হাতির রাজা ও দাপুটে মোস্তাফিজুর

mustafiz-MP.jpg

মুহাম্মদ সেলিম হক…

দাপুটে এমপি বাশঁখালীর মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী! সরাসরি ভিডিও’তে কঠোর শাস্তিযোগ্য কথা বলেও এখনো টিকে রইলো দলীয় পদে। নেই অনুশোচনা, নেই অনুকম্পা, নেই ক্ষমা চেয়ে বক্তব্যে প্রত্যাহারের লবিং! বরং উল্টো কৌশলী পন্থা অনুসরণ। তাহলে কি ভিডিওটি ফেইক!

ঘটনাটি যদি সত্য হয় গোপন ভিডিও ধারণ। তবে সর্বজন স্বীকৃত কোন পদে থেকে কারো বিরুদ্ধে মুখে ফেনা তুলে থুথু বের করে জীবাণু ছড়িয়ে মন্তব্য করতে পারেন না তিনি।

বিতর্কিত ভিডিও ও এমপি সাহেবের কথা যেহেতু ছড়িয়ে পড়লো। তখন জীবাণু রোধ করা দরকার নয় কি। নিশ্চয় পাঠকে অবগত রয়েছেন। গেলো সপ্তাহে এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়। তা রীতিমতো স্যোসাইল মিডিয়ায় ঝড় তোলেছে। কারণ কথা গুলো সাংঘর্ষিক আর উদ্দেশ্যপ্রনোদিত বলে মনে হলো। আনোয়ারা কর্ণফুলীতে প্রতিবাদের ঝড় ও মোস্তাফিজুর রহমানের কুশপুত্তালিকা দাহ্ করা হয়েছে। অপরদিকে পুরাটা নীরব দেখেছি নোয়াখালী জেলার মানুষদের। মিডিয়ায় কোন খবরও দেখলাম না। রহস্য কোথায় অনেককে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে দেখলাম সত্য মিথ্যার দোলাচলে।

যদি সত্য তবে আশঙ্কা করছি চকবাজার ট্রাজেডি আর বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছেনা তো এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের সীমালঙ্গন করা অপরাধটুকু। বাশঁখালী থেকে এমপি হওয়ার গল্পটা ছিল ভিন্ন রকম। কেউ কেউ তামাশার ছলে উনাকে বলে বিকাশ এমপি। কেউ বলেন রগচটা, কেউ বলে আবার মাথামোটা এমপি। কত কি কিন্তু এসব কি তার কর্মকান্ডের ফলাফল? না আরো কিছু ইনভেস্টিগেশনের দরকার ছিল বিষয়টি নিয়ে?

সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি লবণকে নুন বলায় হাঁসির রোল পড়ে পুরা সংসদে। মনে হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের অসুস্থ এর নাটকে কপাল পুড়েছে মাহমুদুল ইসলামের। যদিও ২০১৪ সালের ঘটনা অনেকে জানেন। এই ভদ্রলোক বাশঁখালীর সুলতান কবির চৌধুরী’র অনুকম্পায় এমপি হয়ে ছিলেন।
এরপর এই বিতর্কিত এমপি সাহেব কে রুখবার সাধ্যকার। ২০১৫ সালে চটগ্রাম দক্ষিণ জেলার আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় মুজিবুর রহমানের সাথে জুতা মারামারি। গত ইউপি নিবার্চনে পহেলা জুন নিজের পছন্দমত প্রিসাইডিং অফিসার না দেওয়াতে থাপ্পড় বসালেন নিবার্চন অফিসারের গালে। তার খেসারত দিতে হলো প্রার্থীদের। স্থগিত হয় নিবার্চন। দ‚র্নীতি সংক্রান্ত খবর প্রকাশের জেরে প‚র্বদেশ পত্রিকার সাংবাদিক রাহুল দাশকে হুমকি প্রদান। এ নিয়ে মিছিল মিটিং কম হয়নি। কেউ একটুও তাহার পশম ছিঁড়তে পেরেছে বলে মনে হয়না!! কত অপরাধ করলে এমপির প্রভাব কমে জানিনা।

