লাগামহীন অনিয়ম ও সীমাহীন দুর্নীতির আরেক নাম কক্সবাজার জেলা কারাগার

১ কেজি গরুর কাঁচা মাংস ১ হাজার ৭০০ টাকা ও কাঁচা মুরগির মাংস ৬০০ টাকায় বন্দিদের জন্য ক্রয় করা হয়।
coxzbazar-Jel.jpg

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ লাগামহীন অনিয়ম ও সীমাহীন দুর্নীতির কারণে অনিয়মের মাত্রা এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কক্সবাজার জেলা কারাগারে আটক বন্দিদের কাছে এক কেজি গরুর কাঁচা মাংস বিক্রি করা হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ টাকায় ও কাঁচা মুরগির মাংস ৬০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শুধু তাই নয়, কারাগারের বন্দিদের সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলতে আদায় করা হয় জনপ্রতি ১২০০ টাকা করে। এর পরবর্তী মিনিট নেয়া হয় ১০০ টাকা করে।

দেশের সব কারাগারে কম বেশি দূর্নীতির অভিযোগ থাকলেও কক্সবাজার জেলা কারাগারের চিত্র ভিন্ন। কারাগার সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছে ৪ হাজার ২৬০ জন। এসব বন্দির মধ্যে শতকরা ৭০ জন অর্থাৎ তিন হাজারেরও বেশি রয়েছেন ইয়াবা কারবারি।

আর কারাকর্মীরা এসব ইয়াবা কারবারিদের টার্গেট ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করছে। আর এমন কাজের ভুক্তভোগী হচ্ছেন অন্যান্য অপরাধে জড়িত সহস্রাধিক বন্দিরা।

জানা গেছে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আত্মসমর্পণ করা ১০২ জন কোটিপতি ইয়াবা কারবারি কারাগারে অবস্থানের পর থেকেই কারা অভ্যন্তরের পরিস্থিতি বদলে গেছে।

জেলা কারাগারের ভেতর বর্তমানে ২০টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব ওয়ার্ড মিলে রয়েছে ৫টি ক্যান্টিন। তদুপরি ওয়ার্ডের বাইরে কারা ফটকেও রয়েছে আরও একটি ক্যান্টিন। ক্যান্টিনগুলোই মূলত কারাবন্দি মানুষগুলোকে জিম্মি করে টাকা উপার্জনের বড় ফন্দি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বন্দিদের স্বজনরা বাইর থেকে কোনো পণ্য নিয়ে ভেতরে দিতে পারবে না। যাই দিতে হয় তার সবই কারাগারের ক্যান্টিন থেকে কিনে দিতে হবে।

কারাগারে থাকে এক ব্যক্তি বলেন- ‘কারাগারের হাসপাতাল থেকে আমদানি ওয়ার্ডসহ সবখানেই ইয়াবা কারবারিরা টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে রাখেন। তাদের অবৈধ টাকার কাছে অন্যান্যরা অসহায়।’

তিনি জানান, কারাগারের আমদানি ওয়ার্ডে সিট নিয়ে রয়েছেন কক্সবাজার শহরের শাহজাহান আনসারী ইয়াবা ডন। তার জন্য প্রতিদিনই তিন বেলা বাসা থেকে ভাত যায় কারাগারে।

সম্প্রতি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইয়াবা কারবারিদের মধ্যে সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির তিন ভাইসহ ৫ জন কোটিপতি কারাগারের ৩ নম্বর সেলের ২ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছেন। তারা জনপ্রতি মাসিক ৫০ হাজার টাকা চুক্তিতে এমন সুযোগ নিয়েছেন। ওয়ার্ডটির বিশেষ সুযোগ হচ্ছে টাইলস করে দেওয়া হয়েছে ওদের সুবিধার জন্য। কারাগারে কারবারিরা মোবাইলও ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে দাবি করে বেসরকারি কারা পরিদর্শক এবং কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘আমার সময়ের অভাবে কারাগারে তেমন যাওয়া হয়না। তবে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এসব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমি অবশ্যই কারাগারে গিয়ে এসব অন্যায়-অবিচার তদন্ত করে জোরালো প্রতিবাদ করব।’

ঈদের পরের দিন কারাগারে এত বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর ভিড় জমেছিল ফলে দর্শনার্থীদের নিকট থেকে কারারক্ষীরা যে যেভাবে পেরেছেন টাকা আদায় করেছেন।

এ কারণেই কক্সবাজার কারাগারের ভেতরের অনিয়ম-দুর্নীতির কথা ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের পরের দিন বৃহস্পতিবার কারাগারে অন্তত ৬/৭ হাজার দর্শনার্থীর ভিড় জমেছিল বলে জানা গেছে। এদিন বন্দিদের সঙ্গে দেখা করে ভাত-তরকারির একটি ক্যারিয়ার ঢুকাতেও কারা কর্তৃপক্ষ আদায় করেছে ২০০/৩০০ টাকা।

এসব বিষয়ে কক্সবাজার জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক বজলুর রশীদ আখন্দ এসব অভিযোগসমূহ সত্য নয় দাবি করে বলেন- ‘বৃহস্পতিবার কয়েক হাজার দর্শনার্থী ছিল কারাগারে। ওই সময় আমি কিছু সময়ের জন্য বাইরে ছিলাম। এ কারণে এ সময় কিছু অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তাই এসব অভিযোগের বিষয়ে আমি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’