রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় স্থানীয় জনসাধারনের অবদান যেন আমরা ভুলে না যায়

জাহাঙ্গীর আলমঃ

সহকারী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট।

২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট ঠিক কোরবান ঈদের প্রথম দিন হতে সীমান্ত দিয়ে দল বেঁধে আসতে থাকে মায়ানমার হতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি। কেউ খুশিতে নিজ মাতৃভ‚মি কিংবা ঘর বাড়ি ত্যাগ করে অন্য দেশে আসেনা এইটাই স্বাভাবিক। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত মায়ানমারের উপারে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। এই সহিংসতায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে মায়ানমার জান্তা বাহিনী গুলি করে পাখির মত হত্যা করেছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠি কোরবার ঈদের গরুর মাংস নিজেরা না খেয়ে আগত রোহিঙ্গাদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছে। নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে তাদের সহযোগিতা করেছে। স্থানীয়দের ত্যাগ কিংবা অবদান অস্বীকার করার কোন সুযোগ আমাদের নেই। স্থানীয় এনজিও গুলো নিজেদের অর্থে প্রথম খাদ্য, পানি এবং শুকনো খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেছে। নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আস্তে আস্তে দাতা সংস্থা গুলো আসা শুরু করল এবং তাদের সহযোগিতার হাত প্রসারিত করল।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো: আলী হোসেন স্যার এবং তৎকালীন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মহোদয় জনাব,আবুল কালাম স্যারের অবদান কোন ভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। সংকট মোকাবেলায় জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে চেষ্টা করেছেন। দেশের সুনাম অক্ষুন্ন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। স্থানীয়দের ক্ষোভ নিরসন করার জন্য সভার পর সভা করে গেছেন। তৎকালীন পুলিশ সুপার মহোদয় এবং উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব, মঈন উদ্দিন মহোদয় মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করেছেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দখলে ছিল। শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সময় লেগেছিল দুই বছরের ও বেশী সময়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ গুলো ও ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দখলে। যার ফলে স্থনীয় বিচার ব্যবস্থা ঝিঁমিয়ে পড়েছিল। ধীরে ধীরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ গুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক হলো। বিশাল রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের ভ‚মিকা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবেনা। তাদের অবদান মনে রাখার মত।
ধীরে ধীরে ক্যাম্প গুলোর দায়িত্ব নেওয়া শুরু করল শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়। প্রতিটি ক্যাম্পে নিয়োগ দেওয়া হলো ক্যাম্প ইনচার্জদের। তাদের দক্ষতার কারনে অতি অল্প সময়ে হয়ে ওঠলো ক্যাম্প গুলো সাজানো এবং গুছানো। সবকিছুতে ছিল পরিকল্পনা এবং দক্ষতার ছোঁয়া। উল্লেখ্য যে, জেলা প্রশাসনের সব সময় একটা ইতিবাচক ভ‚মিকা ছিল। এনজিওদের সাথে সমন্বয় এর ক্ষেত্রে দারুণ ভ‚মিকা ছিল। জেলা প্রশাসন প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছিল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। তাদের সমন্বয়ের কারনেই সংকট মোকাবেলা অনেকটা সহজ হয়েছিল। অবশ্যই এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।

ফাইল ছবি

স্থানীয় রাজনীতিবিদদের ভুমিকা ছিল সাহসী। তাঁরা সাহসী ভ‚মিকা পালন করেছে। সবার সাথে সমন্বয়ের কাজটি করেছেন। স্থানীয়দের ক্ষোভ নিরসন করে সবাইকে ধৈর্য্য ধারনের জন্য বারবার আহবান করেছেন। জেলা আওয়ামিলীগের সম্মানিত সভাপতি জনাব, এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা এবং সাধারন সম্পাদক জনাব, মুজিবুর রহমান সংকট কালীন সময়ে বিশাল ভ‚মিকা রেখেছেন। জেলার সংসদ সসদ্যরা ভ‚মিকা রেখেছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সবাই দিন রাত কাজ করে আজকের এই অবস্থান তৈরী হয়েছে। আমাদের মত এত সাজানো গোছানো ক্যাম্প পৃথিবীর কোথাও নেই।
পৃথিবীর সকল সেলিব্রেটি আমাদের উখিয়া টেকনাফের ক্যাম্প গুলো পরিদর্শন করেছেন রোহিঙ্গাদের সুখ,দু:খের কথা শোনেছেন এবং বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। এত গুলো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া এইটা পৃথিবীর ইতিহাসে নজীর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সে নজীর স্থাপন করেছেন। মাদার অফ হিউম্যানিটি হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন। সারা পৃথিবীতে প্রশংসিত হয়েছেন।

কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক জনাব, রেজাউল করিম চৌধুরী আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একজন উন্নয়ন কর্মী। পৃথিবীর ২০০টির ও বেশী দেশে তিনি উন্নয়ন কর্মী হিসেবে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যোগ দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ও বিভিন্ন সময় সফর সঙ্গী হিসেবে গিয়েছেন। কক্সবাজারের সন্তান হিসেবে সবসময় কক্সবাজারের প্রতি আলাদা একটি টান কিংবা আন্তরিকতা আছে। রোহিঙ্গা আগমনের প্রথম দিন হতে তাঁর নির্দেশনায় আমরা কোস্ট ট্রাস্টের কর্মীরা জেলা এবং উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করেছি। রান্না করা খাবার বিতরণ করেছি রোহিঙ্গাদের মাঝে। প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছি হাজার হাজার রোহিঙ্গার মাঝে।
স্থানীয় এনজিও এবং স্থানীয় লোকজনের অবদানের কথা তিনি তোলে ধরেছেন দেশে বিদেশে। ২০১৭ হতে ২০১৯ পর্যন্ত ৫০টির ও বেশী সভা-সেমিনার করেছে কোস্ট ট্রাস্ট। যেখানে স্থানীয়রা তাদের মনের কথা তোলে ধরার সুযোগ পেয়েছিল। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের লোকজন তাদের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করার করার একটা স্পেস পেয়েছিল। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমাধান এসেছিল এই সকল সভা-সেমিনার হতে।
স্থানীয় জনসাধারনের অবদানের কথা মনে না রাখলে সকল ভাল কাজ শেষ হয়ে যাবে।
চলবে—-।

Comments are closed.