ভার্চুয়াল আসক্তি মাদকের চেয়েও ভয়ঙ্কর!

Zafar-Iqbal-1.jpg

ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

মস্তিষ্ককে তোমরা কীভাবে ব্যবহার করবে, তার ওপর নির্ভর করবে তোমার, তোমার দেশের এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। তোমরা কি জানো এই মহামূল্যবান রহস্যময় মস্তিষ্কটি নিয়ে এখন সারা পৃথিবীতে একটি অবিশ্বাস্য ষড়যন্ত্র চলছে? আমি নিশ্চিত তোমাদের অনেকেই নিজের অজান্তে সেই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়েছ। এই ষড়যন্ত্রের নাম সোশাল নেটওয়ার্ক।

শিক্ষক হিসেবে আমি লক্ষ করেছি ২০১৩-১৪ সাল থেকে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে একধরনের গুণগত অবক্ষয় শুরু হয়েছে। তাদের মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। আমার মনে হয়, এটি ফেসবুক-জাতীয় সামাজিক নেটওয়ার্কে বাড়াবাড়ি আসক্তির ফল।

মাদকাসক্ত একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে মাদক না পেলে অস্থির হয়ে যায়, তার মস্তিষ্কে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল নির্গত হতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, সোশাল নেটওয়ার্কে আসক্ত একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে তার সোশাল নেটওয়ার্কে সময় অপচয় না করতে পারলে সে-ও অস্থির হয়ে যায়। তার মস্তিষ্কেও বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল নির্গত হতে শুরু করে। সহজ ভাষায় বলা যায়, সত্যিকারের মাদকাসক্তির সাথে সোশাল নেটওয়ার্কে আসক্তির কোনো পার্থক্য নেই।

তোমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তি যেন কখনোই তোমাদের ব্যবহার করতে না পারে। মনে রেখো এই সব আধুনিক প্রযুক্তি কিন্তু পরজীবী প্রাণীর মতো, সেগুলো তোমার পুষ্টি খেয়ে বেঁচে থাকে।

একটা দৃশ্য কল্পনা করা যাক। আপনি একজন বাবা কিংবা মা, আপনার ছেলেমেয়েরা বড় হয় নি, তারা স্কুল-কলেজে পড়ে। একদিন আপনি বাসায় এসেছেন, এসে দেখলেন আপনার ছেলে বা মেয়েটি টেবিলে পা তুলে গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা সিগারেট টানছে।
আপনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী করছিস বাবা (কিংবা মা)?’

আপনার ছেলে কিংবা মেয়ে হাসি হাসি মুখে বলল, ‘সিগারেট খাচ্ছি আম্মু (কিংবা আব্বু)।’

তারপর টেবিল থেকে পা নামিয়ে বলল, ‘খাওয়ার পর একটা সিগারেটে টান না দিলে ভালোই লাগে না।’

কথা শেষ করে সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে তার নাক দিয়ে মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করল।

আপনি বললেন, ‘ঠিক আছে বাবা (কিংবা মা) সিগারেটটা শেষ করে হোমওয়ার্কগুলো করে ফেল।’

কথা শেষ করে আপনি ভেতরে গেলেন, মনে মনে ভাবলেন : ‘আমার ছেলেটি (বা মেয়েটি) কত লক্ষ্মী। বাইরে কোনো ঝুট-ঝামেলার মাঝে যায় না। ঘরের মাঝে থাকে, মাঝে মাঝে সিগারেট খায়!’

আমি জানি, আপনারা যারা স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ের বাবা তারা আমার এই কাল্পনিক দৃশ্যটির বর্ণনা শুনে যথেষ্ট বিরক্ত হচ্ছেন। বলছেন, একজন বাবা কিংবা মা তার ছেলে বা মেয়ের এরকম একটা আচরণকে কখনো এত সহজভাবে নিতে পারে না।

অবশ্যই নিতে পারে না এবং কখনো নেয় না। সিগারেট হচ্ছে নেশা। এরকম আরো অনেক নেশা আছে আমরা দৈনন্দিন জীবনে সেগুলো দেখে অভ্যস্ত নই। তাই কাল্পনিক দৃশ্যটিতে অন্য নেশাগুলোর কথা না বলে সিগারেটের উদাহরণটি দেওয়া হয়েছে।

আমাদের সন্তান কোনো একটা নেশায় আসক্ত হয়েছে জানতে পারলে আমরা সেটা মেনে নিতে পারব না। আমরা দুশ্চিন্তিত হবো, বিচলিত হবো এবং সন্তানকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্যে পাগল হয়ে যাব। যদি এই বিষয়টা সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আমরা কীভাবে আমাদের সন্তানদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকে বসে থাকতে দেই?

