সিঙ্গাপুরে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কয়েদিদের ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যান যে সন্ন্যাসিনী

Sister-Jerad.jpg

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ উনিশশো একাশি সালে সিঙ্গাপুরের একজন ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এক নারী কয়েদির সাথে চিঠি বিনিময় শুরু করেন। এই পত্রালাপ চলতে থাকে পরবর্তী সাত বছর ধরে।

এই নান হলেন সিস্টার জেরার্ড ফার্নান্ডেজ এবং কয়েদি হলেন টান মুই চু। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে নৃশংস এক হত্যাকাণ্ডের মামলায় টান মুই চু’র ফাঁসির আদেশ হয়। সিস্টার জেরার্ড এক সময় টান মুই চু’কে স্কুলে পড়িয়েছেন।

সিস্টার জেরার্ড বলছেন, টান ছিলেন এক সাদাসিধে মেয়ে। ধর্মপরায়ণ এক পরিবার থেকে তিনি কনভেন্ট স্কুলে পড়তে এসেছিলেন।

টান ও তার স্বামী এড্রিয়ান লিম, এবং স্বামীর রক্ষিতা হো কাহ্ হং এর বিরুদ্ধে দুটি শিশুকে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং তাদের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

সিস্টার জেরার্ড ফার্নান্দেজ, ৮১, সিঙ্গাপুরের টোয়া পেও খ্রিস্টান মঠে বাস করেন।

“টান জীবনে বড় ধরনের ভুল করেছিল,” বলছেন স্বল্পভাষী এই ৮১-বছর বয়সী সন্ন্যাসিনী, “তার খবরটা প্রথম শোনার পর আমার খুব খারাপ লেগেছিল। তখনই আমার মনে হয়েছিল যে করেই হোক তার সাথে দেখা করতে হবে।”

এরপর বেশ কয়েক বছর ধরে সিস্টার জেরার্ড টান মুই চু’র সাথে দেখা করার জন্য কারাগারে যান।

দু’জনে গভীর রাত পর্যন্ত একত্রে উপাসনা করেন। সিস্টার জেরার্ড বলছেন, এর মাধ্যমে দু’জনের মধ্যে একটা আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়। দু’জন পরস্পরকে আরো ভালভাবে বুঝতে পারেন।

“তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াতেই আমি সেখানে গিয়েছিলাম, এবং সে-ও জানতো সে আমার সাথে মন খুলে কথা বলতে পারতো,” বলছেন তিনি, “আমার মনে হয় তার মনের ভেতরের কারাগার থেকে সে মুক্তি পেয়েছিল।”

টান মুই চু’র ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয় ১৯৮৮ সালের ২৫শে নভেম্বর। তার সাথে সিস্টার জেরার্ডের দেখা হয়েছিল সেদিন সকালে।

“একটা লোক সারা জীবনে অনেক খারাপ কাজ করলেও, তার জীবনের দাম কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি,” বলছেন সিস্টার জেরার্ড, “পাপ যত বড়ই হোক না কেন মর্যাদা নিয়ে মৃত্যুর অধিকার সব মানুষের রয়েছে।”

সিঙ্গাপুরে খুন এবং মাদক-সম্পর্কিত অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

জীবনের শেষ সকালে টান মুই চু একটি নীল রঙের পোশাক পরেন। তার জুতার রঙও ছিল নীল। “সে দিন সে ছিল বেশ শান্ত,” বলছেন সিস্টার জেরার্ড। এরপর এই দুই নারী হাতে হাত ধরে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান।

“সে যখন ফাঁসির মঞ্চের ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছিল, তার পায়ের শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। ফাঁসি কাঠের লিভারটি যখন টেনে ধরা হলো আর ট্র্যাপ ডোরটি যখন ঘটাং করে খুলে দেয়া হলো, সেটা আমি অনুভব করতে পারছিলাম। ঠিক তখনই আমি টের পেলাম সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।”

সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত চাঙ্গি বিমানবন্দর থেকে একটু দূরে এই বিশাল চাঙ্গি কারাগার। দেশের সবচেয়ে কুখ্যাত অপরাধী এবং মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কয়েদিদের এখানে রাখা হয়।

এই কারাগারেই টান মুই চু’র মতো আরো ১৮ জন কয়েদিকে সিস্টার জেরার্ড ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে গেছেন।

“মৃত্যুদণ্ডের বাস্তবতা আসলে কেউই সহজে স্বীকার করে নিতে পারে না,” বলছেন তিনি।

“নিজের ভাগ্যকে মেনে নিতে সময় লাগে। আর এটা স্বীকার করে নিতেও অনেক বেদনা তৈরি হয়।”

সিস্টার জেরার্ড গত ৪০ বছরে ধরে কারাগারের বন্দীদের সাথে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন ঈশ্বরই তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। বিবিসি