কক্সবাজার পুলিশ সুপারের বর্ষপূর্তিতে ফেইসবুকে খোলা চিঠি

IMG_20190917_235547.jpg

প্রিয় কক্সবাজারবাসী,
আসসালামু আলাইকুম। পুলিশ সুপার কক্সবাজার হিসেবে আজ ১৭ সেপ্টেম্বর এক বৎসর পূর্ণ হলো। মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা ও সকলের দোয়ায় এই এক বৎসর ভালোভাবেই পার করেছি। যোগদানের পর তিন মাসের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন বড় একটি চ‍্যালেঞ্জ ছিল। আমার সহকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সকলের সহযোগিতায় সেই চ‍্যালেঞ্জ আমরা দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করেছি। আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় চ‍্যালেঞ্জ ছিল বাংলাদেশের মাদকের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার তথা টেকনাফ থানার মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা। মাদকের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে আমরা দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এই অভিযান শুরু করি। এই অভিযান কোন সহজ কাজ ছিল না। অনেক বাধাবিপত্তি, বিরূপ প্রচারনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিভিন্ন গবেষকের মতে বাংলাদেশে বছরে আট থেকে দশ হাজার কোটি টাকার অবৈধ ইয়াবার ব‍্যবসা হয়ে থাকে যার সিংহভাগ কক্সবাজার জেলার মাধ্যমে সারা দেশে পাচার হয়ে থাকে। একসময় যারা কৃষক, লবন মাঠের শ্রমিক, জেলে বা বড়জোর জেলে নৌকার মালিক, ভ‍্যান বা অটো চালক, মাইক্রোবাস চালক বা বাসের চালক ছিল, তারাই ইয়াবা ব‍্যবসার মাধ্যমে রাতারাতি হয়ে গিয়েছিল কোটি টাকা থেকে শুরু করে কয়েক শত কোটি টাকার মালিক। ব‍্যাপক পুলিশী অভিযান এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের মুখে এসব ইয়াবা ব‍্যবসায়ীরা কোনঠাসা হয়ে পরে। অনেকেই আলিশান বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছেন। স্হানীয় জনগণ এসব আলিশান বাড়িঘরের অনেক গুলোকেই ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযান এবং সামাজিক চাপে পড়ে শীর্ষ স্থানীয় ১০২ জন ইয়াবা ব‍্যবসায়ী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ ক‍রেছে। এসব আত্নসমর্পণকারী ইয়াবা ব‍্যবসায়ীদের কাছ থেকে আমরা এই জঘন্য ব‍্যবসার ভিতরের বাইরের অনেক কথাই জানতে পেড়েছি। বড় নেতা, হাজী, মৌলভী, সিআইপি, ভিআইপি বিবেচনায় না গিয়ে যাদের বিরুদ্ধেই ইয়াবা ব‍্যবসায় জড়িত থাকার বা পৃষ্ঠপোষকতার সুস্পষ্ট অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা সাড়াশি অভিযান চালিয়েছি এবং ভবিষ্যতেও সাড়াশি অভিযান চালিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ। কক্সবাজার কারাগারে বর্তমানে প্রায় ৪৩০০ জন বন্দী রয়েছে, এর মধ্যে প্রায় ৩২০০ জন মাদক মামলার আসামি। জেলে পাঠানো আসামীদের মধ্যে মাদক মামলার আসামীর সংখ্যাটাই বলে দিচ্ছে পুলিশসহ সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকের বিরুদ্ধে কি পরিমান তৎপর রয়েছে। ইয়াবার মূল প্রবেশদ্বার টেকনাফের বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ একসময় সামাজিক কর্মকান্ডসহ হাটে বাজারে বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিজেদের অসহায় ভাবতেন, বাইরে কোথাও নিজেদের পরিচয় দিতে কুন্ঠাবোধ করতেন, তারা এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। আমাদের মাদক বিরোধী এই কঠোর অবস্থানকে কক্সবাজার জেলার মাননীয় সংসদ সদস‍্যবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সংবাদ মাধ্যমের সম্মানিত সদস‍্যসহ সর্বস্তরের মানুষ অকুন্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। আমরা এই সমর্থনের জন্য সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

এই জেলায় ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তাদের অবস্থানের কারণে স্থানীয় জনসাধারণ বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হচ্ছে, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছে, তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন বিঘ্নিত হচ্ছে। যখন স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলো, তখনই এই রোহিঙ্গাদের একটা অংশ মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়া শুরু করলো। তারা আবার অনেক সয়য় কিছু স্থানীয় লোকের সহযোগিতা পেয়ে থাকে। এই রোহিঙ্গা ক‍্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করাও আমাদের বিরাট চ‍্যালেঞ্জ।
কক্সবাজারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পসহ প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সাথে সম্পৃক্ত দেশী বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ ব‍্যক্তি, রোহিঙ্গা সমস্যার কারণে প্রতিনিয়ত আগত দেশী-বিদেশী ভিআইপি/ভিভিআইপি এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমাদের ব‍্যস্ত থাকতে হয়। সমুদ্র তীরবর্তী এবং পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এখানে অবৈধ অস্ত্রধারীদের আস্তানা গড়ে তোলার একটা প্রবনতা আছে। এই বিষয়ে আমাদের অবস্থান একেবারেই পরিষ্কার। তাদের পাওয়া মাত্র কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

