উপজেলা নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের কোন আগ্রহ নেই

Vote.jpg

ফাইল ছবি

শাহীন মাহমুদ রাসেল
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ভোটে আগ্রহ নেই মানুষের। এবারের সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। কিন্তু রাতে ব্যালট বাক্সভর্তিসহ নানা অনিয়মের কারণে বর্তমান সরকারের অধীনে কোন ধরনের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের রাজনৈতিক দলগুলো। আর তাই গত ১০ মার্চ থেকে শুরু হওয়া উপজেলা নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। এমন কী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেও একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। কোন কোন কেন্দ্রে ৪০-৫০টি ভোট পড়তেও দেখা গেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সিটি ও উপজেলা মিলিয়ে তিন দফার নির্বাচনে একই চিত্র দেখা গেছে। দিনভর ভোটের জন্য নির্বাচনী কর্মকর্তারা বসে থাকেন। কিন্তু ভোটাররা তেমন আসে না বললেই চলে। নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ না থাকার বিষয়ে বিশ্লেষকগণ নানা ধরনের কথা বলছেন। কিন্তু খোদ নির্বাচন কমিশন থেকেই বলা হচ্ছে, একতরফা নির্বাচনের কারণে ভোটাররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তবে ভোটারদের কেন্দ্রে আনার দায়িত্ব ইসির নয়, রাজনৈতিক দলগুলো এ জন্য দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা।
স্থানীয়রা মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এমন একটা নির্বাচনের পরিবেশ তৈরী করা যাতে ভোটাররা নিরাপদে ভোট কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে পারে। এ জন্য নির্বাচন কমিশন এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে যাতে ইসির প্রতি ও ভোটের প্রতি ভোটারদের আস্থা বৃদ্ধি পায়। মানুষ ভোটের প্রতি আস্থা হারিয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এটি গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।
সাবেক উপজেলা আ.লীগের সভাপতি মনিরুল আলম বলেছেন, আমাদের গণতন্ত্রের ভিত এমনিতেই সবচেয়ে বেশি নড়বড়ে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা, নির্বাচনের প্রতি মানুষ আস্থা ও আগ্রহ হারিয়ে ফেললে ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের ওপরে বড় আঘাত আসতে পারে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিন দফায় উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোটারদের উপস্থিতি একেবারেই নাই বললেই চলে। প্রায় সকল কেন্দ্রই ছিল ফাঁকা। আবার অন্যান্য কেন্দ্রে যেসব ভোট পড়েছে তাও খুব কম। তবে ভোট শেষে দেখা যায় ৪৩ ও ৪৫ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ভোটের চিত্র নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে “ভোটকেন্দ্রে ভোটার নেই, ছাগল আছে” দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনে ফাঁকা কেন্দ্রের ছবি ছেপেছে প্রায় সব পত্রিকাই। গতকাল তৃতীয় ধাপের উপজেলা নির্বচনে সরেজমিনে দেখা গেছে, কেন্দ্রের ভেতরে ভোট গ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা অলস বসে আছেন। কোন কোন মাঠে কোনো ভোটার নেই, যদিও দড়ি দিয়ে যে ভোটারদের লাইন চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেই দড়িগুলোও আছে।
উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহণ না করায় একতরফা নির্বাচন হওয়ায় ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যেতে আগ্রহ হারাচ্ছে বলে মনে করছেন নির্বাচনে অংশ নেয়া অনেক প্রার্থী। সাবেক একাধিক জনপ্রতিনিধি বলেন, উপজেলা নির্বাচনের জৌলুস নেই। একতরফা নির্বাচনের কারণে ভোটাররাও কেউ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী নয়। এহেন নির্বাচনবিমুখতা গণতন্ত্রবিমুখতায় পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই অবস্থা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। গণতন্ত্রকে অবারিত করার স্বার্থে নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করে করেছেন অনেকে।
ভবিষ্যতে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য, আইনানুগ ও উন্মুক্ত নির্বাচন হলে এবং সব প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত হলে, সব দল তাতে অংশগ্রহণ করবে বলে আশা করা যায় মনে করেছেন সাধারণ ভোটার। তারা আরও বলেন, আজকাল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত কথাটা বেশ চালু হয়েছে। আমরা এর অর্থ বুঝি না। আমাদের মতে, নির্বাচন মানেই হচ্ছে একাধিকের মধ্যে বাছাই। তাই যা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, তা নির্বাচন হয় কী করে?
প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে জনপ্রতিনিধিদের পদে আসীন হওয়ার রেওয়াজ গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ নয়। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচন ঘিরে কিছু সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে স্থানীয়রা বলেন, এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে যে, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়ার জন্য স্বাভাবিক পরিস্থিতি নেই, এমতাবস্থায় আমাদদের অনুরোধ থাকবে যে, আপনাদের বিবেচনায় এ রকম প্রতীয়মান হলে, সেই কেন্দ্র আপনারা যেন বন্ধ করে দেন। কোনো ধরনের অনিয়ম, সে যে কোনো ধরনেরই হোক, ভোটারদের ‘নির্বাচন বিমুখতা’ গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক মন্তব্য করে এর কারণ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
সচেতনমহল দাবী করেন, ভোটাররা কেন অংশগ্রহণ করছে না, এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। যদি আমরা উদাসীন হয়ে যাই, চিন্তা না করি, তাহলে আমার আশংকা যে, ভোটাররা যদি নির্বাচন বিমুখ হয়ে যায়, গণতন্ত্র অনেক বিপদে পড়বে। দেশের মানুষ যদি ভোট দিতেই না যায়, তার চেয়ে বড় বিপদ আর কিছু হতে পারে না।
উল্লেখ্য, আমাদের দেশের নির্বাচনের ওপর ভোটারদের ক্রমবর্ধমান অনীহা এবং ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা হারানোর অবস্থার উন্নতি করা শুধু নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বই নয়, এই দায়িত্ব সব রাজনৈতিক দল, সরকার ও নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার।