মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এড়াতে খেয়াল রাখুন এই বিষয়গুলো

আতিকুল ইসলাম ইমন

মোটরচালিত দ্বিচক্রযান অর্থাৎ মোটরসাইকেল সারাবিশ্বেই তুমুল জনপ্রিয়। বাংলাদেশে এ বাহনটির সংখ্যা মোট নিবন্ধিত পরিবহণের অর্ধকেরও বেশি। ২০১৯ সালে বিআরটিএ-এর হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ২৫ লাখ ১৯ হাজার প্রায়। যেখানে বাংলাদেশে মোট নিবন্ধিত পরিবহণ প্রায় ৪৫ লাখ।

গণপরিবহণ সংকট ও যানজটের কারণে শহরে দ্রুতই মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গ্রামেও। মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনাও ঘটে অহরহ। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৯ সালে সারাদেশে মোট মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৯৮টি। যা একক কোনো যানবাহনে সর্বাধিক।

এদিকে ঈদের সময় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা আরও বেড়ে যায়। সাধারণত দেখা যায়- ঈদের সময় গণপরিবহণের চলাচল সীমিত থাকে, ফলে এ বাহনটির ব্যাবহার বাড়ে। গণপরিবহণের অভাবে অনেকেই দূরের গন্তব্য পাড়ি দেন মোটরসাইকেলেই। আর এতে বেড়ে যায় দুর্ঘটনাও। আইন না মানা, উঠতি বয়সীদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, অদক্ষ চালক ও সতর্কতার অভাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঘটনা ব্যাপক হারে ঘটে থাকে।
বিজ্ঞাপন

দুর্ঘটনা এড়াতে সবচেয়ে জরুরি হলো আইন মেনে চলা। মোটরযান আইনের যেসব বিষয় রয়েছে সেসব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করতে হবে চালক ও যাত্রীকে। মনে রাখবেন, আইন অমান্য করলে জরিমানা দিয়ে হয়ত রেহাই পাওয়া যায় কিন্তু দুর্ঘটনা হলে চূড়ান্ত ক্ষতি আপনার। আইন মানা ও কিছু বিষয়ে সচেতন থাকলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এড়াতে যে কয়টি বিষয় পালন করা উচিত—

১. অদক্ষদের মোটরসাইকেল চালাতে দেবেন না
সাধারণত ঈদ বা কোনো উৎসবের সময় দেখা যায় মোটরসাইকেল ধার নেন বন্ধু-বান্ধব, নিকট আত্মীয়, সহপাঠী, সহকর্মী বা প্রতিবেশীরা। তাদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেবেন না। যদিও লাইসেন্স ছাড়া কেউ মোটরসাইকেল চালাতে পারবেন না, তবে বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের তুলনায় চালকের লাইসেন্স অর্ধেকেরও কম। সাধারণত দেখা যায় একটি মোটরসাইকেল পরিবারের বা কোনো অফিসের একাধিক সদস্য ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে অদক্ষ চালকের হাতে মোটরসাইকেল পড়ার সম্ভাবনা বেশি। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়।

মোটরসাইকেল কেনার আগে অবশ্যই প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং লাইসেন্স করতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া যান্ত্রিক পরিবহণ চালানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

২. যাত্রা শুরুর আগে মোটরসাইকেল নিরাপদ কি না পরীক্ষা করুণ
মোটরসাইকেলে যাত্রা শুরুর আগে কিছু যান্ত্রিক বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন। তেল, ব্রেক, লাইট, হর্ন ইত্যাদি কাজ করছে কি না পরীক্ষা করুণ। এছাড়া ফিটনেসবিহীন মোটরসাইকেল চালাবেন না। ফিটনেস ও লাইসেন্স না থাকলে সড়কে মোটরসাইকেলটি অবৈধ। লাইসেন্সবিহীন পরিবহণ চালানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

৩. পরতে হবে হেলমেট-গ্লাভস-ফুল প্যান্ট-জুতা
মোটরসাইকেলে যাত্রা শুরুর আগে অবশ্যই আইন মেনে পোশাক পরিধান করতে হবে। পরতে হবে হেলমেট, গ্লাভস, জুতা ও ফুল প্যান্ট। মোটরযান আইন ১৯৮৮ (সংশোধনী) অনুসারে, চালক ও যাত্রী দু’জনের মাথায় অবশ্যই হেলমেট থাকতে হবে। এ ছাড়া হাতে গ্লাভস ও পায়ে জুতা পরে তবেই চালকের আসনে বসতে হবে। মনে রাখতে হবে, হেলমেট ও হ্যান্ডস গ্লাভসই দুর্ঘটনায় আপনাকে বড় ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। বাংলাদেশে দেখা যায় অনেকেই লুঙ্গি পরে মোটরসাইকেল চালান। এটি নিরাপদ নয়। পরতে হবে ফুল প্যান্ট, পায়ে থাকতে হবে জুতা।

৪. মহাসড়কে দূরের যাত্রা মোটরসাইকেলে নয়
মহাসড়কে দূরের যাত্রায় মোটরসাইকেল মোটেও নিরাপদ নয়। দূরের যাত্রা উপযোগী হিসেবে তৈরি করা হয়নি এ বাহন। এ বাহনটি দিয়ে স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে ভ্রমণ করাই শ্রেয়। মহাসড়কে দূরের যাত্রা পুরপুরি পরিহার করুণ। যেসব মহাসড়কে দুই চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ সেসব মহাসড়কে উঠবেন না। দূরের যাত্রায় মোটরসাইকেল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বাহন। এটি নিশ্চিতভাবেই মরণ ফাঁদ।

