অবশেষে আত্মসমর্পণে হোয়াইটওয়াশ বাংলাদেশ

ওয়ান নিউজ ক্রীড়া ডেক্সঃ টানা দুই ম্যাচ হারার পর বাংলাদেশ শিবিরকে হোয়াইটওয়াশের শঙ্কা পেয়ে বসেছিল। ব্যাটসম্যানদের ভরাডুবির পর বোলারদের ব্যর্থতায় তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে টাইগাররা। শনিবার কিউইদের কাছে ৮ উইকেটের বড় ব্যবধানে হেরেছে মাশরাফি বিন মুর্তজার দল। এই হারের ফলে প্রায় তিন বছর পর ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হলো বাংলাদেশ।

নেলসনের স্যাক্সটন ওভালে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৩৬ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই উইকেট হারানোর পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় নিউজিল্যান্ড। নেইল ব্রম ও কেন উইলিয়ামসনের অসাধারণ জুটিতে ৫২ বল ও ৮ উইকেট হাতে রেখেই জয়ের বন্দরে নোঙর করে স্বাগতিকরা।

নিউজিল্যান্ডের জয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন বোলাররা। বোলারদের গড়ে দেয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ব্রম ও উইলিয়ামসনের মধ্যকার ১৭৮ রানের দুর্দান্ত জুটিতে সহজ জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে কিউইরা। নিউজিল্যান্ডের হয়ে দ্বিতীয় উইকেটে এটাই সর্বোচ্চ রানের জুটির রেকর্ড।

নিউজিল্যান্ডের জয়ের নায়ক ব্রম ও উইলিয়ামসন। ছয় বছর পর বাংলাদেশ সিরিজ দিয়েই জাতীয় দলে ফিরেছেন ব্রম। আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করার পর শনিবার আউট হওয়ার আগে খেললেন ৯৬ বলে ৯৭ রানের ঝলমলে এক ইনিংস। উইলিয়ামসনকেও অবশ্য সেঞ্চুরি মিসের হতাশায় পুরতে হয়। ১১৬ বলে ৯৫ রান করে দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন স্বাগতিক দলনায়ক। তার সঙ্গী জেমস নিশাম অপরাজিত ছিলেন ২৮ রান নিয়ে। টম ল্যাথাম ৪ রান করে আউট হয়েছেন। অন্যদিকে মার্টিন গাপটিল ৬ রান করে ‘আহত অবসর’ হয়ে মাঠ ছাড়েন।

বাংলাদেশের হয়ে মুস্তাফিজুর রহমান দুটি উইকেট নেন। মাশরাফি, সাকিব আল হাসান ও তাসকিন আহমেদ উইকেটশূন্য থাকেন।

বাংলাদেশ সর্বশেষ কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল সেই ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ঘরের মাঠে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে সেবার টাইগারদের প্রতিপক্ষ ছিল সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে সমৃদ্ধ শ্রীলঙ্কা। এরপর আর কোনো সিরিজে সবকটি ম্যাচ হারের লজ্জায় পড়তে হয়নি মাশরাফি-সাকিবদের। ভুলে যাওয়া সেই স্বাদই ফের ফিরে আসল নেলসনের স্যাক্সটন ওভালে।

অল্প পুঁজি নিয়েও শুরুতেই ম্যাচ জমিয়ে তোলার ইঙ্গিত দিয়েছিল বাংলাদেশ। জয়ের জন্য ২৩৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড। মুস্তাফিজের ওভারের পঞ্চম বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে সাজঘরের পথ ধরেন স্বাগতিক ওপেনার টম ল্যাথাম। মাশরাফির করা তৃতীয় ওভারের চতুর্থ বলে বাউন্ডারি মারার পর হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়ে মাঠ ছাড়ে গাপটিল। সবাই তখন নড়েচড়েই বসছিলেন।

ইমরুলের বাজে ফিল্ডিংয়ের কারণে চতুর্থ ওভারে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। মুস্তাফিজের ওভারের পঞ্চম বলে স্লিপে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন ব্রম। তবে সেটি তালুবন্দী করতে পারেননি ইমরুল। সহজ ক্যাচ মিস করা দেখে ঠাণ্ডা মেজাজী মুস্তাফিজও বেশ বিরক্ত হয়ে পড়েন।

