১৫ লাখের পরিবর্তে এলো ৬ লাখ টন চাল

ডেস্ক নিউজ:
ঘাটতি পূরণে সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি খাদ্য মন্ত্রণালয়। বেসরকারি পর্যায়ে চার শতাধিক আমদানিকারককে ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সরকারি পর্যায়ে আরও ৫ লাখ টন মিলে মোট ১৫ লাখ টন চাল আসার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত এসেছে ৬ লাখ টন। আমদানিকারকদের গড়িমসি এবং সরকারের কিছু নিয়মের জটিলতায় লক্ষ্য পূরণ হয়নি। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

জানা গেছে, গতবছর বন্যায় আমনের ফলন কম হয়েছে। একইসঙ্গে করোনাভাইরাস মহামারিতে কর্মহীন মানুষের একটা বড় অংশকে সরকারের মজুদ থেকে খাদ্য সহায়তা দিতে হয়েছে। দামে বনিবনা না হওয়ায় আমন মৌসুমের পর দেশের চালকল মালিকরাও সরকারের কাছে চাল বিক্রি করেনি। এসব কারণে মজুদ কমে গিয়েছিল। এই সুযোগে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। যার কারণে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার।

কিন্তু সেটাও কার্যকর হনি। এরই মধ্যে বোরো উঠতে শুরু করায় আমদানি বন্ধ করা হয়েছে। যা করা হয়েছে তা ২০ মে’র মধ্যে বাজারে ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চালের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে গতবছরের ২৯ সেপ্টেম্বর দাম বেঁধে দেয় সরকার। সেটা কাজে আসেনি। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিকেজি সরু মিনিকেট চাল ৫১ টাকা ৫০ পয়সা ও প্রতি ৫০ কজির বস্তা দুই হাজার ৫৭৫ টাকায় বিক্রি করতে হবে। মাঝারি মানের চাল প্রতিকেজি ৪৫ টাকা ও বস্তা দুই হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হবে। ওই দিন খাদ্যভবনের সম্মেলন কক্ষে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাড়ে তিন ঘণ্টা বৈঠক এবং পরে আবার শুধু চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এই দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

সিদ্ধান্তের পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার থেকে দেশের সব চালকল মালিককে নতুন দামে চাল বিক্রি করতে বলা হয়। কেউ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, এ দাম নিশ্চিত করতে ম্যাজিস্ট্রেট ও খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা অভিযানও চালাবেন।

সরকারের এতো উদ্যোগও সুফল বয়ে আনেনি বলে অভিযাগ ভোক্তাদের। অপরদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়র অধীনে থাকা কৃষি বিপণন অধিদফতরের কর্মকর্তারা মনে করেন, দাম নির্ধারণ করে না দিলে চালের দাম আরও বাড়তো। যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো না।

অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি আমদানিকারকদের পাশাপাশি সরকার আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে এ পর্যন্ত আড়াই থেকে তিন লাখ টন চাল আমদানি করেছে। যার বেশিরভাগই এসেছে ভারত থেকে। আমদানি করা অনেক চাল এখনও পাইপলাইনে রয়েছে। ভারত সরকারের সাথে জিটুজি চুক্তির মাধ্যমেও চাল আনছে বাংলাদেশ।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় চার শতাধিক আমদানিকারক কয়েক হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি নিয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ আমদানিকারকই ঋণপত্র বা এলসি খোলাসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেননি। বার বার নোটিস দেওয়ার পরও অনেকে চাল বাজারে ছাড়েননি। এ কারণে চূড়ান্তভাবে ২০ মে তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

অনুমতি নিয়েও কেন আমদানি করেননি জানতে চাইলে মিজানুর রহমান নামের এক আমদানিকারক জানিয়েছেন, আমদানির যে শর্ত দেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। শর্তে বলা হয়েছে- খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমদানির অনুমতি পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে এলসি খুলতে হবে। চাল আনার পর ২০ দিনের মধ্যে বাজারজাত করতে হবে। এই অল্প সময়ের মধ্যে আনা কঠিন।

তিনি বলেন, বেসরকারি আমদানিকারকরা বেশিরভাগই ভারত থেকে আমদানির প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। একইসঙ্গে সরকারও ভারত থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে চাল আনছে। এক দেশের বাজারে সরকারি-বেসরকারি উভয় শ্রেণির ক্রেতা হাজির হওয়ায় ভারতও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দামে চাল আমদানি করলে লোকসানের আশঙ্কা আছে। আবার চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ আতপ চাল খায়। অথচ, সেটা আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানিয়েছেন, ‘শুরুতে শুল্ক নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। ওটার সমাধান হয়েছে। বন্দরে আমদানির জন্য কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের একটা কোড নম্বর থাকে (এসএস কোড)। ২৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করে আমদানিকারকদের পণ্য ছাড় করতে হয়। সেই কোড পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। তাই আমদানি করা চালও দেশে ঢুকতে শুরু করছে।

খাদ্যসচিব নাজমানারা খানুম জানিয়েছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, অপরদিকে জাহাজ সংকট; এ সব কারণেও আমদানিতে সমস্যা হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা চাল যথাযথভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে কিনা তা তদারকির জন্য ৮ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির জন্য বরাদ্দ মোতাবেক কী পরিমাণ এলসি খোলা হয়েছে সে অনুযায়ী আমদানি হয়েছে কিনা, কোনও কারণে আমদানি বাধার মুখে পড়েছে কিনা, চাল কোথায় বিক্রি হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বিষয়টি মনিটরিং করছেন কিনা, এসব তদারকির জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি পর্যায়ে ৩২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টন চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আমদানির অপেক্ষায় পাইপলাইনে আছে ২০ লাখ টন।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.