রাষ্ট্রপতির আশাবাদ ও কলঙ্ক স্মৃতি

হঠাৎ করেই রাজনীতিতে বইছে সুবাতাস। কেমন যেন সমঝোতার আবহ চারদিকে। সমঝোতাটা আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখেই। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য চাই একটি ভালো নির্বাচন কমিশন। আগামী ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে।

সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে এই নিয়োগ দেবেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যদি শুধু প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেন, তাহলে রাজনীতির গিট্টু খুলবে না। আর যদি মোটামুটি সবার মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন করা যায়, তাহলে আগামী নির্বাচনের জট অনেকটাই খুলে যাবে।

গত ১৮ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করতে ১৩ দফা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। পরে ৬ ডিসেম্বর সেই প্রস্তাবাবলী বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছেও পাঠানো হয়। সেই প্রস্তাবের আলোকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করেছেন। বিএনপির সাথে আলোচনা দিয়েই শুরু হয়েছে প্রথম পর্বের সংলাপ। এ পর্বে বিএনপি ছাড়াও বঙ্গভবনের আমন্ত্রণ পেয়েছে জাতীয় পার্টি, এলডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও জাসদ। বাকিগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও বিএনপির সাথে রাষ্ট্রপতির আলোচনাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই সংলাপের সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে অনেককিছুই। আমি বরাবরই আশাবাদী। এই সংলাপের সাফল্যের ব্যাপারে আমি একটু বেশিই আশাবাদী। এই আশাবাদ নিছক কথার কথা নয়। বেশ কিছু যৌক্তিক ইঙ্গিতও রয়েছে। অনেকদিন ধরেই বিএনপি সংযত ও যৌক্তিক আচরণ করছে। তার ফলও পেয়েছে দলটি। সরকারও এখন অনেক সহনশীল। মাহমুদুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, মুক্তি পেয়েছেন মাহমুদুর রহমান মান্নাও। বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাবাবলী নিয়ে সরকারি দলের প্রতিক্রিয়াও ছিল অনেক সংযত।

প্রধানমন্ত্রীও একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির এবং তিনি যা করবেন তা মেনে নেবেন তারা। রক্তাক্ত অতীত ভুলে দুই পক্ষেরই হঠাৎ সমঝোতার লাইনে চলে আসার পেছনেও যৌক্তিক কারণ আছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জিতেই ক্ষমতায় আছে বর্তমান সরকার। আইনগতভাবে সে নির্বাচনের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যাওয়া সে নির্বাচনের নৈতিক ভিত্তি ততটা শক্ত নয়। দেশে বিদেশে প্রশ্ন আছে সে নির্বাচন নিয়ে।

আওয়ামী লীগের মত একটি প্রাচীন গণতান্ত্রিক দলের জন্য ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একটি বড় কলঙ্ক। সে কলঙ্ক মোচনের কোনো সুযোগ নেই। তবুও আরেকটি ভালো নির্বাচনই পারে সে কলঙ্কের স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে ইঙ্গিত দিয়ে নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। এটা বুঝতে কষ্ট হয় না, পরপর দুটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দায় আওয়ামী লীগ নেবে না।

আবার বিএনপিরও আগামী নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। পরপর দুটি জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলে দলকে ধরে রাখা কষ্টকর হবে বেগম জিয়ার জন্য। তাছাড়া পরপর দুটি নির্বাচন বর্জন করলে দলটি নিবন্ধন হারানোর ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সব মিলিয়ে ধারণা করা যায় আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমুলক হবে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা, সেটা ভবিষ্যত বলবে। তবে নির্বাচন যতই সুষ্ঠু হোক, গ্রহণযোগ্য হওয়া খুব কঠিন। কারণ নির্বাচন যতই সুষ্ঠু হোক, পরাজিত দলের তা মেনে নেয়ার সংস্কৃতি আমাদের দেশে নেই।

এই বাস্তবতায় আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে একটি ফলপ্রসু সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। বিএনপির সাথে রাষ্ট্রপতির সংলাপ, আমার আশাবাদকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। সংলাপের পর দু’পক্ষই খুবই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।

বঙ্গভবন থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি বলেন, আজকের আলোচনা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিএনপি যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা নির্বাচন কমিশন গঠনে সহায়ক হবে। তিনি এ ব্যাপারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহায়তা কামনা করেন। রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, যে কোনো আলোচনা সমস্যা সমাধানে বহুমুখী পথ দেখায়।’

বঙ্গভবনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যে আশাবাদ, তার প্রতিধ্বনি ছিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংবাদ সম্মেলনেও। সৌহার্দ্যপূর্ণ, উষ্ণ, আশাবাদ- মির্জা ফখরুলের ভাণ্ডারে যত প্রশংসাসূচক শব্দ আছে, সবগুলোই তিনি ব্যবহার করেছেন। শুধু কথার কথা নয়, তার চোখমুখেও ছিল উচ্ছ্বাসের ছটা।

তবে শুধু উচ্ছ্বাস আর আশাবাদ দিয়ে সমস্যা মিটবে না। নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি সার্চ কমিটি গঠন এবং তার আলোকে মোটামুটি সবাইকে আস্থায় রেখে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারলেই আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়ার দ্বার খুলবে।

এ জন্য সবাইকেই ছাড় দিতে হবে। বিএনপি ইতিমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাব, রাষ্ট্রপতিকে দেয়া লিখিত বক্তব্যের কোথাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি নেই। বরং তারা বলছে, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। এখন সব পক্ষের ইতিবাচক মানসিকতাকে আলোচনার টেবিলে আনতে, তার বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

বঙ্গভবনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেই সমস্যা সমাধানের মূল কথাটি বলে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি- যে কোনো আলোচনা সমস্যা সমাধানে বহুমুখী পথ দেখায়।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
probhash2000@ gmail. com

Comments are closed.