সৌদি প্রবাসীদের সুখের দিন শেষ, যাপিত জীবন এখন

received_1568548039949513.jpeg

সৌদি প্রবাসীদের সুখের দিন শেষ, যাপিত জীবন এখন

মোঃ হামিদ জেদ্দা সৌদি আরব

অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কর্মসংস্থানের অভাব, অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধি ও কিছু বাংলাদেশী ট্রাভেল এজেন্সির প্রতারণাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে সৌদি প্রবাসীরা এখন দিশেহারা।
বৈধ-অবৈধ কেউই স্বস্তিতে নেই। ইকামাবিহীন অনেকে পুলিশের কাছে ধরা দিয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন। নতুন আসা অনেকে মরুভূমিতে তাঁবু টানিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। কর্মহীন এসব প্রবাসীদের চোখে একদিকে যেমন কান্না অপরদিকে এসব সমস্যা সমাধানে সৌদিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের উদাসীনতায় ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে অনেক প্রবাসীর মনে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সম্প্রতি কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্খিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে সৌদি আরবেও।
সৌদি আরবে অর্থনৈতিক মন্দায় একের পর এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ও অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা করতে সৌদি সরকার একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কিন্তু তাতে খুব একটা সুফল তো পাওয়া যাচ্ছেই না উল্টো এর প্রভাব প্রবাসীদের মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
কয়েক বছর ধরে সৌদিতে এই অবস্থা বিরাজ করলেও বর্তমানে তা চরম সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। শিগগিরই এই সমস্যার সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখছেন না প্রবাসীরা। তাই চরম হতাশায় দিন কাটছে তাদের।
কাজ না পেয়ে হতাশায় ভুগতে ভুগতে বাংলাদেশীদের মধ্যে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে জমি বিক্রি ও সুদে টাকা সংগ্রহ করে যারা সৌদিতে এসেছেন তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বেশি। কদিন পরপরই আত্মহত্যার খবর আসছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।
সৌদিতে যারা নতুন আসছেন, কর্মহীনতার কারণে তাদের অনেকে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সম্প্রতি এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সৌদিতে এসেছেন নিজেদের ও পরিবারের দুঃখ গোছাতে।
কিন্তু এখন উল্টো দুঃখের মরুভূমিতে পড়েছেন তারা। দালালের মাধ্যমে একেকজন সাড়ে পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা দিয়ে সৌদি এসেছেন, কিন্তু কোনো কাজ পাচ্ছেন না। মাসের পর মাস বেকার থেকে বাসা ভাড়ার টাকা নেই তাদের। একপর্যায়ে দালালরা মরুভূমিতে তাঁবু টানিয়ে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। সপ্তাহে দুই বা তিন দিন একবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তাও সামান্য শুকনো রুটি। দিনের বেলা প্রখর সূর্যতাপ থেকে বাঁচতে মরুভূমি ছেড়ে রাস্তার পাশে খেজুরগাছের ছায়ায় আশ্রয় নেন এসব অভিবাসী। আবার রাতে তীব্র শীতে জবুথবু হয়ে থাকেন। এই অবস্থায় টিকতে না পেরে তাদের অনেকে দালালকে বলেছিল দেশে পাঠিয়ে দিতে, কিন্তু সেজন্য দালাল মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। তাই তারা দেশে ফিরে যেতেও পারছেন না।
