্য দেশে পার করতো। কিন্তু তারা বাংলাদেশ থেকে এক ভরি সোনাও কিনতো না। কারণ, বাংলাদেশে সোনা বেচাকেনা হয় আন্তর্জাতিক দাম অনুযায়ী।
তিনি বলেন, দাম বাড়ার কারণে সোনার ক্রেতা কমলেও বিক্রেতারা লাভ করছেন। এক বছর আগের কেনা সোনা যদি কেউ এখন বিক্রি করতে চান তাহলে তিনি ২২ হাজার টাকারও বেশি লাভ পাবেন। তার মতে, যেসব ক্রেতা এবং স্বর্ণ ব্যবসায়ী বেশি পরিমাণ সোনা কিনে রেখেছেন তারা লাভবান হচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, দেশের ভেতরে সোনা কেনার মানুষ না থাকলেও সোনায় যারা বিনিয়োগ করেন তাদের আগ্রহ বেড়েছে। অনেকেই ডলার বিক্রি করে সোনা কিনছেন। যে কারণে সোনার দাম বাড়ছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়ছে, সে কারণেও দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে করোনার সংক্রমণ বাড়ায় ঝুঁকিতে মার্কিন ডলার। পড়ে যাচ্ছে ডলারের দাম। অন্য মুদ্রার বিপরীতে চলতি বছর ৮ শতাংশ দর কমেছে ডলারের। করোনার এই অনিশ্চয়তার সময়কালে সোনার মতো নিরাপদ পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের। এ বছর সোনার দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
সোনা ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বাড়তি থাকলে সোনার দাম হয় নিম্নমুখী। আর ডলারের দাম নিম্নমুখী হলে সোনার দাম হয় ঊর্ধ্বমুখী। পাশের দেশ ভারতে সোনার দাম বাড়ার কারণে দেশের বাজারেও সোনার দাম বেড়ে যায়। অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে যখন টাকার মান কমে যায়, তখনও স্থানীয় বাজারে সোনার দাম বেড়ে যায়। এছাড়া, শীত মৌসুমে দেশে বিয়েসহ বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠান বেশি হওয়ায় সোনার চাহিদা বেড়ে যায়। পূজা, ঈদসহ বিভিন্ন পার্বণেও চাহিদা বেশি থাকায় সোনার দাম বাড়ে।
বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে ভালো মানের (২২ ক্যারেট) সোনা বিক্রি হচ্ছে ৭৭ হাজার ২১৬ টাকা। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে এই দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে (৬ আগস্ট) এক ভরি ভালো মানের সোনার দাম ছিল ৫৪ হাজার ৫২৯ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ভরিতে বেড়েছে ২২ হাজার ৬৮৭ টাকা।
বাজুসের এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে ইউএস ডলারের দরপতন হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমাগত স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশীয় বুলিয়ন মার্কেটেও স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ানো হয়েছে।
জানা গেছে, বৈশ্বিক এ মহামারির মধ্যে চারবার স্বর্ণের দাম বাড়ালো বাজুস। এর আগে ২৩ জুলাই স্বর্ণের দাম নির্ধারণ ক‌রে‌ছিল বাজুস। যা ২৪ জুলাই থে‌কে কার্যকর হয়। তার আগে গত ২৩ জুন এবং তারও আগে ২৮ মে স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করেছিল স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের এ সংগঠনটি। যদিও মরণঘাতী করোনার শুরুর দিকে (১৮ মার্চ) সোনার দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাজুস। পরদিন ১৯ মার্চ থেকে সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয় ৬০ হাজার ৩৬১ টাকা।
আমদানি কত?
স্বর্ণ নীতিমালা ২০১৮-এর বিধান অনুসরণ করে এ পর্যন্ত ১১ কেজি সোনা আমদানি করা হয়েছে। গত ৩০ জুন দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বর্ণবার আমদানি করে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড।

Comments are closed.