চেয়ার অতঃপর আত্মসম্মান!

salim-houqe.jpg

মুহাম্মদ সেলিম হক..

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর সিনিয়র সাংবাদিক আনিসুল হকের গদ্যকার্টুনের একটা লেখার কথা আমার মনে পড়লো।

এর আগে জানিয়ে দিচ্ছি গত ২৪ফেব্রæয়ারী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ এর বোরিং কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সূধী সমাবেশ ছিল। প্রসংগত কারণে এর আগে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক আনিসুল হকের কথাটি পাঠকের কাছে তুলে ধরছি।

একবার তিনি প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েছিলেন। সম্ভবত দাওয়াতটি ছিলো গণভবনের কোন এক অনুষ্ঠানের। পিএম এর অনুষ্ঠান হওয়াতে ঘন্টাখানিক আগেই সচরাচর রওয়ানা হতে হয় সকলের। তিনি গিয়ে দেখলেন সামনের চেয়ার খালি পড়ে আছে। আস্তে আস্তে দাওয়াতের অতিথি মেহমানেরা আসছে..।

পিছনের একটি আসনে তিনি বসে পড়লেন। কেই একজন তা দেখে বললেন, আপনি সেখানে কেন বসলেন? সামনের আসনে চেয়ার খালি। তিনি হাসিমুখে জবাব দিলেন না থাক। তিনি অনুভ‚তিটা পরে প্রকাশ করলেন। দারুন একটা যুক্তি দিয়ে এবং বললেন, যে চেয়ার পরে আমাকে ছেড়ে দিতে হবে। সে চেয়ারে বসে লাভ কি, তারচেয়ে বরং পিছনে বসি ঝুঁকি কম কাউকে ছাড়তে হবে না। সামনের চেয়ারে বসতে গিয়ে পরে পিছনে জায়গা পাওয়া যাবেনা।

মর্যাদা থাকলে তোমাকে ডেকে পিছন থেকে সামনে এনে বসাবে। একথা ছিলো তাঁহার কথার মুল সারমর্ম। লেখকেরা সব সময় সবকিছু অন্তরদৃষ্টি দিয়ে দেখেন।

নিশ্চয় পাঠকে অবগত প্রধানমন্ত্রীর প্রোগামের দাওয়াত কার্ডের পিছনে কতগুলি নির্দেশিকা লিখা থাকে। তার মধ্যে অন্যতম হলো সঙ্গে কার্ডটি নিতে হবে আর নির্ধারিত সময়ে যেতে হবে। কার্ড অনুপাতে চেয়ার বসানো হয়। তবে আগে গেলে সামনে বসা যায়। তবে শ্রেণী ভেদে থাকে আসন বন্টন যথাক্রমে: প্রভাবশালী মন্ত্রীদের, দলীয় সংসদ সদস্য ও তাদের কাছাকাছি মর্যাদার ব্যক্তিবর্গ ও দলের মুল পদস্ত নেতাদের জন্য আসন সাঁজানো থাকে। প্রথম সারিতে আবার ভিআইপিদের আসন। বেষ্টনী টেনে দেয়া হয় হালকা কাপড় কিংবা প্রচ্ছেদ দেয়ালের। এসব সকলে জানেন।

২৪ ফেব্রæয়ারী ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ এর বোরিং কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন আমরা সকাল ১০টায় গিয়ে দেখলাম প্রায় শ’খানিক চেয়ারে অতিথি বসে আছেন। কর্ণফুলী উপজেলার কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সদ্য কমিটির কয়েকজন সদস্যরাও ভিআইপিদের সোফাসেট অলংকরণ করে বসে আছে।

আমাকে একজন সাবেক জনপ্রতিনিধি বললো ওরা সামনে বসেছে। চলো ঐখানে বসি। আমি বললাম না এখানে বসেন। পরে তুলে দিলে একেবারে পিছনে বসতে হবে। সম্মানও যাবে সাথে। প্রধানমন্ত্রী আসার কয়েক মিনিট আগে শুরু হলো চেঁচামেঁচি।

নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ববান একজন অফিসার এসে বললো, আপনারা এখানে কেন? এটা তো আপনাদের বসার জায়গা না। কতটুকুু বেহায়াপনা আর লজ্জা শরম হজম ক্ষমতা থাকলে কথাগুলি শুনতে হয়। লজ্জাহীনতা আর সাংস্কৃতির ভয়াবহ অধঃপতন ঘটেছে তা বলার ভাষা নেই। এরা পড়া লেখা জানা মানুষ। সমাজের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। এদের বলতে হয় এটা তোমাদের বসার আসন নয়।

যদিও নজরে পড়ার মতো প্রতিটি সোফায় লেখা রয়েছে সেখানে কে বসবেন! দেখলাম চট্টগ্রাম জেলার একজন উপজেলা চেয়ারম্যান ও এক প্রকার সেখানে জোর করে প্রবেশ করলেন। প্রবেশ করে চেয়ার পাচ্ছেন না। লক্ষ্য করলাম কেউ বসার জন্য তাকে বলছেও না। মান সম্মান হারানোর কোন ভয় নেই তার। এটা বুঝলাম দাড়ানোর স্টাইল দেখে। আমার পরিচিতি একজন দমক খেয়ে চলে আসলো। চেহারায় প্রচন্ড লজ্জার ভাব। পিছনে চলে যাচ্ছে সোজা পথে। বাকিরা লজ্জা হজম করে বসে রইলো। হায়রে চেয়ার। বসতে হবে আত্মমর্যাদা হারিয়ে!

প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর ভিআইপিদের সেখানে বাঁধাহীন ভাবে প্রবেশ করলাম। দেখলাম প্রতিটি চেয়ারে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম আছে এখানে কারা বসবেন। দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম চেয়ারের কোন জায়গায় উপজেলার চেয়ারম্যানের নাম লিপিবদ্ধ নেই। ইউনিয়নের নাম থাকা তো কল্পনাই করা যায় না।

সর্বশেষ নাম ছিলো বঙ্গবন্ধু টানেল এর সাথে সংশ্লিষ্ট সিনিয়র কর্মকর্তাদের নাম। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ছিলো। আর নামহীন উঁচু মাপের ব্যক্তিরা সামনে বসলো গর্ব করে। ছবি তো পোস্ট করে গর্বের মাত্রাটা আরো বাড়াবেন। ছবিতে অপমানের কথা থাকে না।

আরেকটি ঘটনা বলছি। যখন মনে পড়েছে আশাকরি পাঠক বিরক্ত হবেন না শুনতে। কয়েক মাস আগে পটিয়াতে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুনার্মেন্ট জেলা ভিক্তিক উদ্বোধনী খেলায় কর্ণফুলীর একজন প্রতিনিধিকে চেয়ার থেকে উঠিয়ে দেয়। বারবার মাইকে ঘোষণা দেয়া হয় সামনে ও পিছনের কয়েকটি লাইন ইউএনও, ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য নির্ধারিত। তারপর ও সে বসলো। পরে তাকে উঠিয়ে দিলেন।

কিছু ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ নেতা সামনে বসতে পারলে নিজেকে শাসক মনে করে। অথচ এটার পিছনে তার কোন অবদান নেই। গত নির্বাচনের উঠানবৈঠক ও এ রকম বহু ঘটনা ঘটেছে। মন্ত্রীর সাথে সামনে বসে একটা ছবি তোলায় গর্ববোধ তাদের। তাই তাকে চেয়ার দখল করতে হবে। দেখা গেছে অনেকে আবার জোর করে চেয়ার নেয়, যোগ্যতা থাকুক আর না থাকুক।

বাংলায় স্পষ্ট লিখার পরও রাজনীতি সচেতন অনেককে দেখেছি চেয়ারে বসে বড় বড় শ্বাস নেয়। মাইকে ঘোষণা হয়। কে কার কথাশুনে। বহাল তবিয়তে সে হিসাব কষতে শুরু করেছে পুরনো দিনের।

আনিসুল হকের সেই কথায় ফিরে আসি। যে চেয়ারে বসে আমাকে উঠে যেতে হয়। সে চেয়ারে আমি বসবো না। সম্মান থাকলেই জনতাই পিছন থেকে সামনে আনবেন। ক্লাসের ফাস্ট বয় চাইলে পিছনের বেঞ্চে বসতে পারে না কারণ শিক্ষক তাকে টেনে সামনে বসাবেই। এটাই নিয়ম! এটাই ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মান।

লেখক: মুহাম্মদ সেলিম হক
সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সংগঠক
কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম।