কক্সবাজারে তিন ভাইবোন মনোনয়নপ্রার্থী বিব্রত আওয়ামী লীগ

Komol-1.jpg

ওয়ান নিউজ ডেক্সঃ আসন্ন সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে প্রার্থীজট দেখা দিয়েছে। এখানে অন্তত ছয়জন নৌকা মার্কা পেতে চান। এর মধ্যে একই পরিবারের তিন ভাইবোন প্রার্থিতা ঘোষণা করে দলীয় মনোনয়ন লাভের চেষ্টায় দৌড়ঝাঁপ করছেন। তাদের একজন বর্তমান সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল। দলীয় মনোনয়ন তিনিই পেতে যাচ্ছেন বলে নেতাকর্মীদের বিশ্বাস। সাংসদের বড় ভাই রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহেল সরওয়ার কাজলও বসে নেই। দলীয় প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনিও সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে তাদের ছোট বোন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনিন সরওয়ার কাবেরীও প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে মাঠে রয়েছেন।

মনোনয়ন দৌড়ে তিন ভাইবোনের তৎপরতায় বিব্রত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। তৃণমূল কর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তিন ভাইবোনই সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ মরহুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর সন্তান।

গত সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য তিনজনই প্রকাশ্যে মাঠে নেমে নিজেরা কাদা ছোড়াছুড়ি ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হন। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কমলকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সমস্যার সমাধান করেন। এরপর তিন ভাইবোনের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে। এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও মাঠে নেমেছেন তিন ভাইবোন। মনোনয়ন পেতে তিন ভাইবোনের এই প্রতিযোগিতা আলোচনার জন্ম দিয়েছে এলাকায়। তাদের পারিবারিক বিরোধে দলের নেতারাও বিরক্ত।

আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা দিয়ে স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছেন নাজনিন সরওয়ার কাবেরী। দল থেকে তিনি মনোনয়ন পাবেন বলে দৃঢ় আশাবাদী। সংসদ সদস্য কমলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে কাবেরী বলেন, গত পাঁচ বছরে কক্সবাজারে সুশাসন নিশ্চিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী যেসব সুযোগ-সুবিধা এমপিদের জন্য দিয়েছেন তার অর্ধেকও কক্সবাজার-রামুতে বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মনোনয়ন বিষয়ে আমার কথা হয়েছে। আমাকে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।’

অন্যদিকে রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল বলেন, এবার নেত্রী তাকে মনোনয়নের জন্য অগ্রাধিকার দেবেন। কাজল বলেন,  ‘আমি চারবার মনোনয়ন চেয়েছি। গতবার আমার নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং মাহবুবউল আলম হানিফ নেত্রীর কাছে আমাকে নিয়ে গিয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। কিন্তু আমি তখন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ না করায় মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এবারও আমি মাঠে রয়েছি। রামুতে ৯৯টি ওয়ার্ড কমিটি সক্রিয় করেছি, সদরেও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি।’

সাংসদ কমল বলেন, ‘দলের সাংগঠনিক কাজ করার পাশাপাশি এলাকায় অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। উন্নয়নের জন্য আগামী নির্বাচনে আমাকে আবার দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। আমার চেয়ে যোগ্য বিকল্প প্রার্থী নেই। যোগ্যতার বিচারে আমি এগিয়ে।’

মনোনয়নে দৌড়ে আরেক প্রার্থী হচ্ছেন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী কানিজ ফাতেমা মোস্তাক। তিনি সাবেক সাংসদ ও কক্সবাজার জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ চৌধুরীর সহধর্মিণী। আরেক শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে মাঠে কাজ করছেন কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাংস্কৃতিক সংগঠক নজিবুল ইসলাম। তিনিও দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদী। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান।

কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনটি দীর্ঘদিন বিএনপির দখলে ছিল। পঞ্চম সংসদ নির্বাচন থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা চারবার এই আসন বিএনপির দখলে ছিল। বিএনপি-জামায়াতের অংশগ্রহণ ছাড়া ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী কমল।

আসন্ন নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগে প্রার্থীজট থাকলেও বিএনপিতে এই সংকট নেই। দৃশ্যত একক প্রার্থী হিসেবেই মাঠে কাজ করছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। আগামী নির্বাচনে তার মনোনয়ন নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনেকে মনে করেন, কক্সবাজার সদর-রামু আসনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে দলে কোনো বিরোধ না থাকায় বিএনপি এই আসনে বরাবর সুবিধা পেয়ে আসছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘নবম সংসদে বিরোধীদলীয় সাংসদ হয়েও অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেছি। সংসদে এলাকার সমস্যা নিয়ে কথা বলেছি। সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে সব সময় থেকেছি। এখনও নিরলসভাবে কাজ করে চলেছি। সুতরাং আগামী নির্বাচনেও দল এবং সাধারণ মানুষ আমাকে মূল্যায়ন করবে।’

কক্সবাজার সদর আসনে জামায়াতের রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট। সদর উপজেলা পরিষদে বর্তমান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি জিএম রহিমুল্লাহ। দলের হাইকমান্ড থেকে সম্মতি পাওয়া গেলে তিনিও এই আসনে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বলে সমকালকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে কক্সবাজারে অন্তত দুটি আসন তারা দাবি করবেন। এর মধ্যে একটি কক্সবাজার সদর-রামু আসন এবং অন্যটি মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসন। রহিমুল্লাহ বলেন, জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে এ দুটি আসন জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ ক্ষেত্রে জোট প্রার্থী হিসেবে তার মনোনয়ন নিশ্চিত বলে মনে করেন এই জামায়াত নেতা।