একটি ঝিনুক প্রতিদিন গড়ে ২৪ থেকে ৯৫ গ্যালন পানি পরিশুদ্ধ করে!

FB_IMG_1572669665554.jpg

 

আহমদ গিয়াস
ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার্স বা বাস্তুসংস্থান প্রকৌশলী হিসাবে পরিচিত সামুদ্রিক শামুক-ঝিনুক হারিয়ে যাচ্ছে দেশ থেকে। গত ৩ দশকে বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সৈকত থেকে ঝিনুকের আবাসস্থল প্রায় আশি শতাংশই হারিয়ে গেছে। এরজন্য পরিবেশ দুষণ, আবাসস্থলের পরিবর্তন, নির্বিচারে ঝিনুক আহরণসহ নানা কারণকে দায়ী করা হচ্ছে। একটি ঝিনুক প্রতিদিন গড়ে ২৪ থেকে ৯৫ গ্যালন পানি পরিশুদ্ধ করে। সমুদ্রের ‘পানি পরিস্কারক’, ‘সৈকতের পাহারাদার’সহ নামে পরিচিত ঝিনুককে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য বা প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য অঙ্গ বলে বিবেচনা করা হয়। ঝিনুক হারিয়ে গেলে সমুদ্রের অসংখ্য প্রাণি বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
দেশ থেকে সামুদ্রিক ঝিনুক হারিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে কক্সবাজারস্থ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিউিটের (বিএফআরআই) সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার আলী বলেন, কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মোহনা থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক উপকুলে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ঝিনুকের আবাসস্থল রয়েছে। এসব অঞ্চলের ঝিনুকে মুক্তাও পাওয়া যায়। প্রায় এক যুগ আগের এক জরীপে দেশে ১৪২ প্রজাতির সামুদ্রিক সামুদ্রিক ঝিনুক ও ১৫৯ প্রজাতির শামুক শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৩০ প্রজাতির সামুদ্রিক ঝিনুক থেকে মুক্তা পাওয়া যায়। আর এরমধ্যে ৩টি সামুদ্রিক প্রজাতির ঝিনুক বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে ঝিনুক থেকে মুক্তা উৎপাদনও করা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে নির্বিচারে ঝিনুক আহরণ, পরিবেশ দুষণ ও আবাসস্থলের পরিবর্তনসহ নানা কারণে দেশ থেকে ঝিনুকের আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
পরিবেশে ঝিনুকের গুরুত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বলেন, একটি ঝিনুক প্রতিদিন গড়ে ২৪-৯৫ গ্যালনের উপরে পানি পরিশুদ্ধ করে। পানির নাইট্রেটস ও অ্যামোনিয়া শোষন করে পানিকে বিভিন্ন প্রাণির বসবাসের উপযোগী রাখে। ঝিনুক তাদের অভ্যাসগত কার্যক্রমের মাধ্যমে এমনভাবে কাঠামো তৈরি করে যাতে সমুদ্র উপক‚লে জোয়ার প্রবাহ, তরঙ্গ ক্রিয়া এবং পলল গতিবেগ প্রভাবিত হয়। সামুদ্রিক প্রবাহ থেকে মাটি ক্ষয় রোধ করে সমুদ্রের তীর গঠনে খুব গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভ‚মিকা পালন করে ঝিনুক। এ কারণে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য ঝিনুকের ভ‚মিকা অপরিহার্য। ঝিনুক না থাকলে সমুদ্রের অনেক প্রাণি টিকে থাকতে পারত না।
ঝিনুক থেকে অলংকার ও গৃহ সাজসজ্জাকরণ উপকরণ ছাড়াও ঝিনুকের খোলস থেকে চুন, পোল্ট্রি ও ফিশ ফিড তৈরি হয়। মাছ ও প্রাণির ক্যালসিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ঝিনুক। এছাড়া ঝিনুকের মাংসল অংশ চিংড়ি, মাছ ও হাঁস-মুরগীর খাবার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো ঝিনুকের মাংস খেয়ে থাকে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের প্রফেসর, সমুদ্র বিজ্ঞানী ড. শাহাদৎ হোসাইন বলেন, সামুদ্রিক ঝিনুকের মধ্যে কিছুর খোলস বা সেল অত্যন্ত ক্যালসিয়াম যুক্ত যা অসম বিভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। এগুলো মানুষের খাদ্য তৈরী থেকে শুরু করে মুক্তা উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন দেশে চাষ করা হয়ে থাকে। খাদ্যপযুক্ত ঝিনুকে গøাইকোজেন, লিপিড, প্রোটিন, ভিটামিন এ বি ডি ছাড়াও বিভিন্ন খনিজ লবন বিদ্যমান। উইন্ডোপ্যান ওয়েস্টারের (ঝিনুক) স্বচ্ছ খোলস দিয়ে বিভিন্ন ডেকোরেটিভ শো-পিস তৈরী করা হয়ে থাকে। ঝিনুক খোলসের নির্যাস থেকে উন্নত দেশে আয়ুবের্দিক ও হোমিও প্যাথিক ঔষুধ তৈরী করা হয়। জাপান, থাইল্যান্ড, মালোয়শিয়া, শ্রীলংকা, চায়নাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও রয়েছে।