আলোচিত ভিডিওটি’র কথার যোগসুত্রে নেতাকর্মীরা ধারণা করছেন ফুটেজটি ধারণ করা হয়েছে জাতীয় নিবার্চনের আগে। অর্থাৎ ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের পুর্বে। কোন এক কারণে সংক্ষুব্ধ হয়ে তিনি তার জ্বালাময়ী কথাগুলো বলেছিলেন পথ চলতে চলতে। আর এমপির গাড়িতে থাকা কোন এক বিশ্বস্ত কর্মী হয়তো তা ধারণ করে রেকর্ড করেছিলেন। যদিও তার অনুসারীদের দাবি ‘কিংমাস্টার’ নামক অ্যাপস ব্যবহার করে তা ছড়িয়েছে। তবে তার কোন প্রমাণ দেখছিনা। এমনকি এমপি সাহেব ও কোন প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন কিনা চোখে পড়েনি আমার।

এমপির সাহস বলে কথা। ভিডিও’তে স্পষ্ট দেখা যায় এবং শোনা যাচ্ছে আত্মগৌরব করে বললো সে, প্রতিপক্ষের কর্মীকে কিভাবে গুলি করে মারলো। একটা ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক’কে কলার ধরে পেটাবে! মনোনয়ন না ফেলে কোন দুঃখ নেই। সাধারণ সম্পাদক সব খায়! পয়সা, ইয়াবা: আরো কত কি বলেছেন তিনি..। কি সব বিশ্রী রকমের শব্দের ব্যবহার।

অবাক করা বিষয় হল- কোন যুক্তি ও প্রসঙ্গক্রমে প্রয়াত নেতা সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু’র কথা তিনি টানলেন। মৃত মানুষের প্রতি একজন মুসলমানের শ্রদ্ধা থাকা উচিত। আমাদের ধর্ম ও সে শিক্ষা দেয়। অথচ এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের এতো রাগ কেনো!! জীবিত থাকা কোন মানুষ মৃত মানুষের প্রতি এতো নির্দয় হতে পারে জানা ছিলো না।

চট্টগ্রাম তথা দক্ষিণ জেলার সর্বশ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় নেতা বাবু ভাই। তার অবদান দলের দুঃসময়ে কতটুকু সেটা দল ও দলীয় সভানেত্রী যেখানে চোখ বন্ধ করে স্বীকার করেন। সেখানে সেই মহান নেতার লাখো লাখো ভক্তদের হৃদয় মানসপটে আঘাত করলেন কেনো এমপি মোস্তাফিজ। নীতি আদর্শ মোস্তাফিজুর রহমানের ঝুঁলিতে রয়েছে কিনা প্রশ্ন রইল? নাকি অন্তসারশুন্য, এমপির প্রভাব বিস্তারে নেতা বনে গেছেন।

যতটুকু মনে পড়ে প্রায় সময় প্রিয় নেতার কর্মী হিসেবে রাজনীতির মাঠে ছিলাম। তবে এ ধরণের কোন মন্তব্য অতীতে হাইলধরের কোন শোক সভায় বলেছিলেন বলে মনে পড়ছেনা। অথচ ভিডিওটি’তে এমপি মোস্তাফিজ বলেছেন, নেত্রী আপসোস করেছে বাবু মিয়াকে নিয়ে, কারণ যথার্থ ম‚ল্যায়ন করতে পারেনি বেঁচে থাকতে। জাবেদ সৎ তুমি এগিয়ে যাও। তোমার মনোনয়ন নিশ্চিত। শেখ রেহানার কোন কথা ৫ম মৃত্যুবার্ষিকীতে উঠে আসেনি।

অদ্ভুত কথা! কি মনে করে একজন জাতীয় নেতাকে অপমান করলেন মোস্তাফিজুর রহমান? আরো অবাক করা বিষয় হলো দলের সাধারণ সম্পাদক’কে নিয়ে এত কড়া তীর্যক মন্তব্য করার পরেও লক্ষণীয় বিষয় নোয়াখালী একবারে শান্ত। আর কি রকম ভাষা ব্যবহার করলে আনোয়ারা – কর্ণফুলীর মতো নোয়াখালীতে ও প্রতিবাদ হবে?

জানা মতে, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকেও কোন কৈফিয়ত চাওয়া হয়নি। দলের সাধারণ সম্পাদক ও জেলার সাবেক প্রয়াত সভাপতির বিরুদ্ধে অপ্রচার ও অসভ্য বিষাদগার করার জন্য। একমাত্র মাঠে ছিলেন সেই যুবলীগ আর ছাত্র লীগ। যাদের বুকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী বাবু মিয়ার মতো মহান নেতার ব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রতিধ্বনি ছিলো। যারা দলের সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলা এমপিকে রুখতে রাজপথে বুক ফুলিয়ে দাড়িয়েছিলো।

