সমুদ্রের গর্জন, পাহাড়ের কান্না, ভূমিহীন মানুষের হাহাকার!

IMG_20191205_193029.jpg

 

সৃষ্টিকর্তার নিপুণ হাতে গড়া অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সমুদ্র আর পাহাড়ের যুগলবন্দী কক্সবাজার তার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত যার দৈর্ঘ্য ১২০ কিঃমিঃ এর অধিক। প্যানোয়া, পালঙ্কি নাম থেকে আজকের কক্সবাজার।

বিশ্বের বিস্ময় হওয়ার কথা এই কক্সবাজার। অযোগ্য ও দূর্নীতিপরায়ন নেতৃত্বের হাতে পড়ে ময়লা আবর্জনা ও খানাখন্দের শহরে পরিনত হয়েছে প্রিয় কক্সবাজার। অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মরণ ডেকে আনছে আমাদের জন্য।কর্ম ও ভূমিহীন করে দিচ্ছে গোটা জেলার মানুষকে।

আমাদের হাতে কি নিরাপদ এই জেলা, সমুদ্র সৈকত,নদী, পাহাড়, জলরাশি, জীববৈচিত্র্য, মানব সভ্যতা ? আজ সবটাই হুমকির সম্মুখীন।

দখলের পর দখলে আজ বিলীন হওয়ার পথে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত আর বালিয়াড়ি।আজ বিলুপ্তির পথে সমুদ্র লতাসহ বহু জীববৈচিত্র্য। যারা এই সমুদ্র পাড় ও তার জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার দায়িত্বে তারাই যেন বেশী বেশী ধ্বংস করছেন। রক্ষক পরিনত হয়েছে ভক্ষকে।

দূর্বল ও দূর্নীতিপরায়ন নেতৃত্ব, রোহিঙ্গা সমস্যা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প, লোভী প্রশাসন সৃষ্টিকর্তার অপার সৃষ্টিকে আজ ধংসের দ্বার প্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।

রোহিঙ্গা বিপদ আজ আমাদের মাথার উপর।সারা পৃথিবী দূর থেকে দেখছে আর রোহিঙ্গাদের জন্য মানবতা দেখাচ্ছে। কিন্তু পিষ্ট হচ্ছি আমরা, কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ। সাড়ে বাইশ লক্ষ জনসংখ্যার এই জেলায় নতুন পুরাতন মিলিয়ে প্রায় পনেরো লক্ষ রোহিঙ্গা রিফিউজি। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা আজ মূল স্রোতের সাথে মিশে গেছে। জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায় জ্ঞান দিচ্ছেন, মানবতার বাণী শোনাচ্ছেন, সহানুভূতি দেখাচ্ছেন কিন্তু দায়িত্ব নিচ্ছেন না কেউ। একজন রোহিঙ্গা ও আজ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত যায়নি। পৃথিবীর কোন দেশ একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের দেশে আশ্রয় দেওয়ার আগ্রহ দেখায়নি। সমুদ্র পাড়ের এই জেলার মানুষেরই যেন একমাত্র দায় মানবতা দেখানোর।

কক্সবাজারের মানুষ এই ভার আর একা সইতে পারছেনা। হয় সবাই মিলে ওদের ফেরত পাঠান মিয়ানমারে, না হয় ভাগ করে নিয়ে যান অন্য কোন দেশে, অন্য কোন জেলায়। আমাদের ক্ষমা করুন,আমরা কক্সবাজার জেলার মানুষ একা আর মানবতা দেখাতে পারছিনা।

সমস্ত রোহিঙ্গা যেমন এখন কক্সবাজারে, দেশের সমস্ত সরকারি বেসরকারী সংস্থা গুলোও সে সুবাদে এখন কক্সবাজারে।সবাই কক্সবাজারের জমির জন্য মরিয়া।যাদের অফিস করার জন্য এক একর জমির প্রয়োজন তারা চাইছেন একশো একর জমি এবং নিয়ে নিচ্ছেন সেই জমি নানাভাবে। যেন এই জেলা তাদের পূর্ব পুরুষের তালুক।পর্যটন মোটেলগুলো আজ এনজিওর অফিস আর গ্যারেজে পরিনত হয়েছে। কক্সবাজারের স্হায়ী মানুষগুলো আজ ভূমিহীন হওয়ার পথে।

রোহিঙ্গা রিফিউজির মতো কক্সবাজারের মানুষ ও যেন বঙ্গোপসাগরে ছোট্ট ডিংগী নিয়ে অজানার পথে পাডি দিবে।রোহিঙ্গার পাশে বাংলাদেশ ছিল, কক্সবাজারের মানুষ ছিল।আজ ভূমিহীন কক্সবাজারের মানুষের পাশে কে থাকবে ? উদ্বাস্তু কক্সবাজারের মানুষকে কে আশ্রয় দিবে ?

মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প একটি হলে সওয়া যেতো।মহেশখালি সহ কক্সবাজারে নাকি সতেরটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হবে।এতো এতো বিদ্যুৎ প্রকল্প আমরা চাইনা। আমরা চেয়েছিলাম ডিপ সি পোর্ট,আমরা চেয়েছিলাম পর্যটন খাতের উন্নয়ন, আমরা চেয়েছিলাম কক্সবাজারের সমুদ্রের সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা।

পৃথিবী জুড়ে বন্ধ হচ্ছে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প , আমরা চালু করছি। সুন্দরবনসহ গোটা বিশ্ব কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভার সইতে পারছেনা। আমরা কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ এই ভার কিভাবে সইবো ? এই বিষ কিভাবে গ্রহন করবো আমরা ? দেশের উচ্চ আদালত যদি পরিবেশ দূষণের দায়ে ইট ভাটা বন্ধ করে দিতে বলে আর পরিবেশ রক্ষার জন্য সরকার ও ইট ভাটা বন্ধ করার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় ২০২৫ সালের মধ্যে সারা দেশে ইট ভাটা বন্ধে একমত হয়ে বিকল্প ইট তৈরির কার্যক্রম হাতে নেয়।তবে লক্ষ লক্ষ গুণ বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনকারী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর আশপাশে আমরা কিভাবে জীবন ধারণ করবো ?

দয়া করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। না হয় অন্য কোথাও সরিয়ে নিন।কয়লা বিদু্ৎ প্রকল্প আমরা চাইনা। প্রয়োজনে ব্যপকভাবে সৌর বিদুৎ উৎপাদন করুন। বিভিন্ন সংস্থার নামে ব্যাপকভাবে জমি অধিগ্রহণ বন্ধ করুন । অযোগ্য ও দূর্নীতিবাজ নেতৃত্বের হাত হতে কক্সবাজারকে রক্ষা করুন ।

সাগর-পাহাড়ের অপূর্ব মিতালী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, নানা ধর্মের-বর্ণের মানুষের অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থান, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্যের সমাহারসহ প্রকৃতির ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যের কারণে কক্সবাজার একেবারেই অনন্য। এই কক্সবাজারকে স্বমহিমায় টিকে থাকতে দিন। প্রান ভরে নিশ্বাস নিতে চাই আমাদের আগামী প্রজন্মকে সাথে নিয়ে।সমুদ্র সৈকত, সামুদ্রিক মাছ, লবন,মিষ্টি পান- সুপারি, শুটকি, বার্মিজ মার্কেট, অগ্গমেধা ক্যাং,আদিনাথ মন্দির/পাহাড়সহ আমাদের ঐতিহ্যগুলো নিয়ে আমাদেরকে আমাদের মতো করে বেঁচে থাকতে দিন ।

রাশেদুল ইসলাম 

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব