টেকনাফে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় ২০ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার

ইমাম খাইর, ওয়ান নিউজঃ
টেকনাফ বাহারছরা পুলিশ চেকপোস্টে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো: রাশেদ হত্যার ঘটনায় ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীসহ ২০ জন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
রবিবার (২ আগস্ট) সকালে তাদেরকে পুলিশ লাইনে ন্যস্ত করা হয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন।
তিনি জানান, অবসরপ্রাপ্ত একজন সেনা কর্মকর্তা নিহতের ঘটনার জেরে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। ঘটনার তদন্তের স্বার্থে টেকনাফের বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত আলিসহ ২০ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, প্রত্যাহার করা পুলিশ সদস্যদের ইতোমধ্যে কক্সবাজার পুলিশ লাইনে নিয়ে আসা হয়েছে। বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রে নতুন করে আরো ২০ পুলিশ সদস্যকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
সুত্র মতে, গত ৩১ জুলাই রাত্রে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোডে কক্সবাজারমূখী সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো: রাশেদ এর প্রাইভেট কারটি টেকনাফের বাহারছরা শাপলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রে পৌঁছালে গাড়িটি তল্লাশি করা নিয়ে তর্ক হয়। তখন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো: রাশেদ উপর দিকে হাততুলে তাঁর কার থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে তাঁকে তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী গুলি করে হত্যা করে বলে সেনা সদর থেকে গণমাধ্যমে প্রেরিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনার বিষয়ে অবহিত হতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি (অপারেশন্স এন্ড ক্রাইম) জাকির হোসেন এখন কক্সবাজার অবস্থান করছেন।
এ ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট (এডিএম) মোঃ শাজাহান আলিকে আহবায়ক ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন ও রামু সেনানিবাসের প্রধানের একজন প্রতিনিধিকে সদস্য করে গত ১ আগস্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে।
কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নাম চেয়ে একটি চিঠি এসেছিল। পুলিশ সুপার আমার (ইকবাল হোসেন) নাম সংযুক্ত করে সেই চিঠির জবাব দিয়েছেন। পরবর্তী চিঠি আমি এখনও হাতে পাইনি। চিঠি হাতে পেলেই আমরা তদন্ত কাজ শুরু করবো।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুলিশের গুলিতে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কারণে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও তদন্ত কমিটিকে ঘটনার যথাযথ কারণ অনুসন্ধান করে নিরপেক্ষভাবে যার যা দায় তা নিরূপণ করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সেজন্য প্রয়োজনীয় মতামত দিতেও বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়ায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে সাবেক মেজর সিনহা রাশেদ খান নিহত হন।
ঘটনার পর পুলিশের দাবি, ওই সেনা কর্মকর্তা তার ব্যক্তিগত গাড়িতে এক সঙ্গীসহ টেকনাফ থেকে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন।
চেকপোস্টে পুলিশ গাড়িটি থামিয়ে তল্লাশি করতে চাইলে সেনা কর্মকর্তা বাধা দেন। এ নিয়ে তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে সেনা কর্মকর্তা তার সঙ্গে থাকা পিস্তল বের করলে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়।
পুলিশ বলছে, তারা গাড়িটি তল্লাশি করে ৫০টি ইয়াবা ট্যাবলেট, কিছু গাঁজা ও দুটি বিদেশি মদের বোতল উদ্ধার করেছে।
এ ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ নিহত সেনা কর্মকর্তার পিস্তলটি জব্দ করেছে।
জানা গেছে, একটি তথ্যচিত্র ধারণের কাজে আরও চার জন সঙ্গীসহ এক মাস ধরে হিমছড়ির নীলিমা রেস্ট হাউজে অবস্থান করছিলেন মেজর (অব.) সিনহা রাশেদ খান।
তিনি ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ট্রাভেল শো ‘জাস্ট গো’ নামে একটি প্রোগ্রাম তৈরি করছিলেন।
ঘটনার দিন তারা বাহারছড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় রাতে ভিডিও করার জন্য একটি পাহাড় দেখতে আসেন। লাইটের আলো দিয়ে পাহাড় দেখার সময় স্থানীয় লোকজন তাদের ডাকাত ভেবে পুলিশে খবর দেয়। এই পরিস্থিতিতে মেজর সিনহা ও সিফাত পাহাড় থেকে নেমে রিসোর্টে ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা দেয়। পথে বিজিবির চেকপোস্টে পরিচয় দিয়ে চলে এলেও পুলিশের চেকপোস্টে তাদের গাড়ি তল্লাশি করতে চাইলে কথা কাটাকাটি হয়।
এমন সময় টেকনাফ বাহারছরা তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা। এ ঘটনায় তোলপাড় চলছে।

Comments are closed.