নিজেদের দুর্দশার কথা বলার সময় কক্সবাজার জেলা রামু উপজেলার বাসিন্দা আবদুল খালেক অঝরে কাঁদছিলেন। মক্কায় বসির ও তার কয়েক বন্ধুর সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, কাবার হেরেমের আশপাশে ঘোরাঘুরি করলে লোকে মাঝে মধ্যে খাবার দেয়। তাই আপাতত জীবন বাঁচানোর স্বার্থে কিছুদিন মক্কায় হেরেমের আশপাশে থাকা যায় কি না সেই চেষ্টা করছেন তারা।
এদিকে বাংলাদেশী কিছু ট্রাভেল এজেন্সির প্রতারণার স্বীকার হয়ে অনেক প্রবাসী ক্ষোভে ফুঁসছেন। এজেন্সিগুলো শত শত লোক সৌদিতে এনে তাদের ইকামা দিচ্ছে না। ফলে তারা কেোন কাজও করতে পারছেন না। এই অবস্থায় ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত বেকার জীবন কাটাচ্ছেন তারা। ফলে চরম মানুসিক চাপে ভুগতে হচ্ছে তাদের। এই অবস্থায় বার বার দূতাবাসের সাহায্য চেয়েও তা পাচ্ছেন না প্রবাসীরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রিয়াদে আল-ইনজাজ ও মাজন নামের দুটি কোম্পানির ক্যাম্পে শতাধিক বাংলাদেশী প্রবাসী গত প্রায় বছর খানেক ধরে অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। নেই কেোন কাজ, খাবার, এমনকি ইকামাও। কাজ চাইলেই মরুভূমিতে ফেলে আসা হয়। মারধোর তো আছেই। খাবারের জন্য প্রতি মাসে জন প্রতি ৫০ রিয়ালের বেশি দেয়া হয় না। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপর্যাপ্ত। জেলখানার চেয়েও কষ্টের মধ্যে পার করা প্রতিটি দিন যেন এক একটি বছরের মত। জানান ভুক্তভোগীরা।
কথিত ‘গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজ’, ‘রহমানিয়া এজেন্সি’ ও ঢাকার পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডের ‘লাব্বাইক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস’নামক এজেন্সি এসব লোকদেরকে সৌদি এনেছেন। শ্রমিকদের ১৪ শত রিয়াল বেতনসহ ফ্রি থাকা খাওয়ার কথা বলে তাদের সৌদি আনা হয়। কিন্তু এখন উল্টো দেশ থেকে খাবারের জন্য টাকা এনেও কুলকিনারা পাচ্ছেন না এই রেমিটেন্স যুদ্ধারা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে কথা হয় কয়েকজনের সাথে। চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার আমিন, আব্দুল খালেক, হাটহাজারী উপজেলার আব্দুল করিম আবদু শক্কুর কক্সবাজার জেলার মোঃ ইসমাইল৷ এরা সবাই সাতকানিয়ার দালাল বেলালের নির্যাতনের স্বীকার , এরা একেকজন ৬/৭ মাস পর্যন্ত একামার অপেক্ষায় মানবতার জীবন যাপন করতেছে ৷এরা কিছু বললেই উল্টো পুলিশের ভয় দেখিয় হুমকি দিয়ে আসছে কতিপয় দালাল।
‘লাব্বাইক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস’ এর মাধ্যমে তিনি সৌদি এসেছেন নয় মাস হলো। কিন্তু এখনো তার ইকামা দেননি এজেন্সির মালিক। ফলে নয় মাস ধরে কোনো কাজ করতে পারছেন না তিনি। থাকা খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত টাকা-পয়সাও দেওয়া হয় না তাদের। এরই মধ্যে গত ১২ জানুয়ারি আরো কয়েকজনকে সৌদি এনেছেন এই ট্রাভেল এজেন্সি। জসীম জানান, তার মতো অসংখ্যা লোক আছে যারা এই ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি এসেছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ‘লাব্বাইক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস’ এর মালিক জামাল উদ্দিন এই প্রতিবেদকের কাছে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার সব লোকদের তিনি বিভিন্ন কোম্পানিতে ইতোমধ্যেই নিয়োগ করেছেন। তারপরও যদি কেউ ইকামাহীন থাকে তাহলে অচিরেই তার ব্যাবস্থা করবেন বলে জানান জামাল।
এবিষয়ে বার বার দূতাবাসের দারস্ত হয়েও কোনো সুফল পাননি ভুক্তভোগীরা।


এদিকে জেদ্দায় একই কোম্পানির ১২৩ জন প্রবাসী হঠাৎ করেই বেকার হয়ে পড়েছে। ফলে কাজের অভাবে দিশেহারা হয়ে পরেছেন তারা
তাই প্রবাসীদের দাবি দ্রুত চিন্তিত দালালদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে আহবান জানান।