তবে প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে ঝিনুক সংগ্রহের কারণে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ায় দেশ থেকে ঝিনুক হারিয়ে যাচ্ছে বলে জানান কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার আলী।
তিনি বলেন, ঝিনুকের আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়ার কারণে জোয়ারের প্রবাহে সমুদ্র উপক‚লের মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক থেকে মুক্তার প্রাপ্যতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে।
তিনি জানান, বিশ্বের প্রায় স্বল্প উষ্ণপ্রধান ও উষ্ণপ্রধান সামুদ্রিক জলাশয় ঝিনুকের আবাসস্থল। এরা সমুদ্রের স্বল্প গভীর হতে ৮০ মিটার গভীর এলাকায় বিচরণ করে। মানুষ ও জলজ পরিবেশ উভয়ের জন্যই ঝিনুক খুবই গুরুত্বপুর্ন। জলাশয় থেকে শৈবাল, জৈব পদার্থ এবং দ্রবীভুত ক্ষতিকারক উপাদান যেমনঃ ভারী ধাতু দুরীকরণে ঝিনুকের ভুমিকা রয়েছে। তাই ঝিনুক প্রাকৃতিক পানি পরিস্কারক হিসেবে কাজ করে। জলজ খাদ্য শৃঙ্খলের ক্ষেত্রেও ঝিনুক একটি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান এবং এরা জলজ খাদ্য শিকলের বিভিন্ন স্তরের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করলে পরিবেশের ক্ষতি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গত ৩ দশকে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সৈকত থেকে ঝিনুকের প্রায় আশি শতাংশ আবাসস্থলই হারিয়ে গেছে। এক সময় শহরের লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতে প্রচুর পরিমাণ ঝিনুক দেখা যেত। কিন্তু শহরে এখন ঝিনুকের আবাস্থল নেই বললেই চলে। একইভাবে কলাতলী থেকে টেকনাফ- সেন্টমার্টিন পর্যন্ত সৈকতেও আগের তুলনায় খুব কমই ঝিনুক পাওয়া যাচ্ছে। এখন সৈকতে মরা ঝিনুক পাওয়া না যাওয়ায় অনেকেই পানি ও মাটির নীচ থেকে জীবন্ত ঝিনুক তুলে এনে বিক্রি করছে। কক্সবাজারের বাঁকখালী ও সোনাদিয়া মোহনা, হিমছড়ি, পেঁচারদ্বীপ, ইনানী, মনখালী, শাপলাপুর, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন উপক‚ল থেকে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে শামুক ঝিনুক।
শহরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোর্শেদ আজাদ আবু বলেন, মাত্র ৩ দশক আগেও ঝিনুকের জন্য আমরা খালি পায়ে শহরের সমুদ্র সৈকতে হাটতে পারতাম না। অনেক সময় খালি পায়ে সৈকতে নামতে গিয়ে পাও কেটে যেত। আর এখন সৈকতে আগের ঝিনুকের কদাচিৎ দেখা মেলে।


ঝিনুক নিয়ে নেদারল্যান্ডে উচ্চতর গবেষণা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের সহকারি অধ্যাপক ড. মো. শাহনওয়াজ চৌধুরী। তিনি কস্তুরা প্রজাতির ঝিনুকের সাহায্যে উপক‚লে টেকসই বাঁধ তৈরি করা যায় জানিয়ে দৈনিক আজাদীকে বলেন, নেদারল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের অর্জিত প্রযুক্তির সাহায্যে আমাদের দেশের উপক‚লেও সেই ধরনের বাঁধ তৈরি করা যায় কীনা তা নিয়ে আমরা গত প্রায় ৫ বছর ধরে গবেষণা করছি।
পরিবেশে ঝিনুকের প্রভাব ও ঝিনুক থেকে মুক্তা উৎপাদন নিয়ে গবেষণা করছেন কক্সবাজারস্থ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিউিটের (বিএফআরআই) সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশরাফুল হক।