ইমরুলের ক্যাচ মিসের বড় মূল্য দিতে হয় বাংলাদেশকে। দ্বিতীয় উইকেটে রেকর্ড ১৭৮ রানের জুটিতে বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন ব্রম ও উইলিয়ামসন। টানা সেঞ্চুরি সেঞ্চুরির পথেই হাঁটছিলেন ব্রম। তবে মুস্তাফিজের করা ৩৫তম ওভারের প্রথম বলে কাটারে নাকাল হয়ে মাশরাফির দুর্দান্ত ক্যাচের শিকার হয়ে মাত্র তিন রানের জন্য সেঞ্চুরি মিসের হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি।

অবশ্য ততক্ষণে ম্যাচের ফলাফল অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। কেননা, ব্রম যখন আউট হয়েছিলেন তখন জিততে হলে ৯৫ বলে মাত্র ৪২ রান দরকার ছিল নিউজিল্যান্ডের। নিশামকে নিয়ে ৪২ বলে ৪৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন উইলিয়ামসন।

এর আগে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে দারুণ শুরুর পর মাঝপথে বড় ধস নামায় বড় সংগ্রহের স্বপ্ন চূর্ণ হয় বাংলাদেশের। বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোরে শুরু হওয়া ম্যাচে তামিম ও ইমরুল সেঞ্চুরি জুটি গড়ে বাংলাদেশকে মজবুত ভিতে এনে দেন। তবে ১০২ থেকে ১৭৯- এই ৭৭ রানের ব্যবধানে একে একে সাত ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফেরায় ২০০ রানের আগেই গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কার মুখে পড়ে টাইগাররা। কিন্তু শেষ দিকে মাশরাফি ও নুরুল হাসান সোহানের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের সুবাদে নির্ধারিত ৫০ ওভারে সম্মানজনক সংগ্রহ গড়তে সক্ষম হয় সফরকারীরা।

বাংলাদেশের হয়ে তামিম সর্বোচ্চ ৫৯ রান করেন। ইমরুলের ব্যাট থেকে আসে ৪৪ রান। মাশরাফি ১৮ বলে ১৪ ও নুরুল করেন ৩৯ বলে ৪৪ রান। মাহমুদউল্লাহ (৩), সাকিব আল হাসান (১৮), সাব্বির রহমান (১৯) ও মোসাদ্দেক হোসেন (১১)- সবাই ব্যাট হাতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।

দলের বিপদের মুখে অষ্টম উইকেটে মাশরাফিকে নিয়ে ৩৩ রানের জুটি গড়ার পর নুরুল আউট হওয়ার আগে নবম উইকেটে তাসকিনকে নিয়ে গড়েন ২৩ রানের জুটি। আর তাতেই সংগ্রহ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু শুরুর দিকে সম্ভাব্য স্কোর হিসেবে ২৮০/২৯০ এর কথাও ভাবা যাচ্ছিল। আরেকটি ব্যাটিং ধসের দিনে এমন উইকেটে বোলারদের যা দেওয়া উচিৎ ছিল তা দিতে না পারার দায় সেরা ব্যাটসম্যানের কজনার।

নিউজিল্যান্ডের হয়ে দুটি উইকেট এন ম্যাট হেনরি ও মিচেল স্যান্টনার। টিম সাউদি, জিতান প্যাটেল, জেমস নিশাম ও কেন উইলিয়ামসন একটি করে উইকেট নেন।

প্রসঙ্গত, প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশকে ৭৭ রানে পরাজিত করে এগিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে ৬৭ রানের জয় দিয়ে সিরিজ পকেটে পুরে কিউইরা। শেষ ম্যাচে দাপুটে জয় দিয়ে বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করলো উইলিয়ামসনের দল। ওয়ানডে সিরিজের পর বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ড তিন ম্যাচের টি-টুয়েন্টি এবং দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে মুখোমুখি হবে। আগামী মঙ্গলবার একই মাঠে প্রথম টি-টুয়েন্টিতে মুখোমুখি হবে দল দুটি।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড:

বাংলাদেশ ৫০ ওভারে ৯/২৩৬ (তামিম ৫৯, ইমরুল ৪৪, নুরুল ৪৪; হেনরি ২/৫৩, স্যান্টনার ২/৩৮, উইলিয়ামসন ১/২৪)

নিউজিল্যান্ড ৪২.১ ওভারে ২/২৩৯ (ব্রম ৯৭, উইলিয়ামসন ৯৫, নিশাম ২৮; মুস্তাফিজ ২/৩২)

ফলাফল: নিউজিল্যান্ড ৮ উইকেটে জয়ী

ম্যাচ সেরা: কেন উইলিয়ামসন

সিরিজ: নিউজিল্যান্ড ৩ ম্যাচ সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে জয়ী।

Comments are closed.