যে বিষয়টি এতদিন একটা সন্দেহ বা আশঙ্কা ছিল, এখন সেই বিষয়টি গবেষণা জার্নালে বের হতে শুরু করেছে। কোকেন-আসক্ত একজন মাদকাসক্ত মানুষকে যদি মাদক খেতে দেওয়া না হয়, তাহলে তার মস্তিষ্কে যে কেমিক্যালগুলো বের হয়ে তাকে অস্থির করে তোলে, ফেসবুকে আসক্ত একজন মানুষকে যদি ফেসবুক করতে দেওয়া না হয়, তাহলে তার মস্তিষ্কে সেই একই ঘটনা ঘটে। বিষয়টি ছেলেমানুষী বিনোদন নয়, বিষয়টি মাদকে আসক্তির মতো গুরুতর একটি ঘটনা।

কারো কারো কাছে নিশ্চয়ই মনে হতে পারে, আমার পুরো বক্তব্যটা বুঝি একধরনের বাড়াবাড়ি। বিষয়টি মোটেও এমন কিছু গুরুতর নয়। কিন্তু আমি মোটামুটি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি বিষয়টা যথেষ্ট গুরুতর।

মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে সেটা যথেষ্ট রহস্যময়। একজন ছেলে বা মেয়ে যখন বড় হচ্ছে সেই সময়টাতে সে কীভাবে তার মস্তিষ্ক ব্যবহার করেছে, তার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে তার মস্তিষ্কের গঠনটি কেমন হবে। তাই একজন বড় মানুষের ফেসবুক আসক্তি দেখে আমি যতটুকু বিচলত হই, তার থেকে অনেক বেশি বিচলিত হই, যদি সেটি হয় কমবয়সী একটি ছেলে বা মেয়ের আসক্তি।

আজ থেকে ১০ বছর পরে হয়তো আমরা জানতে পারব শৈশব-কৈশোরে মাঠে-ঘাটে ছোটাছুটি করে খেলাধুলা না করে দিনের পর দিন রাতের পর রাত ছোট একটা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার কারণে আমাদের কী ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে, আমাদের কিছু করার থাকবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে একটুখানি কমনসেন্স হয়তো আমাদের অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে।

যারা একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে এই প্রযুক্তিকে নিজের কাজে ব্যবহার করছেন আমি তাদের এতটুকু খাটো করে দেখছি না। কিন্তু এই প্রযুক্তি যাদের ব্যবহার করছে আমার দুশ্চিন্তা তাদের নিয়ে!

সবাই হয়তো জানে না, যারা এই প্রযুক্তি গড়ে তুলছে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ছলে-বলে-কৌশলে কোনো একজনকে তাদের ওয়েবসাইটে কিংবা পোর্টালে নিয়ে আসা এবং যত বেশি সম্ভব তাদের সেখানে আটকে রাখা। যারা আমার কথা বিশ্বাস করেন না তাদের বলব, ‘বিবিসি’র মতো কোনো সম্ভ্রান্ত একটা নিউজ মিডিয়ার সাইটে যেতে। আশেপাশে তাকান, আপনি কী দেখবেন? সারা পৃথিবীতে কত গুরুতর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু সেখানে ওসবের চিহ্ন নেই। একেবারে না দিলেই নয় সে-রকম একটি-দুটি ঘটনার পাশাপাশি শুধু রগরগে কিংবা চটুল খবর। তার যে-কোনো একটাতে ক্লিক করে দেখেন আপনাকে নিজে থেকে তারা একটার পর একটা ভিডিও দেখাতে শুরু করবে, আপনার মনের জোর যদি যথেষ্ট বেশি না থাকে, কিছু বোঝার আগেই আপনি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখে দেখে ঘণ্টাখানেক সময় নষ্ট করে ফেলবেন।

আপনি কোন ধরনের ওয়েবসাইটে গিয়েছেন সেটি বিশ্লেষণ করে আপনাকে লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে ওরা সেই ধরনের জায়গায় ঠেলে দেবে! শুধুমাত্র তথ্যপ্রযুক্তির সেবা গ্রহণ করেছেন বলে এই সাইবার জগৎ কিন্তু আপনার সম্পর্কে সবকিছু জানে।

‘লাইক’ দেওয়া নিয়ে কিছুদিন আগে আমি একটা সত্যি ঘটনা শুনেছি। একটি বাচ্চা মেয়ে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে কিছু একটা পোস্ট করে দিয়ে অপেক্ষা করে আছে সেখানে কেউ ‘লাইক’ দেবে। যখন দেখতে পেল কেউ তাকে খেয়াল করে ‘লাইক’ দিচ্ছে না, তখন সে নিজেই আর একটা অ্যাকাউন্ট খুলে সেই অ্যাকাউন্ট থেকে নিজেকে ‘লাইক’ দিতে থাকল!

বিষয়টা একটা কৌতুকের, কিন্তু তারপরও এটা শুনে আমি কেন জানি একটু আহত অনুভব করেছি। আমার মনে হয়েছে কেন আমার দেশের একটি ছোট মেয়ে জীবনের প্রতি এরকম একটা দীনহীন মনোভাব নিয়ে কাঙালের মতো বড় হবে? কে ঠিক করে দিয়েছে জীবনকে অর্থপূর্ণ হতে হলে ফেসবুকে ‘লাইক’ পেতে হবে?

কেউ স্বীকার করুক আর না-ই করুক ইন্টারনেট আসক্তি কিংবা আরো নির্দিষ্ট করে যদি বলা হয়, ফেসবুক আসক্তি একটি সত্যিকারের দুর্ভাবনার বিষয়। আমি তাই সবাইকে মনে করিয়ে দেই, অনলাইন জীবনের পাশাপাশি যে রক্তমাংসের বাস্তব জীবনটি আছে সেটি যেন আমরা ভুলে না যাই।

শিক্ষাবিদ, লেখক এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যলয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন করে তুলছেন তরুণ প্রজন্ম ও অভিভাবকদের। এ সম্পর্কিত তার একটি আলোচিত কলাম আর ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণের নির্বাচিত কিছু অংশের সংকলন তুলে ধরা হলো এখানে।