তিনি বলেন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের অস্তিত্ব নির্ভর করছে শামুক-ঝিনুকের টিকে থাকার উপর। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দূষণ বেড়ে বেড়ে যাওয়ায় মাঝেমধ্যেই ঝিনুকের মড়ক লাগছে আর শত শত টন মরা শামুক-ঝিনুক ক‚লে ভেসে আসছে। গত ৭ বছরে কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়ায় এই ধরনের ঘটনা পর পর দুইবার দেখা যায় বলে জানান তিনি।
ঝিনুকের আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি দেশের তথা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের জীববৈচিত্র্যের জন্য এক ভয়ংকর হুমকী বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের পরিচালক, কক্সবাজারের সন্তান প্রফেসর জাহেদুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, কক্সবাজার সৈকতের জীববৈচিত্র্য দ্রæত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তা রক্ষার জন্য অচিরেই উদ্যোগ নিতে হবে।
সমুদ্র সৈকত থেকে বেপরোয়াভাবে পাথর ও ঝিনুক উত্তোলনের কারণে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত কারণে ভ‚মিক্ষয়ের শিকার হয়ে গত ২৮ বছরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী থেকে হিমছড়ি পেঁচারদ্বীপ পর্যন্ত এলাকার ৫শ মিটারেরও বেশি জমি সমুদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ এলাকার বিস্তীর্ণ ভ‚মিও একইভাবে এখন সাগরগর্ভে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
কলাতলীর বয়োবৃদ্ধ কৃষক নফু মাঝি জানান, কলাতলী সাগর তীরে তাদের বাপ দাদার যে বসত ভিটেটি ছিল তা বর্তমান সমুদ্রের কিনারা থেকে অন্তত ৫ শত মিটার দূরে ছিল। সেখানে তাদের চাষাবাদের জমিও ছিল। এখনও সেই জমির খতিয়ান ও রেকর্ডপত্র রয়েছে।
নির্বিচারে ঝিনুক আহরণসহ নানা কারণে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকত এবং সোনাদিয়া ও সেন্টমার্টিনে পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি হলে ২০০৫ সালে এসব এলাকাকে পরিবেশ আইনে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। এই আইনে সমুদ্র উপক‚ল থেকে শামুক, ঝিনুক, প্রবাল, বালি, পাথর ইত্যাদি তোলা নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এই আইনের তেমন কোন প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে বলে জানান পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ইয়েস কক্সবাজার’র সভাপতি ইব্রাহিম খলিল মামুন।
তিনি বলেন, কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপক‚ল থেকে অবৈধভাবে শামুক ঝিনুক তোলা হচ্ছে। এরফলে ভ‚মি ক্ষয়ের শিকার হচ্ছে কক্সবাজার সৈকত। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তর বা অন্য কোন প্রশাসন এ অবৈধ কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. হুমায়ূন কবীর বলেন, আমাদের লোকবল সংকট রয়েছে, তবু আমরা খবর পেলে ঝিনুক আহরণকারীদের তাড়া করি।
ঝিনুকের তৈরি সাজসজ্জা সামগ্রী বিক্রির জন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গড়ে ওঠেছে কয়েকশত দোকান। এখানে ১০টাকা থেকে শুরু করে দশ হাজার টাকা দামের পর্যন্ত ঝিনুকের পণ্য রয়েছে। এছাড়া ঝিনুকের সামগ্রী বিক্রির জন্য শহরে আরো কয়েকশত যুবক ও শিশু ভ্রাম্যমান হকার রয়েছে। এই পেশার সাথে কয়েক হাজার পরিবার জড়িত রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক উৎস থেকে ঝিনুক তোলার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি না করে ঝিনুক চাষের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দেশের মানুষের জীবন জীবিকার উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করেন ড. জুলফিকার আলীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীরা জানান, বসন্তের শেষে ঝিনুকের ডিম পরিপক্কতা পায় এবং জুন আগস্টে এরা পানিতে প্রজনন করে থাকে। প্রতিটি স্ত্রী ঝিনুক ৭৫ লাখ থেকে ২০ কোটিটি পর্যন্ত ডিম ছাড়ে, যারমধ্যে বেঁচে থাকে মাত্র ১০০০টি।