৫. দুইয়ের অধিক নয়
মোটরসাইকেলে চালকসহ দুই জন একসঙ্গে ভ্রমণ করতে পারবেন। একটি মোটরসাইকেলে দুই জনের বেশি আরহী বেআইনি। আমাদের দেশে দেখা যায়, মোটরসাইকেলে জায়গা থাকায় প্রায়ই তিন জন আরোহী ভ্রমণ করেন যা একইসঙ্গে বেআইনি ও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। মনে রাখবেন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়াররা মোটরসাইকেল এমনভাবে নকশা করেছেন যেন একসঙ্গে দুই জন চলতে পারেন। তাই এক মোটরসাইকেলে তিন জন চড়লে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক অনেক গুণ বেড়ে যায়।

৬. গতি রাখুন সীমিত
মনে রাখবেন বেশিরভাগ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বেপরোয়া গতি। উচ্চ গতিতে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানোকে অনেকেই নিজের দক্ষতার প্রমাণ বলে মনে করেন। আসলে তা অদক্ষতাই তুলে ধরে। কারণ অদক্ষ চালক মাত্রই যথাযথ গতিসীমা জ্ঞানশূন্য। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লাইসেন্সধারী দক্ষ চালক কখনই যথাযথ গতির উপরে গাড়ি চালাবেন না। দুর্ঘটনা এড়াতে গতি সীমিত রেখার কোনো বিকল্প নেই। নিয়ন্ত্রণের বাইরে গতিতে মোটরসাইকেল চালাবেন না। নিজের ও অন্যের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন না। সড়কে স্পিডব্রেকারে প্রায়ই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। এর একমাত্র কারণ দ্রুত গতি।

৭. সড়কে প্রতিযোগিতা নয়
একটি মোটরসাইকেল অভারটেক করলেই দুই মোটরসাইকেলে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। অদক্ষ ও অপরিণামদর্শী চালকরাই মূলত এ ধরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে থাকেন। কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেও কোনো ধরণের প্রতিযোগিতা ঠিক করবেন।

এছাড়া আরেক ধরণের প্রতিযোগিতা দেখা যায়- কে কত কায়দা করে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। কেউ কেউ দুই হাত ছেড়ে চালানোর চেষ্টা করেন, কেউ আবার সড়কে জিগজ্যাগ চালান। এসবই অদক্ষতার চরম বহিঃপ্রকাশ। সড়কে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলে আপনারসহ সড়কে অন্যান্য পরিবহণের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। এ ধরণের মানসিকতা অবশ্যই বর্জনীয়।

৮. বাঁকে বিপদ
বাঁক নেওয়ার সময় বিপদ ঘটে। এসময় গতি কমাতে হবে। গতি বেশি থাকলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া এ সময় উল্টোদিক থেকে আসা গাড়ি খেয়াল রাখতে হবে খুব সতর্কতার সঙ্গে। প্রয়োজনে ভেপু বাজান। উল্টোদিক থেকে কী আসছে বা কী আছে তা পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে এগোবেন না।

৮. দুই রাস্তার সংযোগস্থলে অধিক ঝুঁকি
দুই বা একাধিক রাস্তার সংযোগস্থল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা এসব জায়গায়ই হয়ে থাকে। শহরের বাইরে যেসব সড়কে ট্রাফিক পুলিশ নেই সেখানে খুবই সতর্ক হতে হবে। কেননা আপনি সঠিক নিয়ম পালন করলেও দেখা যাবে আরেক গাড়ির নিয়ম ভাঙার ফল ভোগ করতে হতে পারে আপনাকে। তাই খেয়াল রাখুন অন্য রাস্তায় গাড়ির গতিবিধি।

৯. খারাপ আবহাওয়ায় মোটরসাইকেল নয়
মোটরসাইকেল খারাপ আবহাওয়া উপযোগী বাহন নয়। তাই আবহাওয়া খারাপ থাকলে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হবেন না। ঝড়-বৃষ্টি, ঘন কুয়াশা, তুষারপাতের সময় মোটরসাইকেল নয়। মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেলে যদি বৃষ্টি বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে তবে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিন। এ সময় মোটরসাইকেল চালাবেন না। দ্রুত বাড়ি ফিরতে গিয়েও দুর্ঘটনা ঘটে। আশেপাশের নিরাপদ জায়গায়ই আশ্রয় নিন। দূরের গন্তব্যে আশ্রয় নিতে গতি বাড়াবেন না।

১০. সড়কে বালি, পাথর, কাঁদায় ঘটে দুর্ঘটনা
অনেক সতর্কতার পরেও বালি, পাথর ও কাঁদায় ঘটে দুর্ঘটনা। শুকনো বালি বা পাথর রাস্তায় বেশি পরিমাণে থাকলে এতে চাকা স্লিপ করবে। তাই সড়কের বালি ও পাথরপূর্ণ অংশে মোটরসাইকেল চালাবেন না। এছাড়া রাস্তায় কাঁদা জমে গেলেও চাকা স্লিপ করে। ঘটে বিপদ।

Comments are closed.