শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ শীতকাল শুরু হয়েছে সপ্তাহ দু-এক আগে। শীতের রাত নিয়ে প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন,

“এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা,
কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো”
জীবনানন্দ দাশের সেই শিশির কিংবা পাতা ঝরা অসম্ভব সুন্দর শীতের রাতে পড়ার ঘরে বসে আছি আমি। কাচের টেবিলে খাতা কলম রাখা। প্রাণের সংগঠন ছাত্রলীগের জন্মদিন আজ। লিখতে বসে মনে পড়ছে, এমন সুন্দর কোনো এক পৌষের রাতে বাঙালি জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল, দুঃখী বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের হাতিয়ার বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
মনটা আনন্দে ভরে যায়। ছাত্রলীগ তো শুধু একটি ছাত্র সংগঠন নয়, মহাকালের ইতিহাস সৃষ্টিকারী একটি নাম। একটি স্ব-স্বাধীন জাতির সকল অর্জনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে তার নামটি।
২.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ জন্ম নেয় ভারত পাকিস্তান।  তখন আমাদের ৫৬ হাজার বর্গমাইল ভূ-খণ্ডটির নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। বাঙালি অর্থনীতি, রাজনীতি সংস্কৃতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী আমাদের শোষণ করতে চেয়েছিল বারবার। যে রাষ্ট্রগঠনে আমাদেরও ভূমিকা ছিল, রাতারাতি তারা যেন হয়ে গেল সেই রাষ্ট্রের মালিক, আমরা নগণ্য প্রজা। তাদের সীমাহীন বৈষম্যের শিকার হয়েছি আমরা। বঞ্চিত হয়েছি মৌলিক অধিকার থেকেও। সেই শাসক গোষ্ঠীর অন্যায় আর শোষণের হাত থেকে বাঙালি জাতিকে রক্ষা করতে সময়ের দাবিতেই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেন ছাত্রলীগ। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ছাত্রসমাজের ডাকা হরতালের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অবদান রাখতে শুরু করে। এরপরে ১৯৫১ সালের আদমশুমারি চলাকালে সারা দেশে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা বাংলা ভাষার পক্ষে মতামত দিতে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন।
এরপর ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন এবং ’৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনী প্রচারে ছাত্রলীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুবের মার্শাল ’ল এর প্রতিবাদে ছাত্রলীগই প্রথম রাজপথে সোচ্চার হয়। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬ এর ছয় দফা এবং ছাত্রলীগের ১১ দফা অতঃপর ‘৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচনে বিজয়ী হতে ছাত্রলীগের অবদান ছিল মাইলফলক। এ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রলীগ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সাড়ে ১৭ হাজার ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা আত্মাহুতি দিয়েছেন। এই গৌরব পৃথিবীর আর কোনো ছাত্র সংগঠনের আছে কি-না আমার জানা নেই।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর পিতাহীন বাংলাদেশ বারবার গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। সেই সময়গুলোতেও ছাত্রলীগের হাজার হাজার নেতা কর্মী মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে এসেছে। ১/১১’এর অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে শত শত ছাত্রলীগ নেতা কর্মীকে অকথ্য নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। দেশব্যাপী হেফাজত ইসলামের নৈরাজ্য, বিএনপির আগুন সন্ত্রাস, জামাতের সঙ্গীর তৎপরতা ঠেকাতে সোচ্চার ছিল ছাত্রলীগ-ই। এ ছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পাহারা দিয়েছে পূজামণ্ডপ, করেছে রাস্তা মেরামতের কাজও, পরিবেশ জন্য লাগিয়েছে হাজার হাজার বৃক্ষ। দাঁড়িয়েছে বন্যার্ত, শীতার্ত মানুষের পাশে। কখনো করেছে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি আবার কখনো ছুটে গিয়েছে কোনো অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতে। আসলে সব সময় ভালো কিছু করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
৩.
একটি জাতি, শিক্ষা-দীক্ষায় যত এগিয়ে উন্নয়নেও তত এগিয়ে। শুধু তাই নয় উন্নয়নকে ফলপ্রসূ এবং উন্নয়নের শতভাগ সুবিধা সবার মধ্যে পৌঁছে দিতে সবার আগে দরকার শিক্ষিত জনগণ। শিক্ষা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হবে না। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে আধুনিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রত্যকটি সেক্টরে উন্নয়নের জোয়ার চলছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে শুরু করে যোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তিসহ সব খাতে চলছে সেই জোয়ার। উন্নয়নের সবগুলো সূচকে ইতিমধ্যে আমরা দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই অনেক উন্নত দেশকেও পেছনে ফেলেছি।
বিশ্ব ব্যাংক মনে করছে, সামনের দিনগুলোতে যে ১০টি দেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ প্রভাব বিস্তার করবে তাদের একটি হবে বাংলাদেশ। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে যে উন্নয়ন চলছে সেটাকে আরও কার্যকরী করতে শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছেন। পাশাপাশি জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নির্দেশ দিয়েছেন, সমাজ থেকে নিরক্ষরতা দূর করতে আরও বেশি কার্যকরী ভূমিকা নিতে। আমরাও নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ইতিমধ্যে আমরা নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। ২০১৭ সালকে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে নিরক্ষরতামুক্ত বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বছরের শুরু থেকেই পুরো দমে কাজ করে যাব আমরা। আমাদের কার্যক্রম যেন একেবারে জেলা উপজেলা থেকে ইউনিয়ন এবং প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছায় সেই বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ থেকে অঞ্চল ভিত্তিক বিভিন্ন টিম করে দেওয়া হবে কাজ সঠিকভাবে তদারকি করার জন্য। বঙ্গবন্ধু তনয়া, জননেত্রী, দেশরতœ শেখ হাসিনা নিরক্ষমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে আন্দোলন শুরু করেছেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে।
৪.
আজ লাখো তারুণ্যের প্রাণের উচ্ছ্বাস, আবেগ, ভালোবাসা আর ভালো লাগার সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৬৯তম জন্মদিন। ছাত্রলীগের জন্ম না হলে কখনই বাঙালির লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস নির্মিত হতো না। কখনই সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে রঞ্জিত হতো না রাজপথ। গুমরে কাঁদত মানবতা। এ জন্যই জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস’। শুভ জন্মদিন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’। অতীতের ন্যায় তোমার হাত ধরেই রচিত হোক মহাকালের শ্রেষ্ঠ ইতিহাস। ইতিহাসের পাতায় পাতায় অনন্ত অক্ষয় হয়ে থাকুক তোমার নাম।
শুভেচ্ছা অফুরান।
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

Comments are closed.