খরুলিয়ায় ‘পুতু’ বাহিনীর কাছে জিম্মি হাজারো মানুষ

received_886274748415234.jpeg

ডেস্ক নিউজ:

‘পুতু বাহিনী’র কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে কক্সবাজার সদর উপজেলার খরুলিয়ার কয়েক গ্রামের সাধারণ মানুষ। এই সন্ত্রাসী গ্রুপটি এক যুগের বেশি সময় ধরে মাদক ব্যবসা ও টাকার বিনিময়ে খুনসহ নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। এই বাহিনীর প্রধান শওকত আলী পুতুর নেতৃত্বে এই দুর্ধর্ষ বাহিনীটি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সর্বশেষ গত ৮ জুলাই দিন-দুপুরে এক টমটম ড্রাইভার থেকে টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয় এই বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। তার দুই ভাই গ্রেপ্তার হলেও পুতু বাহিনীর প্রধান পুতু এক ডজনের বেশি মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, খরুলিয়া বাজারপাড়ার ইউছুপ আলীর পুত্র শওকত আলী পুতুর নেতৃতে প্রায় একযুগ ধরে পুরো খরুলিয়া এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে ‘পুতু বাহিনী’। এ বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছে পুতু ও তার দুইভাই- লিয়াকত ও দেলোয়ার। এদের মধ্যে লিয়াকত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। তারা দু’জনই বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। তবে কোনোভাবে গ্রেপ্তার হচ্ছে না তাদের লিডার শওকত আলী পুতু। তার দু’ভাই গ্রেপ্তার হলেও তিনি নিজেই একচ্ছত্রভাবে সন্ত্রাসী রাজত্ব বলবৎ রেখেছে।

এ বাহিনীটি দীর্ঘ একযুগের বেশি সময় ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা, ভাড়াটে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, মোটর সাইকেল চুুরি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, জমির দখল পাইয়ে দেয়া, কাঠ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্র ব্যবসা ও ডাকাতি চালিয়ে আসছে। এই নিয়ে তাদের প্রত্যকের বিরুদ্ধে ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, সম্প্রতি সময়ে এক গরু ব্যবসায়ী থেকে ১৪ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় পুতু ও তার লোকজন। ঘাটপাড়ার এলাকার ডেকোরেশন ব্যবসায়ী সিরাজের ভাগিনা নানার বাড়িতে বেড়াতে গেলে অস্ত্রের মুখে তার ১৭ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। হোটেল ব্যবসায়ী গফুরের বোন একটি টমটম বিক্রি করে টাকা নিয়ে যাওয়ার পথে দিনদুপুরে অস্ত্রের মুখে টাকাগুলো ছিনিয়ে নেয়। সুতারচরের তরকারি ব্যবসায়ী আবদুল মালেকের ১৬ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। মুন্সিবিলের মোজাম্মেলের এক ছেলের মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। এক ভ্রাম্যমান হকার থেকে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। এক হিন্দু পরিবারে তান্ডব চালিয়ে সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়। আরো একটি হিন্দু পরিবারের ১ একর ৪০ শতক জমি দখল করেছে।

খরুলিয়াবাজারের বাদশা মিয়ার গ্রিলের দোকানও ডাকাতি করেছে দিনদুপুরে। আকস্মিক অনেক ব্যক্তিকে আটকে রেখে জিম্মি করে টাকা আদায় করে। খামারপাড়ার একটি বাড়িতে টাকা পাওনার দাবি করে মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। আরমানের বাড়িতে কর্মরত এক শ্রমিক থেকে পোলট্রি খাদ্যের ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। প্রবাসী শামসুল আলমের নির্মাণাধীন কমিউনিটি সেন্টার থেকে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পুতুসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী ওই ভবনে ইট-পাটকেল ছুড়ে।

এছাড়াও সম্প্রতি সময়ে খরুলিয়া বাজারে বিক্রি করতে আসার পথে গরু লুটসহ আরো অসংখ্যা অপরাধ ঘটিয়েছে এই বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। অন্যদিকে পুতু বাহিনীর সন্ত্রাসীরা গত আট বছর আগে সাবেক জেলা প্রশাসকের গাড়ি ডাকাতি করেছিল। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারান্তরীণ ছিলো পুতু।

জনপ্রতিনিধিরা আরো জানান, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থান থেকে মোট সাইকেল চুরি করে তা পার্টস করে বিক্রি, ঘরে আসর বসিয়ে দিন-দুপুরে ইয়াবা বিক্রি, জমি দখল, গাড়ি ডাকাতি, কাঠ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্র ব্যবসাসহ স্থায়ীভাবে নানা অপরাধ নানা করে বেড়াচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শওকত আলী পুতুর নেতৃত্বাধীন এই ‘পুতু বাহিনী’তে রয়েছে আরো বেশ কয়েকজন দাগী সন্ত্রাসী। তার মধ্যে রয়েছে ডজনের বেশি মামলার আসামি রাজা মিয়া, সাদ্দাম প্রকাশ সাউদ্দ্যা ও মেহেদি। এরাই সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসী। এরাই বিভিন্ন অপরাধ কান্ডে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে।

এ বিষয়ে জানতে শওকত আলী পুতু’র মুঠোফোনে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এতে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজার সদর ঝিলংজা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শরীফ উদ্দীন বলেন, পুতুর পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে বাজারের পূর্বপাশের এলাকাকে জিম্মি করে রেখেছে। এসব মানুষ পুতু বাহিনীর বিরুদ্ধে ভয়ে মুখ খুলতে পারে না। ফলে যুগের পর জিম্মি অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে তারা। তবে দীর্ঘদিন পরে হলেও আমরা চেয়ারম্যানের সহায়তায় এই সন্ত্রাসী বাহিনীটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে শুরু করেছি। কিন্তু পুলিশের সহযোগিতা না পাওয়ায় আমরা পুরোপুরি সফল হতে পারছি না।

ঝিলংজা ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আবদুর রশিদ বলেন, পুতু বাহিনীর অত্যাচার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অতীতে বিভিন্ন সময় এই বাহিনীর সন্ত্রাসী পুতু, রাজা মিয়া ও সাদ্দামসহ অন্যদের আটক করে জনগণ পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছিল। কিন্তু কয়েকদিন কারাগার থেকে বেরিয়ে আবার মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালায়। এদেরকে নির্মূল করতে হলে পুলিশকে কার্যকর এ্যাকশন নিতে হবে।

ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বলেন, পুতু বাহিনীর সন্ত্রাসীরা খরুলিয়ার একটি বৃহৎ এলাকার মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। শুধু তাই নয়, তারা ঐতিহ্যবাহী খরুলিয়া বাজারের দিনদুপুরে ডাকাতি ও লুটপাট চালায়। এ নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ আমার পরিষদে এসেছে। এ বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমি পুলিশ বাহিনীর কাছে আহ্বান চালাচ্ছি।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) খাইরুজ্জামান বলেন, খরুলিয়ায় প্রতিনিয়ত পুলিশী অভিযান জোরদার রাখা হয়। গত ৮ জুলাইয়ের গাড়ি ডাকাতির ঘটনাও তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো হয়েছিলো। তবে সন্ত্রাসীরাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সুত্র-পূর্বকোণ