একটা জবাবদিহিতা থাকার বড়ই দরকার ছিলো, হউক না তিনি দলীয় এমপি। তবে মোস্তাফিজুর রহমানের দাপট আর নোংরামীর সাহস দেখে একটা গল্পের কথা মনে পড়লো। আগেই জানাচ্ছি গল্পটা কারো কাছে শোনা। আমার সৃষ্টি নয়। পাঠকের কাছে একটু সময় চেয়ে নিচ্ছি পড়ার।

গল্পের কাহিনীটা হলো এক বনে হাতির রাজা তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি কুনোব্যাঙ হাতির রাজাকে লাঁথি মেরে দিলো। ব্যাঙের লাঁথি মারার দৃশ্য দেখে সবাই থ বনে গেলো। রাজা ও বিস্ময় এবং বিব্রতকর অবস্থায় পড়লেন। সৈন্যরা ব্যাঙ মারতে আসলো। রাজা বাঁধা দিলেন। না তাকে মেরো না। আমি ইচ্ছা করলে এক পায়ের চাপে মারতে পারি কিন্তু মারব না। কারণ লাঁথি মারার কারণ বের করতে হবে।

পিছনে কার ইন্ধন ছিলো। কেন? এমন ঘটনা ঘটলো। দরবারে এসে রাজা ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলেছেন। সৈন্যরা বেরিয়ে পড়লো কারণ খুঁজতে। চলতে লাগলে তদন্ত। ক্লু বের করতে পারছেনা কেউ। টানা ৬ দিন শেষ। কপালে চিন্তার ভাঁজ। ভয়ে তড়স্ত সকলে কি জবাব দিবে রাজাকে। তাহলে গর্দান যাবে সবার। একেবারে হতাশ সৈন্যরা গাছ তলায় বসে পড়লো। এদিকে ব্যাঙ লাঁথি মারার সুবাদে পশুদের কাছে হিরো বনে গেল।

হাতিদের হতাশার মাঝে হঠাৎ শেষ বিকালে একটি বৃদ্ধ হাতি এসে বলল, আচ্ছা-ব্যাঙ যেখানে লাঁথি মেরেছে। সেখানকার মাটি খনন করতে হবে। যেমন বলা তেমন কাজ। কি আর করবে হাতিরা নিরুপায় হয়ে তা করতে লাগলো। মাটি কুঁড়া শেষে ঐ স্থান হতে একটা ৫০ পয়সার পুরানো আধুলী বের করা হলো। সৈন্যরা হতাশ হয়ে বললো এটা পেলাম। বৃদ্ধ হাতি জবাবে বললো এবার ব্যাঙ কেন লাঁথি মেরেছে তার কারণ পেলাম। সবাই চমকে উঠলো। সবাই তার দিকে দৃষ্টি বাড়ালো কি এই পয়সা। তাহলে কি এই আধুলীর গরমে ব্যাঙ হাতির রাজাকে লাঁথি মেরেছে। রাজাও এ যুক্তিতে খুশি। সামান্য একটা আধুলীর গরম সহ্য করতে পারেনি ব্যাঙ। রাজা বেজায় খুশি তদন্ত দলের প্রতি।

গল্পে ব্যাঙের কি সাজা হয়েছিলো জানি না। তবে মোস্তাফিজুর রহমানের পিছনে কে আছেন? যার গরমে তিনি রগচটা ব্যবহার শুরু করলেন। একের পর এক বিতর্কিত কান্ড ঘটিয়ে পার পাচ্ছেন বলে কি এসব ঘটাচ্ছেন। না অন্য কিছু তা আমার বোধগম্য নয়।

দক্ষিণ জেলার নেতাকর্মীরা দলের স্বার্থে তার কারণ বের করে শেকড় উপড়ে ফেলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেছেন। এটা না হলে বাকিদের নিয়েও এর চেয়ে বিরুপ মন্তব্য করতে দ্বিধাবোধ করবে না এমপি মোস্তাফিজ কিংবা নীতি আদর্শহীন অন্য কেহ।

প্রতিবাদ হবে, আন্দোলন হবে। তারপর মিশে যাবে নানা ঘটনার আড়ালে প্রকাশ্যে করা কোন অপরাধ। বুক ফুঁলিয়ে হাঁটবে ডিজিটাল অপরাধী কিংবা মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী’র মতো কোন বিতর্কিত এমপি তা হয়না। কারণ এটা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, শোষণ অত্যাচার অপমান এক সাথে চলতে পারেনা।

লেখক:
মুহাম্মদ সেলিম হক
সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সংগঠক।

নোট: মতামতের জন্য সম্পাদক নয়, লেখকেই দায়বদ্ধ।