আমরা কক্সবাজার শহরের যানজট নিরসনে জনবল দ্বিগুণ করেছি। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে পর্যটকদের অতিরিক্ত চাপে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কষ্ট হয়ে যায়। এখানে সুষ্ঠু ট্রাফিক ব‍্যবস্হাপনা শুধুমাত্র পুলিশের উপর নির্ভর করে না। আমাদেরও জনবলের সমস্যা রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রশস্ত রাস্তা ঘাট, অতিরিক্ত অটোরিকশা এবং সরকারি অন‍্যান‍্য প্রতিষ্ঠানের সময়োপযোগী উদ্যোগের অভাবে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে সবসময় কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদান করা সম্ভব হয় না।
অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যথা Facebook, Whatsapp, Viber, Messenger বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অপরাধীদের সম্পর্কে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে থাকেন যা আমাদের আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। আমরা এসব সম্মানিত ব‍্যক্তিদের প্রতি ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। কেউ কেউ আবার তার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য আমাদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে থাকেন। দুই একজন আছেন আমাদের সকল গঠনমূলক কাজেরও সমালোচনা করে থাকেন।
অনেকেই পুলিশের দুই একজন সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করে থাকেন। দুর্নীতি বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা এবং আর দশটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশের বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ জোরেসোরে উচ্চারিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের কোন্ প্রতিষ্ঠান বেশি দুর্নীতি করে বা টাকার অংকে কারা বেশি করেন তা সচেতন নাগরিক এবং গবেষকরা ভালো জানেন। সেই বিষয়ে বিতর্কে না গিয়ে একটি কথাই বলবো, আমি ব‍্যক্তিগতভাবে দুর্নীতি এবং দুর্নীতিবাজ লোকদের প্রচন্ড ঘৃনা করি। অতএব কক্সবাজার জেলার কোন পুলিশ সদস্য দুর্নীতিতে জড়ালে আমাকে অবশ্যই জানানোর জন্য অনুরোধ করছি। উপযুক্ত প্রমাণ পেলে এজেলায় কর্মরত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে আমরা জানি যারা কক্সবাজার থেকে সর্বনাশা ইয়াবা ব‍্যবসা সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়ে শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, যারা আলিশান বাড়ি বানিয়ে এখন আর তাতে ঘুমাতে পারছেন না, যেসব গডফাদার ইয়াবা ব‍্যবসা করতে গিয়ে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন তাদের সুবিদাভোগী পরিবারের সদস্যরা, যারা এখন আমাদের অভিযানের কারণে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং এই অবৈধ ব‍্যবসার মাধ্যমে যারা পরোক্ষভাবে সম্পদ কামিয়েছেন বা সুবিধা নিয়েছিলেন যা এখন আর সম্ভব হচ্ছে না, তারা কখনোই আমাদের সমর্থন করবেন না বা আমাদের সহযোগিতা করবেন না। তারা বরং নানা অযুহাতে আমাদের ছোটখাটো ভুলত্রুটিকে বড় আকারে প্রচার করে আমাদের মাদক বিরোধী অভিযানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে থাকে। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার করা হলেও কিছু লোক তাদের পক্ষে তদবির করেন বা তাদের ভাল মানুষ হিসেবে প্রচার করেন। তাদের এই অশুভ প্রচেষ্টার কারণে আমরা থেমে যাব না ইনশাআল্লাহ। এই গুটিকয়েক ব‍্যক্তির কাছে আমরা পরাজিত হতে পারি না। মাদকের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও সজ্জন ব‍্যক্তি হিসেবে পরিচিত মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে ক্লিন ইমেজের ব‍্যক্তি আইজিপি স‍্যারের নির্দেশনায় আমরা আগামী দিনগুলোতে আরো জোরালোভাবে এই অভিযান অব‍্যাহত রাখবো ইনশাআল্লাহ। মাদকের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ‍্যাত কক্সবাজার জেলার এই দুর্নাম ঘোচাতে এবং দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ সমাজ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাচাতে আমাদের এই কঠোর অভিযান অব‍্যাহত থাকবে। মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাদাবাজ এবং জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় আমরা দলমত নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। দেশকে বাচাতে সকলের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। মাদক নির্মূলে এ জেলায় কর্মরত সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে এবং ঐক্যবদ্ধ আছে। সবশেষে বলবো যতদিন এই জেলায় কর্মরত থাকবো ততদিন সকলকে সাথে নিয়ে আরো দৃঢ়তার সাথে কক্সবাজারবাসীকে সেবা প্রদান করে যাবো- এই অঙ্গীকার ব‍্যক্ত করছি।
শুভেচ্ছা সহ
এ বি এম মাসুদ হোসেন, বিপিএম
পুলিশ সুপার, কক্সবাজার।